Published : 21 Dec 2025, 10:57 AM
কমেট বা অ্যাটলাসের মতো এআই ব্রাউজার ব্যবহার করতে দেওয়ার কথা ভাবছেন? তাহলে এখনই থামার পরামর্শ দিচ্ছেন প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা। অন্তত এখনকার জন্য এসব এআই ব্রাউজার কর্মীদের কাজে ব্যবহার করতে না দেওয়াই নিরাপদ।
বৈশ্বিক প্রযুক্তি পরামর্শক গার্টনারের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এ নিয়ে সতর্কবাণী উঠে এসেছে। এর মূল বক্তব্য হল, এজেন্টিক ব্রাউজার বা যেগুলোকে অনেকেই এআই ব্রাউজার বলেন, সেগুলো ব্যবহারকারীর কাজ সহজ করতে পারে ঠিকই, কিন্তু এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে গুরুতর সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি।
গার্টনারের বিশ্লেষক ডেনিস সু, এভগেনি মিরোলিউবভ ও জন ওয়াটস প্রতিবেদনে লিখেছেন, “এই ধরনের এআই ব্রাউজার ওয়েবসাইট ব্যবহারের ধরন বদলে দিতে পারে এবং অনেক লেনদেন স্বয়ংক্রিয় করতে পারে। তবে একই সঙ্গে এগুলো বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি করছে।”
তাদের স্পষ্ট পরামর্শ, “ঝুঁকি কমাতে ভবিষ্যৎ অনুমানযোগ্য সময় পর্যন্ত সব এআই ব্রাউজার বন্ধ রাখা উচিত।”
ডেটা কোথায় যাচ্ছে, জানেন কি?
বিশেষজ্ঞদের বড় উদ্বেগের জায়গা হলো ডেটা। ও’রাইলি মিডিয়ার লেখক ও প্রশিক্ষক এমজে কউফম্যান বলেন, এআই ব্রাউজারের সাইডবার অনেক সময় ব্যবহারকারীর খোলা ট্যাবের সবকিছুই ধরে ফেলতে পারে। তার ভাষায়, “এর ফলে অভ্যন্তরীণ টুল, লগইন তথ্য বা গোপন নথি টের পাওয়ার আগেই বাইরের এআই ব্যাকএন্ডে চলে যেতে পারে।”
রিয়ালিটি ডিফেন্ডারের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা অ্যালেক্স লিসল বলছেন, সাধারণ ব্রাউজারে প্রতিটি ট্যাব আলাদা থাকলেও এআই এসব ব্রাউজার সব ট্যাবের তথ্য একসঙ্গে বোঝে।
“এটি ব্যবহারকারীর জন্য ভালো প্রেক্ষাপট তৈরি করতে চায়। কিন্তু একই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ ডেটা টেনে নিচ্ছে,” বলেন তিনি।
ব্যবহারকারীর হয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এআই
এআই ব্রাউজারে আরেকটি বড় ঝুঁকি দেখছেন ফিঙ্গারপ্রিন্ট নামের কোম্পানির প্রধান নির্বাহী ড্যান পিন্টো। তিনি বলেন, “এআই সহকারী ব্যবহারকারীর হয়ে কাজ করতে পারে। এর মধ্যে ক্ষতিকর লিংকে ক্লিক করা, ফর্ম পূরণ করা বা ব্যক্তিগত তথ্য পাঠিয়ে দেওয়ার মতো বিষয়ও থাকতে পারে। অনেক সময় ব্যবহারকারী বুঝতেই পারেন না কী ঘটছে।”
ভেঙে যাচ্ছে প্রচলিত নিরাপত্তা ধারণা
বাইটনোভার প্রধান নির্বাহী ক্রিস অ্যান্ডারসনের মতে, বেশির ভাগ মানুষই জানেন না, ব্রাউজারে কত সংবেদনশীল তথ্য জমে থাকে। তিনি বলেন, “আর্থিক পোর্টাল, অভ্যন্তরীণ ড্যাশবোর্ড, এমনকি রোগীর তথ্যও থাকতে পারে। একবার ফাঁস হলে সেগুলো ফিরিয়ে আনা যায় না।”
সিকোয়েন্স সিকিউরিটির সিসো র্যান্ডলফ বার বলেন, এআই ব্রাউজার এমন আচরণ করছে, যা প্রচলিত ব্রাউজারে দশকের পর দশক ধরে সীমিত রাখা হয়েছে। এতে করে ব্রাউজার নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের ধারণাগুলো ভেঙে পড়ছে।
তিনি আরও সতর্ক করেন, অনেক কর্মী আগে ব্যক্তিগত ডিভাইসে এসব টুল ব্যবহার শুরু করেন। পরে সেই অভ্যাস কর্মক্ষেত্রেও ঢুকে পড়ে। তার ভাষায়, “এআই ব্রাউজার শনাক্ত করাও তুলনামূলক সহজ। আক্রমণকারীরা খুব দ্রুত বুঝে ফেলতে পারে, কে এআই ব্রাউজার ব্যবহার করছে এবং সেই অনুযায়ী আক্রমণ সাজাতে পারে।”
প্রশিক্ষণ দিলেই কি সমাধান?
গার্টনার বলছে, কর্মীদের বোঝানো দরকার যে, এআই ব্রাউজার ব্যবহার করলে যা কিছু চোখে দেখা যাচ্ছে, এর সবকিছুই ব্যাকএন্ডে পাঠানো হতে পারে। তবে নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান নো-বি-ফোরের উপদেষ্টা এরিক ক্রন মনে করেন, এমন সাবধানবাণী একবার বললেই হবে না। কর্মীদের বারবার মনে করিয়ে দিতে হবে।
তবু সবার মতে, শুধু প্রশিক্ষণ যথেষ্ট নয়। হাচিন্স ডাটা স্ট্র্যাটেজি কনসালট্যান্টসের প্রধান ক্রিস হাচিন্স বলেন, কাজ দ্রুত শেষ করার লোভে কর্মীরা ঝুঁকি দেখেও উপেক্ষা করতে পারেন। এতে ‘শ্যাডো আইটি’ সমস্যাও তৈরি হতে পারে।
মেনলো সিকিউরিটির সিসো লায়নেল লিটি বলেন, কোনো কোম্পানি এআই ব্রাউজার ব্যবহার যদি করতেই চায়, তবে শক্ত সীমা টানতে হবে। “কোন সাইটে যাবে, কী ডাউনলোড করবে, সবকিছুর ওপর কড়া নিয়ন্ত্রণ দরকার। শুধু ইউআরএল ফিল্টারিং যথেষ্ট নয়,” বলেন তিনি।
সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের বার্তা পরিষ্কার। এআই ব্রাউজার ভবিষ্যতে কাজের ধরন বদলে দিতে পারে, কিন্তু নিরাপত্তা প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত এগুলো নিয়ে এগোনো মানে বড় ঝুঁকি নেওয়া।