১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

৯০ বছরের পুরনো গণিত সমস্যা ‘সমাধান করেছে’ ওপেনএআই

ওপেনএআইয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী এআই মডেলগুলোর বর্তমান বাজারদর হিসাব করলে এ একটি গবেষণার পেছনেই আনুমানিক ১ কোটি ডলার খরচ হয়েছে।

৯০ বছরের পুরনো গণিত সমস্যা ‘সমাধান করেছে’ ওপেনএআই
নিজেদের এ প্রাপ্তিকে ‘মাইলফলক’ ও বিভিন্ন এআই টুলের দ্রুত অগ্রগতির অকাট্য প্রমাণ হিসেবে বর্ণনা করেছে কোম্পানিটি। ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 09 Sep 2026, 04:40 PM

Updated : 17 Sep 2026, 02:57 AM

নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মডেল ও হাজার হাজার এআই বটের সহায়তায় কেবল কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে কয়েক দশকের পুরনো জটিল ও গাণিতিক সমস্যার সমাধানের দাবি করেছে চ্যাটজিপিটি নির্মাতা কোম্পানি ওপেনএআই।

মঙ্গলবার কোম্পানিটি বলেছে, স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে এমন প্রায় ১০ হাজার এআই এজেন্টের সমন্বয়ে গঠিত একটি দলকে কাজে লাগিয়ে কেবল ৮৮ ঘণ্টার মধ্যে কঠিন এক গাণিতিক সমস্যার সমাধান করেছে তারা।

ফ্লুইড বা তরলের গতিপ্রকৃতি কীভাবে পরিচালিত হয় এর সঙ্গে জড়িত ‘নেভিয়ার-স্টোকস সমীকরণ’-এর একটি অংশ ছিল এ সমস্যা। গত ৯০ বছর ধরে এ সমস্যার গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দিকের পেছনে কোনো সঠিক গাণিতিক প্রমাণ ছিল না।

নিজেদের এ প্রাপ্তিকে ‘মাইলফলক’ ও বিভিন্ন এআই টুলের দ্রুত অগ্রগতির অকাট্য প্রমাণ হিসেবে বর্ণনা করেছে ওপেনএআই।

কোম্পানিটির এমন দাবি এখনও স্বাধীন গবেষকদের মাধ্যমে যাচাই হয়নি বা যুক্তরাষ্ট্রের গণিত সংগঠন ‘ক্লে ম্যাথমেটিক্স ইনস্টিটিউট’ থেকেও আনুষ্ঠানিক কোনো স্বীকৃতি মেলেনি।

এ সংগঠনটি মর্যাদাপূর্ণ ‘মিলেনিয়াম প্রাইজ’ পরিচালনা করে, যেখানে নির্দিষ্ট কিছু জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধানকারীকে আকর্ষণীয় আর্থিক পুরস্কার দেওয়া হয়।

এদিকে, ওপেনএআইয়ের এমন দাবি সামনে আসার পর থেকেই বিশ্বজুড়ে সমালোচনা হয়েছে।

মঙ্গলবার ‘নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি’র গণিতের অধ্যাপক ত্রিস্টিয়ান বাকমাস্টার বলেছেন, তিনি ও ওপেনএআইয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানি অ্যানথ্রপিকের গণিতবিদ লেভেন্ট আলপোজেও যৌথভাবে একই সমস্যা সমাধানের কাজ করছিলেন।

ওই দুই গণিতবিদ তাদের গবেষণায় ওপেনএআইয়ের ‘কোডেক্স’ টুলটি ব্যবহার করছিলেন। তবে অধ্যাপক বাকমাস্টার অভিযোগ করে বলেছেন, ৩ সেপ্টেম্বর তিনি জানতে পেরেছেন তাদের গবেষণার অগ্রগতির গোপন তথ্য ‘ওপেনএআইয়ের কাছে পাচার বা ফাঁস হয়েছে’।

ওপেনএআই তাদের ‘নেভিয়ার-স্টোকস’ সংক্রান্ত গবেষণা নিবন্ধটি প্রকাশের কেবল কয়েক ঘণ্টা আগে একই দিনে অধ্যাপক ত্রিস্টিয়ান বাকমাস্টার একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়েছেন।

তিনি দাবি করেছেন, তাদের গবেষণার অগ্রগতির তথ্য ওপেনএআইয়ের কাছে পৌঁছানোর পরই কেবল কোম্পানিটি নেভিয়ার-স্টোকস সমীকরণ নিয়ে কাজ শুরু করেছিল।

নিজের বক্তব্যের সপক্ষে বাকমাস্টার ওপেনএআইয়ের সঙ্গে বিনিময় করা কিছু ইমেইলের মূল লেখা ও কোম্পানির কাজের সময়সীমা ও পদ্ধতি নিয়ে তোলা তার কিছু প্রশ্ন জনসম্মুখে তুলে ধরেন।

বাকমাস্টার বলেছেন, তিনি তখনও পর্যন্ত ওপেনএআইয়ের সম্পূর্ণ গাণিতিক প্রমাণটি পড়ে দেখেননি। তবে একটি ভুল বা মিথ্যা তথ্যকে প্রতিষ্ঠিত হতে না দেওয়ার জন্যই তিনি বাধ্য হয়ে ‘কাকে কী বলা হয়েছিল, কখন বলা হয়েছিল ও কী প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল’ তা প্রকাশ্যে এনেছেন।

অন্যদিকে, মঙ্গলবার বাকমাস্টার ও আলপোজের এ ‘সমসাময়িক যৌথ কাজকে’ অভিনন্দন জানিয়ে এটাকে ‘অসাধারণ’ বলে বর্ণনা করেছে ওপেনএআই।

কোম্পানিটি বলেছে, বাকমাস্টার ও আলপোজে তাদের গবেষণা জনসম্মুখে প্রকাশ করার আগে ওপেনএআই ‘কোনো মাধ্যমেই তাদের কাজের কোনো অংশ দেখেনি’ ও নেভিয়ার-স্টোকস সংক্রান্ত গবেষণায় ব্যবহারকারীর কোনো নিজস্ব ডেটা ব্যবহার করেনি।

তবে ওপেনএআই বিবৃতিতে বলেছে, “এমন সম্ভাবনা কম। তবে আমরা শতভাগ উড়িয়ে দিতে পারছি না যে আমাদের পণ্যগুলো ব্যবহারের মাধ্যমে পাওয়া বেনামী ডেটা আমাদের মডেলের উন্নতিতে সাহায্য করেছিল।

“তবে আমাদের গাণিতিক বিভিন্ন প্রমাণের ধরণ তাদের কাজের চেয়ে আলাদা ও প্রমাণিত ফলাফলও ভিন্ন।”

ওপেনএআই বলেছে, অগাস্টের শেষদিকে তারা নতুন এক এআই মডেলকে প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করে, যা খুব দ্রুত গণিতে অস্বাভাবিক সক্ষমতা দেখাতে শুরু করে। নতুন মডেলটি বাজারের সাম্প্রতিক যে কোনো মডেলের চেয়ে ‘শক্তিশালী’ হওয়ায় তা কেবল কোম্পানির অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের জন্যই সীমিত রাখা হয়েছিল।

পরবর্তীতে গবেষকরা এ বিশেষ মডেলটিকে কিছু বিখ্যাত ও জটিল গণিত সমস্যার সমাধানে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেন।

১ সেপ্টেম্বর ওপপেনএআই ‘গুঞ্জন শুনেছিল যে, মিলেনিয়াম প্রাইজ খেতাবপ্রাপ্ত দুটি গাণিতিক সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে’। এরপরই তারা নতুন মডেলটিতে প্রশিক্ষিত হাজার হাজার এআই বটকে বাকি সমস্যাগুলো সমাধানের কাজে নিয়োজিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এর ঠিক ৮৮ ঘণ্টা পর ও প্রায় ১০ হাজার এআই বটকে একটানা কাজে লাগানোর পর ৫ সেপ্টেম্বর ওপেনএআই ‘নেভিয়ার-স্টোকস এক্সিস্টেন্স অ্যান্ড স্মুথনেস’ সমস্যার সমাধান খুঁজে পায়। সমস্যাটি তরলের প্রবাহ বা টার্বিউলেন্সের মূল কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত, যা বিজ্ঞানে আজও পুরোপুরি উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি।

এআই বটগুলোর এ সমাধান খুঁজে পেতে দৃশ্যত কম সময় লেগেছে মনে হলেও ওপেনএআই বলেছে, এআই বটগুলো নিজেদের মধ্যে প্রায় ৩০ লাখ বার্তা আদান-প্রদান করেছে ও কেবল একটি সমস্যার পেছনেই ১৩০ বিলিয়ন আউটপুট টোকেন ব্যবহার করেছে।

ওপেনএআইয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী মডেলগুলোর বর্তমান বাজারদর হিসাব করলে এ একটি গবেষণার পেছনেই আনুমানিক ১ কোটি ডলার খরচ হয়েছে।

ওপেনএআই যে সমাধানের দাবি করেছে, তা ‘মিলেনিয়াম প্রাইজ’-এর প্রদেয় ৪টি দাবির মধ্যে ২টির সমাধান করতে পেরেছে। আন্তর্জাতিক এ পুরষ্কারের অর্থমূল্য ১০ লাখ ডলার।

তবে ওপেনএআই বলেছে, “আমাদের এ ফলাফল প্রকাশের মূল উদ্দেশ্য ছিল এআই মডেলগুলোর বিস্ময়কর অগ্রগতির তথ্য তুলে ধরা। এর জন্য ‘মিলেনিয়াম প্রাইজ’ দাবি করার কোনো ইচ্ছে আমাদের নেই।”