Published : 19 May 2026, 01:53 PM
ভাড়া করা এক গ্যারেজ থেকে স্রেফ বই বিক্রির ওয়েবসাইট হিসেবে যাত্রা শুরু করা অ্যামাজন বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে। ই-কমার্স থেকে শুরু করে ক্লাউড কম্পিউটিং সবখানেই অ্যামাজনের প্রবল আধিপত্য।
তবে বৈচিত্র্যময় এ বাজারে বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বে অ্যামাজনের কোনো শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। বছরের পর বছর ধরে কোম্পানিটি অপ্রতিদ্বন্দ্বী রয়েছে।
বিবিসি লিখেছে, কোম্পানিটির একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা পণ্য ও সেবার পরিধিও অনেক বড়। এ বছরের শুরুতে মার্কিন সুপারস্টোর জায়ান্ট ‘ওয়ালমার্ট’কে পেছনে ফেলে বার্ষিক বিক্রির দিক থেকে অ্যামাজন এখন বিশ্বের শীর্ষস্থানে রয়েছে।
অথচ ১৯৯৫ সালে ভাড়া করা এক গ্যারেজ থেকে স্রেফ বই বিক্রির ওয়েবসাইট হিসেবে অ্যামাজন চালু করেছিলেন জেফ বেজোস। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, ই-কমার্সের বাজারে বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বে অ্যামাজনের শক্ত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই কেন?
অবশ্য ই-কমার্সসহ অ্যামাজন যেসব খাতে ব্যবসা করছে সেখানে তারা একদম একচ্ছত্র বা প্রতিদ্বন্দ্বীহীন নয়। ওয়ালমার্ট বা ‘টার্গেট’-এর মতো বড় মার্কিন রিটেইলারদের নিজস্ব বড় ও দ্রুত বেড়ে ওঠা অনলাইন মার্কেটপ্লেস রয়েছে। অ্যামাজনের জনপ্রিয় ‘প্রাইম’ সাবস্ক্রিপশনের মতো তাদেরও নিজস্ব মেম্বারশিপ সেবা আছে।
যুক্তরাজ্যে অনলাইন মুদিপণ্যের বাজারে শীর্ষে রয়েছে ‘টেসকো’ এবং জার্মানিতে পোশাকের সবচেয়ে বড় অনলাইন বিক্রেতা ‘জালান্দো’। আবার একদম সাশ্রয়ী পণ্যের কথা ধরা হলে বর্তমানে বাজার কাঁপানো বড় দুটি নাম চীনের ওয়েবসাইট ‘টেমু’ ও ‘শিন’।
এর বাইরে আছে ‘ইবে’। এ মাসের শুরুতে ইবে-কে কিনে নেওয়ার জন্য ৫ হাজার ৫৫০ কোটি ডলারের প্রস্তাব দিয়েছিল ভিডিও গেইম বিক্রেতা কোম্পানি ‘গেইমস্টপ’। তবে পরবর্তীতে এ প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয় ইবে।
এদিকে, অ্যামাজনের সঙ্গে ইবে’র ব্যবসায়িক মডেলে বেশ পার্থক্য রয়েছে। ইবে মূলত নিলাম, ব্যবহৃত পণ্য ও শখের সংগ্রাহকদের জিনিসপত্রের ওপর বেশি জোর দেয়।
গেইমস্টপ বলেছিল, ইবে একদিন অ্যামাজনের আরও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারবে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, মোট ই-কমার্স বাজারের শেয়ারের দিক থেকে অ্যামাজন বর্তমানে নিজেদের সব ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে বেশ উঁচুতে রয়েছে।
গত মাসের পরিসংখ্যান অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রে মোট অনলাইন বিক্রির ৪০.৫ শতাংশ একাই নিয়ন্ত্রণ করে অ্যামাজন, যেখানে তাদের সবচেয়ে কাছে থাকা প্রতিদ্বন্দ্বী ওয়ালমার্টের দখলে রয়েছে মাত্র ৯.২ শতাংশ। ইবে আরও পিছিয়ে কেবল ৩ শতাংশের কাছাকাছি।
যুক্তরাজ্যের বাজারেও অ্যামাজনের আধিপত্য প্রবল, সেখানে মোট অনলাইন কেনাকাটার প্রায় ৩০ শতাংশ তাদের দখলে।
যুক্তরাজ্যের ‘ইউনিভার্সিটি অফ সারে’র ‘সেন্টার অফ ডিজিটাল ইকোনমি’র পরিচালক অ্যানাবেল গাওয়ার বলেছেন, “অ্যামাজন ই-কমার্সের বাজারে একদম একচ্ছত্র একচেটিয়া ব্যবসায়ী না হলেও তারাই মূলত এই বাজার শাসন করছে এবং তারা যত রকমের বৈচিত্র্যময় পণ্য বিক্রি করে তার কোনো তুলনা নেই।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেশ কিছু বিষয়ের চমৎকার সমন্বয় অ্যামাজনকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে গেছে, যা তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা অন্য যে কোনো কোম্পানির জন্য কঠিন।
এর অন্যতম কারণ ‘ফার্স্ট-মুভার’ বা প্রথম পা রাখার সুবিধা। অনলাইন কেনাকাটার জগৎ বড় করার ক্ষেত্রে অ্যামাজন ছিল শুরুর দিকের অন্যতম কোম্পানি। ইন্টারনেট যে মানুষের কেনাকাটাকে কত সহজ ও দ্রুতগতির করে বিপ্লব ঘটাতে পারে সে বিষয়ে কোম্পানিটির স্পষ্ট ধারণা ছিল। ফলে তারা অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে অনেক দ্রুত বাজারের বড় একটি অংশ নিজেদের দখলে নিতে পেরেছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, অ্যামাজনের বিনিয়োগকারীদের মানসিকতা। বহু বছর ধরে তারা কোম্পানির লোকসান মেনে নিয়েছিলেন, যেখানে অ্যামাজন বাজারে টিকে থাকতে নিজেদের পণ্য কেনা দামের চেয়েও কমে বিক্রি করেছিল।
পরবর্তীতে প্রথম দিকের লাভগুলো তারা নিজেদের পকেটে না ভরে ব্যবসার পরিধি বাড়াতে এবং প্রবৃদ্ধি অর্জনে আবার আগ্রাসীভাবে বিনিয়োগ করেছিলেন। আজ পর্যন্ত অ্যামাজন তার বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ বা ডিভিডেন্ড দেয়নি।
‘হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল’-এর অধ্যাপক ইমেরিটাস ডেভিড ইয়োফি বলেছেন, “এ কৌশলটি তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের পথ অনেকটাই আটকে দিয়েছিল।”
তিনি বলেছেন, প্রচলিত কোনো কোম্পানি যদি এই একই পন্থা অবলম্বন করতে যেত তবে বাজারে তাদের শেয়ারের দাম মারাত্মকভাবে পড়ে যেত ও বিনিয়োগকারীরা ক্ষুব্ধ হতেন।
বর্তমানে অ্যামাজনের আরেকটি বড় সুবিধা হচ্ছে, তারা নিজেদের সবচেয়ে লাভজনক বিভিন্ন ব্যবসা, বিশেষ করে তাদের প্রধান আয়ের উৎস ‘অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস’ বা এডব্লিউএস থেকে আসা তহবিল ব্যবহার করতে পারে। এ মোটা অংকের অর্থ দিয়ে তারা খুচরা বিক্রির মতো কম মুনাফার ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখছে এবং নতুন নতুন উদ্যোগে বড় ধরনের বিনিয়োগ করে চলেছে।
নিজেদেরকে একটি প্রযুক্তি কোম্পানি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করাটাও অ্যামাজনকে অনেক সাহায্য করেছে। অ্যালগরিদম, অটোমেশন ও ডেটা বা তথ্য ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করেই অ্যামাজন তাদের ব্যবসার পরিধি এত বড় করতে পেরেছে, যা তাদের কর্মদক্ষতা বাড়িয়েছে ও গ্রাহকদের কেনাকাটার অভিজ্ঞতাকে আরও উন্নত করেছে।
‘হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল’-এর আরেকজন অধ্যাপক সুনীল গুপ্ত বলেছেন, অ্যামাজনের মধ্যে বড় ধরনের ও সাহসী সব পরীক্ষা-নিরীক্ষার সংস্কৃতি রয়েছে। তারা ক্লাউড কম্পিউটিং ও কনজিউমার ডিভাইস, যেমন কিন্ডল বা ইকো স্পিকার থেকে শুরু করে নিজস্ব ব্র্যান্ডের পণ্য তৈরি, মৌলিক কনটেন্ট নির্মাণ ও স্বাস্থ্যসেবা খাতের মতো নানা বৈচিত্র্যময় ব্যবসায় পা বাড়িয়েছে এবং কোনো উদ্যোগ সফল না হলে তারা দ্রুত সেখান থেকে সরে এসেছে।

বিশেষজ্ঞরা অ্যামাজনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের কথাও উল্লেখ করেন। প্রথমটি, ২০০০ সালে নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত, যার মাধ্যমে তারা স্রেফ এক অনলাইন বিক্রেতা কোম্পানি থেকে নিজেদের একটি ‘অনলাইন প্ল্যাটফর্মে’ রূপান্তর করেছে। ফলে বাইরের অন্যান্য বিক্রেতারাও অ্যামাজনের ওয়েবসাইটে নিজেদের পণ্য বিক্রির সুযোগ পেয়েছে।
অধ্যাপক সুনীল গুপ্ত বলেছেন, এর ফলাফল ছিল দারুণ ‘নেটওয়ার্ক ইফেক্ট’। ওয়েবসাইটে যত বেশি বিক্রেতা আসতে থাকল পণ্যের সংখ্যাও তত বাড়তে থাকল। ফলে গ্রাহকদেরও অন্য কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন হল না, যা পরবর্তীতে আরও নতুন নতুন বিক্রেতাকে আকৃষ্ট করল।
“নতুন কোনো কোম্পানির পক্ষে এ চেইন বা চক্রটি ভাঙা খুবই কঠিন।”
দ্বিতীয় সিদ্ধান্তটি হচ্ছে, ‘অ্যামাজন প্রাইম’ চালু করা, যা ২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ও ২০০৭ সালে যুক্তরাজ্যে চালু হয়, যেখানে নির্দিষ্ট বার্ষিক ফির বিনিময়ে গ্রাহকদের দ্রুত ও শূন্য ডেলিভারি খরচে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার সুবিধা দেওয়া হয়।
অ্যামাজন নিয়ে বিস্তর পড়াশোনা ও লেখালেখি করা ‘ইউনিভার্সিটি অফ ম্যাসাচুসেটস অ্যামহার্স্ট’-এর যোগাযোগের অধ্যাপক এমিলি ওয়েস্ট বলেছেন, এ সেবাটি প্ল্যাটফর্মটিকে গ্রাহকদের কাছে ‘খুবই আকর্ষণীয় ও অভ্যাসে পরিণত’ করে তুলেছে।
“যেহেতু কোম্পানিটির কাছে ফ্রি শিপিং সুবিধাটি রয়েছে, ফলে স্বাভাবিকভাবেই আপনি যে কোনো জিনিস কেনার জন্য শুরুতেই অ্যামাজনেই খোঁজ করবেন।”
‘প্রাইম’ সেবাটি খুব একটা লাভজনক না হলেও অ্যামাজনের ই-কমার্সের বেশিরভাগ মুনাফাই আসে বিজ্ঞাপন ও থার্ড-পার্টি বিক্রেতাদের ফি থেকে। এক্ষেত্রে ‘প্রাইম মেম্বারশিপ’-এর আওতাভুক্ত সুবিধার পরিধি দিন দিন বাড়িয়েছে অ্যামাজন। তাদের নিজস্ব কনটেন্টসহ সিনেমা ও শো’র বড় এক লাইব্রেরি স্ট্রিমিংয়ের সুযোগ থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের ‘হোল ফুডস’-এ বিশেষ ছাড়ের সুবিধা রয়েছে। এ বৈচিত্র্যের কারণেই গ্রাহকদের পক্ষে এ মেম্বারশিপ বাতিল করা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
অধ্যাপক গাওয়ার বলেছেন, “অ্যামাজন কেবল পণ্য বিক্রির কোনো সাধারণ ওয়েবসাইট নয়। এটি মূলত একাধিক ব্যবসার সমন্বিত এক ইকোসিস্টেম, যেখানে প্রতিটি ব্যবসা একে অপরকে শক্তিশালী করছে... আর এ কারণেই তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন।”
তবে এর বাইরে অ্যামাজনের প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকার পেছনে আরও একটি কারণ হতে পারে এমন কিছু ব্যবসায়িক আচরণ, যা অনেকের মতে প্রতিযোগিতা আইন লঙ্ঘন করেছে এবং এর ফলে প্রতিযোগী কোম্পানিরা বড় হতে পারছে না ও নতুন প্রতিযোগী তৈরি হতে বাধা পাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল ট্রেড কমিশন ও ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্য উভয়ই অ্যামাজনের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি অ্যান্টিট্রাস্ট বা একচেটিয়া বিরোধী মামলা করেছে, যেগুলোর বিচার ২০২৭ সালের শুরুর দিকে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
এসব মামলাতে অভিযোগ উঠেছে, অ্যামাজন বাজারে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে ও প্রতিযোগিতা নষ্ট করতে অবৈধ পন্থা অবলম্বন করছে। ক্যালিফোর্নিয়া গত মাসে এর সপক্ষে একঝাঁক তথ্য-প্রমাণও দিয়েছে।
অ্যামাজন এসব অভিযোগ বরাবর অস্বীকার করেছে ও আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।