১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

উপনিবেশের থাবায় বিলুপ্তি ঘটেছে হাজারো ভাষার: গবেষণা

ইতিহাসের ধারায় অসংখ্য ভাষা-পরিবারের জন্ম ও বিকাশ ঘটেছিল। খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ সহস্রাব্দে মেসোপটেমিয়ায় কিউনিফর্ম লিপিতে সুমেরীয় ভাষা দিয়ে লিখিত ভাষার প্রথম সূচনা হয়।

উপনিবেশের থাবায় বিলুপ্তি ঘটেছে হাজারো ভাষার: গবেষণা
গবেষকরা বলছেন, ইতিহাসের কোনো না কোনো সময়ে বিশ্বে একসঙ্গে অন্তত ৩০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৭৫ হাজারেরও বেশি ভিন্ন ভাষা প্রচলিত ছিল। ছবি: রয়টার্স

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 29 Jul 2026, 11:58 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:45 PM

বর্তমানে গোটা বিশ্বে প্রায় সাড়ে সাত হাজার ভাষা প্রচলিত থাকলেও মানব ইতিহাসের স্বর্ণযুগের তুলনায় এ সংখ্যা অনেক কম। প্রাচীন সাম্রাজ্য বিস্তার ও ঔপনিবেশিক শাসনের ধাক্কায় বিশ্বজুড়ে অগণিত ভাষা চিরতরে হারিয়ে গেছে বলে উঠে এসেছে নতুন এক গবেষণায়।

রয়টার্স লিখেছে, নতুন এ গবেষণায় গণিতভিত্তিক মডেল ও নৃবিজ্ঞান, ভাষাবিজ্ঞান ও জনমিতির উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যেখানে প্রায় ১২ হাজার বছর আগে বরফযুগের শেষদিকে ‘হলোসিন’ যুগ থেকে শুরু করে ভাষার বিবর্তনের রূপরেখা তৈরি করেছেন গবেষকরা।

খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দ থেকে খ্রিষ্টীয় প্রথম সহস্রাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে পৃথিবীতে ভাষাবৈচিত্র্যের এক ‘স্বর্ণযুগ’ ছিল। ওই সময় মানবজাতি একসঙ্গে দশ হাজারেরও বেশি ভিন্ন ভাষা ব্যবহার করত। সেই বৈচিত্র্য ধরে রাখা যায়নি বলে উঠে এসেছে গবেষণায়।

প্রাচীনকালে বড় বড় সাম্রাজ্যের প্রসার ও গত কয়েক শতকে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকতার কারণে ছোট ছোট সম্প্রদায়ের ভাষাগুলো মূলধারার ভাষার মাধ্যমে প্রতিস্থাপিত হতে শুরু করে। ফলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একে একে বহু ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যায়।

গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘সায়েন্স’-এ।

এ গবেষণার প্রধান গবেষক ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইয়েল ইউনিভার্সিটি’র ভাষাবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক ক্লেয়ার বাওয়ার্ন বলেছেন, “ভাষা যে কোনো সম্প্রদায়ের জন্য অর্থপূর্ণ। কারণ প্রতিটি ভাষা তার ভেতরে ধারণ করে বিশেষ জ্ঞান, ঐতিহাসিক সম্পর্ক ও স্মৃতি।”

বর্তমানে মাতৃভাষা ও দ্বিতীয় ভাষা মিলিয়ে ইংরেজি, মান্দারিন চায়নিজ, হিন্দি, স্প্যানিশ, আরবি ও ফরাসি ভাষার মতো কয়েকটি প্রধান ভাষা বৈশ্বিক যোগাযোগের মূল মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

তবে প্রভাবশালী এসব ভাষার দাপটে ঐতিহাসিক বহু ভাষার হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি ভাষাবৈচিত্র্যের জন্য বড় এক ক্ষতি হিসেবেই দেখছেন গবেষকরা।

গবেষণার শীর্ষ গবেষক অধ্যাপক ক্লেয়ার বাওয়ার্ন বলেছেন, “বিজ্ঞানীদের জন্য ভাষা অতীতের বিপুল পরিমাণ তথ্য বহন করে। মানুষ কোথায় বাস করতেন, কী খেতেন ও কী বিষয় নিয়ে কথা বলতেন এর সবই পাওয়া যায় এতে। আমাদের মানবমনকে অনুধাবনের অনন্য সুযোগও এনে দেয় ভাষা।”

ইতিহাসের ধারায় অসংখ্য ভাষা-পরিবারের জন্ম ও বিকাশ ঘটেছিল। খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ সহস্রাব্দে মেসোপটেমিয়ায় কিউনিফর্ম লিপিতে সুমেরীয় ভাষা দিয়ে লিখিত ভাষার প্রথম সূচনা হয়।

পরবর্তী সময়ে মিশর, চীন ও মেসোআমেরিকাতেও স্বতন্ত্রভাবে লিখিত ভাষার বিকাশ ঘটে। গবেষকরা বলছেন, ইতিহাসের কোনো না কোনো সময়ে বিশ্বে একসঙ্গে অন্তত ৩০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৭৫ হাজারেরও বেশি ভিন্ন ভাষা প্রচলিত ছিল।

এ গবেষণার মূল লেখক ও স্পেনভিত্তিক ‘কাতালান ইনস্টিটিউশন ফর রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভান্সড স্টাডিজ’-এর কগনিটিভ বিজ্ঞানী ও বিবর্তন বিষয়ের নৃবিজ্ঞানী ড্যামিয়ান ব্লাসি বলেছেন, “আমরা খুব কমই অনুধাবন করতে পারি যে, কেবল কয়েক হাজার বছর আগেও মানবজাতি আজকের চেয়ে বেশি বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক এক বিশ্বে বসবাস করতেন।”

যেভাবে হিসাব মিলিয়েছে গবেষণা

প্রাচীনকালের ভাষার লিখিত কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ না থাকায় গবেষকদের বেশ বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল অবলম্বন করতে হয়েছে।

অধ্যাপক বাওয়ার্ন বলেছেন, “সাম্প্রতিক সময়ের আগে ভাষার সুনির্দিষ্ট সংখ্যার কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ ছিল না। প্রাচীনকালের যেসব খণ্ডিত রেকর্ড পাওয়া যায় এর ওপরও পুরোপুরি নির্ভর করা যায় না।

“তবে ভাষা ও সমাজের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে আমাদের যেহেতু ভালো ধারণা রয়েছে ফলে কিছু অনুমান নির্ভর সিমুলেশন মডেল তৈরি করে সময়ের সঙ্গে ভাষার এ বৈচিত্র্য কীভাবে ঘটেছে তা বের করা সম্ভব হয়েছে।”

গবেষকরা আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১৭১টি শিকারি-সংগ্রাহক গোষ্ঠীর তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন।

হলোসিন যুগের শুরুতে মানবজাতির বিচ্ছিন্ন ও ছোট ছোট যাযাবর দলের জনসংখ্যার ওপর ভিত্তি করে তাদের অনুমান, প্রায় ১২ হাজার বছর আগে বিশ্বে হয়ত সাড়ে চার হাজার থেকে ৬ হাজার ২০০টির মতো ভাষা প্রচলিত ছিল।

গবেষকরা বলছেন, পরবর্তী সহস্রাব্দগুলোতে বৈশ্বিক জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃষিভিত্তিক স্থায়ী বসতি গড়ে উঠতে শুরু করে, যা হাজার হাজার ছোট ছোট ভাষার উন্মেষ ও বিকাশের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করেছিল।

মেসোপটেমিয়ার সুমেরীয় ও আক্কাদীয়, আনাতোলিয়ার হিট্টিট, ইতালির এট্রুস্কান বা প্রাচীন মিশর ও চীনের নানা ভাষার পাশাপাশি আফ্রিকার কিছু ক্লিক ভাষা ইতিহাসের পাতায় এমন অগণিত ছোট-বড় ভাষা এসে আবার চিরতরে হারিয়েও গেছে।

কীভাবে একটি ভাষা হারিয়ে যায় বা বিলুপ্ত হয় এর প্রক্রিয়া তুলে ধরে অধ্যাপক বাওয়ার্ন বলেছেন, “কোনো ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর মানুষ যদি মারা যায় বা তারা যদি অন্য কোনো ভাষায় স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হয় তবেই সেই ভাষার বিলুপ্তি ঘটে।”

সব ক্ষেত্রে ভাষা যে কেবল হারিয়ে যায় তা নয় অনেক সময় পুরানো ভাষা বিবর্তিত হয়ে নতুন ভাষার জন্ম দেয়। খ্রিষ্টাব্দ ৪৭৬-এ পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর লাতিন ভাষা বিবর্তিত হয়ে ফরাসি, ইতালিয়ান ও স্প্যানিশের মতো আধুনিক বিভিন্ন ভাষার রূপ নেওয়ার উদাহরণ দিয়েছেন গবেষকরা।

ইতিহাসজুড়ে ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর ‘ভাষাগত সাম্রাজ্যবাদ’ চর্চাও ভাষা বিলুপ্তির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। যেমন, আয়ারল্যান্ডে ইংরেজি শাসকগোষ্ঠী আইরিশ ভাষার ওপর কঠোর দমনপীড়ন চালায়। আমেরিকা অঞ্চলে স্প্যানিশরা ও ব্রাজিলে পর্তুগিজরা স্থানীয় আদিবাসীদের ভাষা নিষিদ্ধ করেছিল। একইভাবে আফ্রিকায় নিজেদের উপনিবেশে ফরাসি ভাষা চাপিয়ে দিয়েছিল ফ্রান্স, আর কোরিয়ায় কোরিয়ান ভাষা দমনে সক্রিয় ছিল জাপান।

তবে চরম দমনপীড়নের মুখেও কিছু ভাষা টিকে থাকতে পেরেছে। স্প্যানিশদের অবদমন চেষ্টার পরও ইনকা, মায়া ও অ্যাজটেকদের নিজস্ব ভাষা আজও টিকে রয়েছে।

বর্তমানে বিশ্বে ব্যবহৃত ভাষার প্রায় অর্ধেকই বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকরা।

অধ্যাপক বাওয়ার্ন বলেছেন, “বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ কেবল ১০ শতাংশ ভাষায় কথা বলেন। ফলে বিপুলসংখ্যক ক্ষুদ্র ভাষার বক্তা বা ইশারা ভাষা ব্যবহারকারীর সংখ্যা খুবই সীমিত, যা এসব ভাষাকে বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিচ্ছে।”