গ্যালাক্সি রিং: স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণে কেন আঙ্গুলেই নজর স্যামসাংয়ের?

রিং বা আংটিজাতীয় কোনোকিছুর মূল সুবিধা হল, এটি মনোযোগ ভাঙার মতো কোনো স্ক্রিন বা তেমন ওজন ছাড়াই সবসময় শরীরের সঙ্গে লেগে থাকতে পারে।

প্রযুক্তি ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 10 Feb 2024, 08:17 AM
Updated : 10 Feb 2024, 08:17 AM

সম্প্রতি স্যামসাংয়ের ‘আনপ্যাকড’ ইভেন্টে গ্যালাক্সি এস২৪ সিরিজের ফোনের সঙ্গে এসেছে বেশ অবাক করার মতো ছোট এক গ্যাজেটের ঘোষণা, যার নাম ‘গ্যালাক্সি রিং’।

একেবারেই নতুন এই গ্যাজেট প্রসঙ্গে স্যামসাং ইলেক্ট্রনিক্সের ডিজিটাল হেলথ বিভাগের প্রধান ডা. মান পাক-এর সঙ্গে কথা বলে বিস্তারিত এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ দৈনিক ইন্ডিপেন্ডেন্ট।

যদিও এ গ্যাজেট সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ এখনও জানা যায়নি। তবে, স্যামসাং যে ফিচারগুলো নিয়ে কাজ করছে তা স্বাস্থ্য সম্পর্কিত। আর কোম্পানির এ উদ্দেশ্য নিয়ে কথা বলার সময় ডা. পাক কোনো রাখঢাক করেননি বলেই উঠে এসেছে ওই প্রতিবেদনে।

“স্যামসাং হেলথ-এ আমাদের ভূমিকা হল স্বাস্থ্যসেবাকে সহজ করা। পাশাপাশি, স্বাস্থ্য বিষয়ে মানুষ কোথায় রয়েছে, তাদেরকে সে পথটি বুঝতে সাহায্য করা।” – বলেন ডা. পাক।

“আমরা তাদের আচরণের ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সাহায্য করতে চাই, যাতে তারা নিজেদের ও অন্যদের যত্ন নিতে পারেন। আমরা মানুষকে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করতে চাই। আমরা মনে করি স্বাস্থ্য যদি একটি খেলা হয়, সেটি দলবেঁধেই খেলার মতো, এটি একক চেষ্টায় অর্জনের নয়।”

এমনসব স্বাস্থ্য ফিচার যেগুলো মানুষ ঘরে বসেই ব্যবহার করতে পারবে সেগুলো বাজারে আনার এটিই উপযুক্ত সময় হিসেবে স্যামসাং বিশ্বাস করে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ইন্ডিপেন্ডেন্ট।

“পরিবর্তনশীল খরচের ফলে স্বাস্থ্যসেবা আজকাল বাড়িতেই চলে আসছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে এটি দ্রুত হচ্ছে। তবে, আমি মনে করি এটা অন্যান্য জায়গায়ও ঘটে। আমাদের একটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে সেটি মূলত খরচের কারণে, কর্মশক্তির ঘাটতিও একটি কারণ। আমরা মনে করি আমাদের ডিভাইসের পোর্টফোলিও নিয়ে অনন্য একটি জায়গায় রয়েছি আমরা।” – বলেন ডা. পাক।

গ্যালাক্সি ফোন ও গ্যালাক্সি স্মার্টওয়াচগুলোয় এমন সেন্সর রয়েছে যা হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ মাপতে পারে। এরইমধ্যে গ্যালাক্সি ওয়াচ সিরিজেও রয়েছে এ সেন্সর যা অ্যাপল ওয়াচের সঙ্গে মেলে না।

তবে, স্বাস্থ্যবিষয়ক ডিভাইসের কিছু ঘাটতিও রয়েছে। এটা ঠিক যে একটি স্মার্টওয়াচ সকালে নিশ্চিত করে বলতে পারে যে, গতরাতে ঘুম ভাল হয়েছে কি হয়নি। কিন্তু সঠিক সিদ্ধান্তের জন্য এটি যথেষ্ট তথ্য নাও হতে পারে বলে লিখেছে ইন্ডিপেন্ডেন্ট।

“লোকজন বলছেন তারা কীভাবে ঘুমাচ্ছেন বা ব্যায়াম করছেন সেটির ধারণা পাওয়ার বিষয়টি দারুণ। তবে, তারা আরো ভাল জায়গায় পৌঁছাতে চান, একটি সমাধান চান। ঘুমের বিষয়টি আমরা বেশ গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। কোরিয়ান এফডিএ আমাদের ‘স্লিপ অ্যাপনিয়া’(নিদ্রাহীনতা) স্ক্রিনিং সনাক্তকরণ অনুমোদন করেছে।” – আরও বলেন ডা. পাক।

“এখন রাতে রক্তের অক্সিজেন কমে যাওয়া পর্যবেক্ষণ করে আমরা বলতে পারি আপনি স্লিপ অ্যাপনিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে আছেন। স্লিপ অ্যাপনিয়া একটি বিশাল সমস্যা। এটি নিয়ে কাজ একেবারেই কম হয়েছে। আর হৃদরোগ ও অন্যান্য রোগের সঙ্গে স্লিপ অ্যাপনিয়ার প্রভাবও তাৎপর্যপূর্ণ।”

স্লিপ ট্র্যাকিং (বা ঘুম পর্যবেক্ষণ) বেশ কিছু সময় ধরেই ব্যাপক হারে বেড়েছে, আর এর প্রভাব ও ব্যবহার আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

“আমাদের চারটি নতুন সূচক রয়েছে যা আমরা ঘুমের সময় ট্র্যাক করছি, হার্ট রেট বা হৃদস্পন্দন, শ্বাস-প্রশ্বাসের হার, রাতের চলাচল ও ঘুমের বিলম্ব। আমরা যা বুঝতে পেরেছি তা হল, ঘুমের সময় যখন আমরা মাপি যে কীভাবে হৃদস্পন্দন বা রক্তচাপ কমে যায়, সেগুলো কেবল আপনার ঘুমের গুণমান নয় আপনার সামগ্রিক স্বাস্থ্যেরও ইঙ্গিত দেয়। আমরা মনে করি, এগুলো অসুখের সম্ভাব্য প্রাথমিক হস্তক্ষেপের সূচক, আর ডাক্তারদের কাছে এসব তথ্য নেই।”

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিষয়টি নিয়েও আলোচনা করেছেন ডা. পাক। এটি অনেক কিছুই বদলে দিতে পারে এমন ধারণা প্রকাশ করেছেন তিনি।

“আমি দুটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র দেখতে পাচ্ছি যেখানে স্বাস্থ্যসেবাকে এআই ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করবে। এআই তথ্যের বিশাল পাহাড় নিয়ে কাজ করে, এটি বেশ কাজের হবে বলে চিকিৎসক হিসেবে আমার মনে হয়।”

‘ডা.পাক কি কল্পনা করেন যে, এআই কখনও ডাক্তারদের জায়গা নিয়ে নেবে?’, ইন্ডিপেনডেন্টের এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “আমি মনে করি না ডাক্তাররা কখনই পুরোপুরি চলে যাবেন। তবে, আমি মনে করি ডাক্তাররা এআই ব্যবহার করছেন না এমন দিন সম্ভবত সময়ের সঙ্গে চলে যাবে। কারণ, এআই এখন যথেষ্ট পরিপক্ক। আপনি যদি এটির সুবিধা না নেন তবে আপনি সঠিক দক্ষতা পাবেন না।”

ইন্ডিপেনডেন্ট এর প্রতিবেদন অনুসারে, আলোচনার এ পর্যায়ে ড. পাক গ্যালাক্সি রিং-এর বেশকিছু ‘প্রোটোটাইপ’ সংস্করণ দেখান। এগুলো প্রোটোটাইপ হওয়ায় রং, উপাদান থেকে শুরু করে নকশাও পরিবর্তন হতে পারে বলে জানান তিনি।

প্রোটোটাইপগুলো এক ডজন ভিন্ন আকারে ও সোনালী আর কালোসহ চারটি ভিন্ন রঙের ছিল। রিংগুলোর বাইরের প্রান্ত কিছুটা অবতল, স্পর্শে যেটি দারুণ আকর্ষণীয় লাগে বলে লিখেছে ইন্ডিপেনডেন্ট। এটি হালকা ও আরামদায়কও, ফলে রাতে পরার জন্য এটি স্মার্টওয়াচের চেয়ে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য।

‘রিং’ বা ‘আংটি’ জাতীয় কোনোকিছুর মূল সুবিধা হল, এটি মনোযোগ ভাঙার মতো কোনো স্ক্রিন বা তেমন ওজন ছাড়াই সবসময়ে শরীরের সঙ্গে লেগে থাকতে পারে। কেউ এ আংটি পরে থাকলে এটি নিঃশব্দে ক্রমাগতভাবে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে বলে উঠে এসেছে ওই প্রতিবেদনে।

“এসব পরার মতো গ্যাজেট আমাদের এমনভাবে তথ্য বা প্রসঙ্গ দিতে পারে যা আমরা আগে কখনোই ভাবিনি। আমরা ডাক্তারের চেম্বারে যাই, রক্তচাপ পরীক্ষা করি। আবার ছয় মাস বা এক বছর পর ফিরে এসে আরেকটি পরীক্ষা করি।”

“বাস্তবে, এখানে অনেক প্রসঙ্গ বা তথ্য রয়েছে যা ডাক্তাররা বা ব্যক্তি নিজে জানলেই বদলাবে। আর মৌলিকভাবে এটি  আমাদের কিছু ব্যবস্থাপনা ও জীবনধারার পছন্দ বা বিকল্পকে পরিবর্তন করবে। প্রথমবারের মতো এটি আমাদের পরিবর্তনের উপায় ও সুযোগ দিচ্ছে যা আগে সম্ভব ছিল না। এই ধরনের প্রযুক্তি আমাদের স্বাস্থ্যসেবায় প্রান্তিক গ্রাহক পর্যায়টি বুঝতে সাহায্য করছে।”