Published : 08 Aug 2026, 11:38 AM
প্রযুক্তিভিত্তিক নিরাপত্তা ভেঙে সরাসরি ফোন কল ও ভুয়া ওয়েবসাইটের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল স্ট্রিটের ট্রিলিয়ন ডলারের প্রাইভেট একুইটি ও আর্থিক বিভিন্ন কোম্পানিকে টার্গেট করেছে একদল হ্যাকার।
কর্মকর্তাদের ধোঁকা দিয়ে সংবেদনশীল তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার পর কোম্পানিগুলোর কাছে বিপুল পরিমাণ অর্থ মুক্তিপণ হিসেবে দাবি করা হচ্ছে বলে গুগলের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
মার্কিন সার্চ জায়ান্ট গুগল ও ইন্টারনেট ইনটেলিজেন্স ডেটা পর্যালোচনা করে এই তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, হ্যাকাররা ব্ল্যাকস্টোন, ব্রিজওয়াটার অ্যাসোসিয়েটস, অ্যাপোলো গ্লোবাল ম্যানেজমেন্ট, বেইন ক্যাপিটাল, কেকেআর, টিপিজি, সিএমই গ্রুপ, ক্লিয়ারলেক ক্যাপিটাল ও মুডিস-এর মতো যুক্তরাষ্ট্রের নামিদামি প্রাইভেট একুইটি ও আর্থিক কোম্পানির কর্মীদের লক্ষ্য বানিয়েছে।
কর্মীদের কাছ থেকে পাসওয়ার্ড চুরি করার জন্য তারা নিখুঁত ও হুবহু আসল ওয়েবসাইটের মতো দেখতে ভুয়া সাইট তৈরি করে তা ব্যবহার করছে।
ব্লগে গুগল বলেছে, সাইবার অপরাধীদের দলটি ‘রেডাক্ট’, ‘পিংক’, ‘ফ্যালকন’ ও ‘হেলিক্স’ এমন নানাবিধ ছদ্মবেশ ও নামে নিজেদের অপরাধ কার্যক্রম চালিয়ে আসছে।
গুগল ইঙ্গিত দিয়েছে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকটি ভুক্তভোগী কোম্পানি এরইমধ্যে হ্যাকারদের দাবি করা মুক্তিপণের অর্থ পরিশোধে বাধ্য হয়েছে। তবে, রয়টার্সের নির্দিষ্ট অনুসন্ধানের বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি গুগল।
রয়টার্সও ঠিক কোন কোন কোম্পানি সাইবার আক্রমণের শিকার হয়ে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মুখে পড়েছে তা নিশ্চিত করতে পারেনি।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআইচালিত আধুনিক ও জটিল হুমকির এই যুগেও একদম প্রাথমিক স্তরের ফোন কলের মতো কৌশল ব্যবহার করে আর্থিক খাতের নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেঙে ফেলা বড় ধরনের দুর্বলতাকেই সামনে এনেছে।
যত দামি ও উন্নত সিকিউরিটি প্রোগ্রামই ব্যবহার করা হোক না কেন ছদ্মবেশ ধরে সরাসরি ফোন করার সনাতন পদ্ধতিটি এখনও কার্যকর প্রমাণিত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এসব বড় একুইটি কোম্পানি দেশটির অসংখ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে মূলধন জুগিয়ে থাকে। ফলে এ ধরনের সফল সাইবার অনুপ্রবেশের কারণে দেশের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক খাতের সংবেদনশীল তথ্য হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ আর্থিক খাতগুলোতে সাম্প্রতিক সাইবার হামলার কৌশল সম্পর্কে সহজ ব্যাখ্যা দিয়েছেন ‘রিটেইল অ্যান্ড হসপিটালিটি আইএসএসি’র সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক লি ক্লার্ক।
“নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রযুক্তিগত উন্নয়নের চেয়ে মানুষের এই সহজ সরল বিশ্বাসকে কাজে লাগানোর সুযোগই এসব হামলা হঠাৎ এভাবে ছড়িয়ে পড়ার মূল কারণ।”
গুগলের ‘থ্রেট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ’-এর প্রধান থ্রেট বিশ্লেষক অস্টিন লারসেন বলেছেন, হ্যাকাররা আর্থিক লাভের সমীকরণ দেখেই এসব সংবেদনশীল কোম্পানিকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে।
“পুরোটাই অর্থের বিষয়। হ্যাকাররা মনে করে, এসব কোম্পানির কাছে এমন সব স্পর্শকাতর ডেটা রয়েছে, যা হাতছাড়া হলে তা রক্ষা করতে কোম্পানিগুলো যে কোনো মূল্যে মুক্তিপণ দিতে বাধ্য হবে।”
গুগলের প্রকাশিত প্রায় ৭২টি ক্ষতিকর ওয়েবসাইটের তালিকা বিশ্লেষণ করে রয়টার্স ভুক্তভোগী বিভিন্ন কোম্পানির ভুয়া ডোমেইন ও ফাঁদ শনাক্ত করেছে।
এ বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে রাজি হয়নি এ তালিকায় থাকা কেকেআর, বেইন ক্যাপিটাল, ক্লিয়ারলেক ক্যাপিটাল, সিএমই, টিপিজি ও অ্যাপোলোর মতো শীর্ষ কোম্পানি। এ ছাড়া ব্ল্যাকস্টোন, ব্রিজওয়াটার অ্যাসোসিয়েটস ও মুডি’স থেকেও সাড়া মেলেনি।
অস্টিন লারসেন বলেছেন, “এসব ওয়েবসাইট অননুমোদিত প্রবেশের চেষ্টায় ব্যবহৃত হয়েছিল, তবে সব চেষ্টা সফল হয়নি।”
হ্যাকাররা চতুর ‘সোশাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ কৌশল ব্যবহার করছিল। তারা কর্মীদের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে কল দিয়ে কোম্পানির আইটি হেল্প ডেস্কের কর্মকর্তা সেজে কথা বলত, অনেক ক্ষেত্রে হেল্প ডেস্কের আসল নম্বরটিও স্ক্রিনে ভেসে উঠত।
গুগলের প্রকাশিত প্রায় ৭২টি ক্ষতিকর ওয়েবসাইটের তালিকা বিশ্লেষণ করে ভুয়া ডোমেইন ও ফাঁদ শনাক্ত করা গেছে
জরুরি ভিত্তিতে আইটি সিস্টেমের পাসকি বা মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন হালনাগাদের কথা বলে কর্মীদের ‘পাসকিহেল্পডেস্ক’ বা ‘সিকিওর পাসকি’র মতো ছদ্মবেশী ওয়েবসাইটে নিয়ে যাওয়া হত।
কর্মীরা পাসওয়ার্ড দেওয়ার পরপরই হ্যাকাররা মোবাইলে আসা ওটিপি বা টেক্সট কোডটি ফোনের মাধ্যমেই হাতিয়ে কল শেষ হওয়ার আগেই সম্পূর্ণ অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নিত।
তবে অস্টিন লারসেন জোর দিয়ে বলেছেন, কৌশলটি মারাত্মক কার্যকর হলেও প্রযুক্তিগতভাবে খুব বেশি জটিল বা আধুনিক কিছু নয়, বরং মানুষের সচেতনতার অভাবকে কাজে লাগানোর সহজ চেষ্টা মাত্র।
“প্রযুক্তিগতভাবে ‘জটিল বা আধুনিক’ শব্দটি দিয়ে এমনটাকে বোঝানো যাবে না। এটা অতি সাধারণ তবে কার্যকর কৌশল।”
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ আর্থিক ও আইনসংশ্লিষ্ট খাতে ফোন কলের মাধ্যমে চলমান হ্যাকিং প্রতিরোধ অভিযান নিয়ে কথা বলেছেন গুগলের বিশ্লেষক লারসেন।
অভিযুক্ত হ্যাকারদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি রয়টার্স। তবে এর আগে ‘ব্ল্যাকফাইল’ নামে পরিচিত এক হ্যাকারদের দল নিজেদের ডার্কনেট ওয়েবসাইট ‘রেডাক্ট’-এ দাবি করেছে, তাদের হ্যাকারদের ‘কোনো রাজনৈতিক বা নৈতিক উদ্দেশ্য নেই’ এবং তারা ‘আপাতত সংবাদমাধ্যমের কোনো প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে না’।
অন্যদিকে ‘ফ্যালকন’ নামের আরেকটি দল রেডাক্টের সঙ্গে নিজেদের সংশ্লিষ্টতা স্বীকার করলেও ‘হেলিক্স’ বা ‘পিংক’ নামের হ্যাকার দলের সঙ্গে সম্পর্কের কথা অস্বীকার করেছে।
হ্যাকারদের এসব দল একই ডিজিটাল পরিকাঠামো ব্যবহার করলেও লারসেন বলেছেন, তাদের মূল পরিচয় ও পারস্পরিক সম্পর্কের ধরণ এখনও স্পষ্ট নয়।
“এখানে এখনও বেশ কিছু অজানা বিষয় রয়ে গেছে।”
ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারী ও আর্থিক খাতের প্রাণকেন্দ্রে চরম উদ্বেগ তৈরি করেছে সাইবার হামলার এসব ঘটনা।
এ সংশ্লিষ্ট পরিচিত সূত্রের বরাতে জানা গেছে, শীর্ষ স্থানীয় অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি ‘পয়েন্ট৭২’ বুধবারে তাদের বিনিয়োগকারীদের আনুষ্ঠানিক সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে।
একই সূত্র ও রয়টার্সের পর্যালোচনা অনুসারে, ‘টু সিগমা ইনভেস্টমেন্টস’ ও ‘সিটাডেল’-এর মতো অন্যান্য বড় ফান্ডগুলোকেও লক্ষ্য করা হয়েছিল।
এ বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি ‘টু সিগমা’, ‘সিটাডেল’ ও ‘পয়েন্ট৭২’।
আর্থিক খাতকে মূল টার্গেট বানানোর আগে হ্যাকারদের নজর ছিল অন্য বেশ কিছু বড় কোম্পানির ওপর। গুগলের তথ্য অনসারে, গেল পাঁচ সপ্তাহেই রাইড-শেয়ারিং জায়ান্ট ‘উবার’, অনলাইন ব্রোকার ‘জিলো’, জনপ্রিয় পোশাক ব্র্যান্ড ‘লেভি স্ট্রস’ এবং ‘পল হেস্টিংস’ ও ‘গ্রিনবার্গ ট্ররিগ’-এর মতো বেশ কিছু ল ফার্মসহ দুইশোরও বেশি কোম্পানির জন্য এমন ভুয়া ফাঁদ পেতেছিল অপরাধীরা।
রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি উবার, জিলো, পল হেস্টিংস ও লেভি স্ট্রস। তবে ‘গ্রিনবার্গ ট্ররিগ’ বিবৃতিতে বলেছে, “গ্রাহক ও কোম্পানির তথ্য রক্ষায় একাধিক নিরাপত্তা স্তর থাকায় আমাদের কোনো তথ্য চুরি হয়নি।”