হিউম্যানয়েড রোবটে ওপেনএআই: মূল চ্যালেঞ্জ কোথায়?
এখনই সবার ড্রয়িং রুমে রোবট সঙ্গী পৌঁছে দেওয়ার চিন্তাভাবনা করছে না ওপেনএআই। তবে তাদের লক্ষ্য বেশ বাস্তবমুখী।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের নতুন মডেল ও নতুন ধাঁচের ভোক্তা হার্ডওয়্যার নির্মাণ নিয়ে প্রযুক্তি বিশ্বে আগেই হইচই ফেলে দিয়েছে ওপেনএআই।
এবার কোম্পানিটির প্রতিষ্ঠাতা স্যাম অল্টম্যান ও তার দলের চোখ এখন পুরোদস্তুর হিউম্যানয়েড বা মানবসদৃশ রোবট তৈরি করার দিকে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তি সংবাদের সাইট এনগ্যাজেট।
সম্প্রতি ‘সোর্সেস’ পডকাস্টে অংশ নিয়ে অল্টম্যান বলেছেন, রোবটের জন্য মানুষের শারীরিক অবয়ব বেছে নেওয়াটা যুক্তিযুক্ত। কারণ ‘আমাদের পুরো পৃথিবীটাই মানুষের কথা মাথায় রেখে ও মানুষের উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে’।
তিনি বলেছেন, ঘরবাড়ির দরজা, কম্পিউটারের কিবোর্ড বা দৈনন্দিন কাজের নানা সরঞ্জাম সবকিছুই মানুষের নির্দিষ্ট এক শারীরিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে বানানো। ফলে মানুষের সঙ্গে একই পরিবেশে যেসব রোবট চলাফেরা করবে বা কাজ করবে, সেগুলোর গঠনও মানুষের মতো হওয়া উচিত।
অল্টম্যানের ভাষায়, “সেই কাঠামোর সঙ্গে মিলিয়ে রোবটের গঠন তৈরি করাই সবচেয়ে সেরা সিদ্ধান্ত।”
ওপেনএআই কি সত্যিই এমন কোনো রোবট বাস্তবে নির্মাণ করতে যাচ্ছে এমন প্রশ্নের উত্তরে অল্টম্যান বলেছেন, “আমরা করব।”
তবে রোবটটির বাইরের রূপ বা শারীরিক গঠন কেমন হবে তা নিয়ে অল্টম্যান এখনই খুব বেশি চিন্তিত নন। রোবটের বাহ্যিক অবয়বের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ এর মস্তিষ্ক উন্নত করা।
“রোবট কীভাবে কাজ করবে ও পরিচালনা পাবে সেই মস্তিষ্কটি ঠিক করাই সবচেয়ে জরুরি বিষয়।”
কোনো যন্ত্রের গায়ে দুটো হাত আর দুটো পা লাগিয়ে দিলেই কাজ শেষ হয়ে যায় না, যতক্ষণ না সেটা জানে যে ওই হাত-পা দিয়ে ঠিক কী করতে হবে।
তবে এখনই বাজার মাতাতে আসছে না এই প্রযুক্তি। বাণিজ্যিকভাবে মানুষের হাতে পৌঁছাতে এখনও বেশ কিছু সময়ের প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সাময়িকী ‘ফরচুন’কে অল্টম্যান বলেছেন, “আমার মনে হয় ২০২৭ সালের দিকে আমরা চমৎকার এক ডেমো দেখাতে পারব। তবে আরও কয়েক বছরের মধ্যে রাস্তায় রাস্তায় রোবট হেঁটে বেড়াবে এমনটা এখনই ভাবছি না।”
ওই প্রদর্শনীতে ঠিক কী দেখানো হবে, রোবটটির পূর্ণাঙ্গ রূপ কেমন হবে বা কোম্পানির বাইরের কেউ ঠিক কবে নাগাদ এর দেখা পাবে সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেনি ওপেনএআই।
হার্ডওয়্যার কার্যকর করতে দরকার আসল ‘মস্তিষ্ক’
বিষয়টিকে কেবল রোবটের ‘মস্তিষ্ক’ হিসেবে বর্ণনা করলে পুরো প্রক্রিয়াটিকে বেশ সহজ মনে হতে পারে, তবে বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন।
একটি আধুনিক হিউম্যানয়েড রোবটকে এর ক্যামেরা ও সেন্সরের মাধ্যমে আশপাশের জগতকে দেখতে ও বুঝতে হবে।
একইসঙ্গে প্রাপ্ত নির্দেশনার সঠিক অর্থ অনুধাবন, সেটা কীভাবে করা যায় তা নির্ধারণ, পুরো দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সঞ্চালনে ভারসাম্য রাখা ও কাজের সময় বাস্তব জগতের অপ্রত্যাশিত বাধা এলে তা নিজ থেকেই সংশোধন করে নেওয়ার সক্ষমতা থাকতে হবে।
একটি চায়ের কাপ তুলে নেওয়ার মতো সাধারণ কাজের জন্য রোবটকে প্রথমে কাপটি সঠিকভাবে শনাক্ত করতে হবে। এরপর কাপের হাতল খুঁজে বের করে সেটি কীভাবে ধরা যায় তার সঠিক হিসাব ও কাপটি তোলার জন্য ঠিক কতটুকু বল প্রয়োগ করা প্রয়োজন তা মেপে নিতে হবে।
এই হিসাব সামান্য ভুল হলেই মেঝেময় চা ছড়িয়ে পড়ে একাকার হবে ও শেষ পর্যন্ত ওই মেঝেই পরিষ্কার করতে হবে রোবটটিকে।
ওপেনএআই এরইমধ্যে এসব প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ ঠেকানোর জন্য দক্ষ প্রকৌশলী ও গবেষক নিয়োগ দিতে শুরু করেছে।
কোম্পানির রোবোটিক্স টিমের কাজের পরিধি মোশন কন্ট্রোল, স্টেট এস্টিমেশন, অ্যাকচুয়েটর কন্ট্রোল ও পুরো রোবটের আচরণ পরিচালনার পাশাপাশি ফিজিক্যাল এআই সিস্টেমকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় মেশিন লার্নিং অবকাঠামো তৈরি পর্যন্ত বিস্তৃত।
এ উদ্যোগের পেছনে ওপেনএআইয়ের অতীত গবেষণার ইতিহাসও রয়েছে। তাদের ‘ড্যাকটিল’ নামের এক গবেষণা প্রকল্পে কৃত্রিম সফটওয়্যার বা সিমুলেশনের মাধ্যমে একটি রোবোটিক হাতকে বাস্তবে জিনিসপত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে এক হাত দিয়ে রুবিক্স কিউব মিলিয়ে দেখায় ওপেনএআই। তবে সেই সাফল্যই দেখিয়ে দিয়েছিল রোবোটিক্স ক্ষেত্রের আসল কঠিন চ্যালেঞ্জটি কোথায়, যেটা আজও এই খাতের প্রধান বাধা।
সফটওয়্যারের ভেতর একটি এআই মডেল সহজেই শিখে ফেলতে পারে ঠিক কী হওয়া উচিত। তবে বাস্তব জগতের পদার্থবিজ্ঞান সবসময় শেষ কথা বলে।
ওপেনএআইকে এখনও বানাতে হবে রোবটের দেহ
কৃত্রিম মস্তিষ্কের ওপর স্যাম অল্টম্যানের বাড়তি নজর দেওয়ার মানে এই নয় যে, ওপেনএআই রোবটের শারীরিক গঠন বা হার্ডওয়্যারকে একেবারেই গৌণ হিসেবে দেখছে।
কোম্পানির রোবোটিক্স সম্পর্কিত সাম্প্রতিক চাকরির বিজ্ঞপ্তিগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা মোটর, ট্রান্সমিশন, সেন্সিং ও থার্মাল সিস্টেমওয়ালা নিজস্ব ‘ইলেক্ট্রোমেকানিক্যাল অ্যাকচুয়েটর’ তৈরির ওপর কাজ করছে।
একইসঙ্গে উৎপাদনে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ম্যানুফ্যাকচারিং ও সাপ্লাই চেইন নিয়েও কর্মী নিয়োগ দিচ্ছে কোম্পানিটি, যেখানে রোবটের যে অংশটিকে অল্টম্যান ‘কম গুরুত্বপূর্ণ’ বলেছিলেন তার পেছনের কর্মযজ্ঞ কিন্তু মোটেও কম নয়।
এ ক্ষেত্রে ওপেনএআই একদম অনভিজ্ঞ নয়। ইলন মাস্কের টেসলা বহু বছর ধরেই তাদের ‘অপটিমাস’ রোবট নিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, সম্প্রতি চীনের এক্সপেং দেখিয়েছে, তাদের তৈরি ‘আইরন’ নামের হিউম্যানয়েড রোবটটি কীভাবে কারখানা থেকে সংযোজিত হওয়ার পর নিজেই হেঁটে বের হয়ে আসছে।
এসব উদ্ভাবন থেকে ইঙ্গিত মেলে, যত শক্তশালী সফটওয়্যারই হোক না কেন চূড়ান্ত সাফল্য পেতে হলে রোবটের অসংখ্য জটিল মোটর ও জোড়াতালিকে নিখুঁতভাবে সমন্বিত করতে হয়।
এখনই সবার ড্রয়িং রুমে রোবট সঙ্গী পৌঁছে দেওয়ার চিন্তাভাবনা করছে না ওপেনএআই। তাদের লক্ষ্য বেশ বাস্তবমুখী।
ওপেনএআইয়ের এক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, তাদের স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্য এমন ধরনের বহুমুখী রোবট তৈরি করা, যা দক্ষ কর্মীদের অবকাঠামো নির্মাণ কাজে সহায়তা করতে পারবে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে এমন এক পার্সোনাল রোবট বা ব্যক্তিগত সহকারী তৈরি করা হবে, যা দৈনন্দিন নানা ধরনের কাজে সাহায্য করতে পারবে।
কেউ যদি কল্পনা করেন, হাঁটুগুড়ে বসে চ্যাটজিপিটি আপনার থালাবাসন মেজে দিচ্ছে তবে এখনই রান্নাঘর থেকে ডিশওয়াশার ফেলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ, ওপেনএআই এখনও তাদের রোবটের আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেয়নি।
ওপেনএআইয়ের এই রোবটের দাম, সাবস্ক্রিপশন ফি, বাজারে আনার তারিখ বা ব্যবহারকারীর প্রাইভেসি কীভাবে রক্ষা করা হবে সে বিষয়েও কিছুই বলেনি তারা।
ভবিষ্যতে ক্যামেরায় ও মাইক্রোফোনে সজ্জিত ওপেনএআইয়ের কোনো রোবট যখন ঘরের ভেতর ঘুরে বেড়াবে তখন প্রাইভেসির প্রশ্নটি আরও বড় হয়ে দেখা দেবে।
সব আলোচনা পেরিয়ে আসল সত্যটি হল, ওপেনএআই তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পুরোদমে মাঠে নেমে পড়েছে। বর্তমানে তাদের ক্যারিয়ার পাতায় রোবোটিক্স বিভাগে ২৭টি নতুন পদের জন্য কর্মী খোঁজা হচ্ছে।
