১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

জেনেটিক রহস্য উন্মোচনে গুগল ডিপমাইন্ডের ‘আলফাজিনোম’

এআই টুলটি একসঙ্গে প্রায় ১০ লাখ ডিএনএ কোড বিশ্লেষণ ও জিনের সামান্য পরিবর্তনও শরীরের বিভিন্ন জৈবিক প্রক্রিয়ায় কী প্রভাব ফেলবে তা অনুমান করতে পারবে।

জেনেটিক রহস্য উন্মোচনে গুগল ডিপমাইন্ডের ‘আলফাজিনোম’
মানুষের জিনোম প্রায় তিনশ কোটি জোড়া ‘অক্ষর’ দিয়ে গঠিত, যাকে আমরা ডিএনএ কোড হিসেবে জানি। ছবি: ফ্রিপিক

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 29 Jan 2026, 04:38 PM

Updated : 26 Aug 2026, 02:49 PM

নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই টুল উন্মোচন করেছেন গুগল ডিপমাইন্ড-এর গবেষকরা। তাদের দাবি, রোগের জেনেটিক বিভিন্ন কারণ শনাক্তে বিজ্ঞানীদের সাহায্য ও নতুন চিকিৎসার পথ প্রশস্ত করবে এই টুল।

ব্রিটিশ পত্রিকা গার্ডিয়ান লিখেছে, মানবদেহের জিনের কাজের ধরন বিশ্লেষণ করবে ‘আলফাজিনোম’ নামের এ টুলটি। দেহের বিভিন্ন জিন কখন সক্রিয় হয়, কোন কোষে কাজ করবে বা সেগুলোর কার্যকারিতার মাত্রা বা ‘ভলিউম’ কেমন এবং মিউটেশন বা জিনের পরিবর্তন কীভাবে এ পুরো প্রক্রিয়াটিতে বাধা দেয় তা অনুমান করবে এই প্রযুক্তি।

হৃদরোগ, অটোইমিউন ডিসঅর্ডার বা মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যার মতো পরিবারে বংশানুক্রমে যেসব সাধারণ রোগ দেখা যায় সেগুলোর পেছনে জিনের নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার পরিবর্তন বা ‘মিউটেশন’ দায়ী। অনেক ধরনের ক্যান্সারের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তবে হাজার হাজার জেনেটিক ত্রুটির মধ্যে ঠিক কোনটি এ রোগের জন্য দায়ী তা খুঁজে বের করার কাজটি সহজ নয়।

টুলের গুরুত্ব বোঝাতে ‘গুগল ডিপমাইন্ড’-এর গবেষক নাতাশা ল্যাতিশেভা বলেছেন, “আমরা আলফাজিনোমকে এমন টুল হিসেবে দেখছি, যা দেহের জিনের কার্যকারিতা বুঝতে আমাদের সাহায্য করবে। জীবনের গূঢ় রহস্য বা ‘কোড অফ লাইফ’ সম্পর্কে আমাদের মৌলিক জ্ঞানকে আরও গতিশীল করবে এই টুল।”

মানুষের জিনোম প্রায় তিনশ কোটি জোড়া ‘অক্ষর’ দিয়ে গঠিত, যাকে আমরা ডিএনএ কোড হিসেবে জানি, যেমন গুয়ানিন বা জি, থাইমিন টি, সাইটোসিন বা সি ও অ্যাডেনিন এ।

বড় আকারের সংকেতের কেবল দুই শতাংশ অংশ কোষকে বলে দেয় কীভাবে প্রোটিন তৈরি করতে হবে, যা প্রাণের মূল ভিত্তি। আর বাকি অংশটুকু অনেকটা কন্ডাক্টরের মতো পুরো জিন ব্যবস্থাকে পরিচালনা করে, অর্থাৎ শরীরের কোথায়, কখন ও ঠিক কতটুকু পরিমাণে একেকটি জিন সক্রিয় হবে সেই অতি গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন নির্দেশনা থাকে এই অংশেই।

মানুষ ও ইঁদুরের জেনেটিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ‘আলফাজিনোম’কে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন গবেষকরা। ফলে শরীরের নির্দিষ্ট কোনো কোষে হওয়া মিউটেশন ও জিনের ওপর তার প্রভাবের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে নিতে শিখেছে এই টুল। এআই টুলটি একসঙ্গে প্রায় ১০ লাখ ডিএনএ অক্ষর বিশ্লেষণ এবং জিনের সামান্য পরিবর্তনও শরীরের বিভিন্ন জৈবিক প্রক্রিয়ায় কী প্রভাব ফেলবে তা অনুমান করতে পারে।

গুগল ডিপমাইন্ড বলেছে, এ প্রযুক্তিটি বিজ্ঞানীদের বুঝতে সাহায্য করবে, ডিএনএ কোডের কোন অংশগুলো স্নায়ু বা লিভারের মতো নির্দিষ্ট কোষ বা টিস্যু গঠনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একইসঙ্গে ক্যান্সার ও অন্যান্য রোগের জন্য দায়ী ক্ষতিকর বিভিন্ন মিউটেশনও শনাক্ত করতে পারবে।

এ টুলের মাধ্যমে গবেষকরা একদম নতুন ধরনের ডিএনএ বিন্যাস তৈরি করতে পারবেন, যা জিন থেরাপির ভিত্তি হতে পারে। যেমন এ টুলের মাধ্যমে এমন পদ্ধতি তৈরি সম্ভব হবে, যা কেবল স্নায়ু কোষের কোনো একটি জিনকে সক্রিয় করলেও পেশি কোষে কোনো প্রভাব ফেলবে না।

কানাডার ‘ইউনিভার্সিটি অফ ব্রিটিশ কলাম্বিয়া’র গবেষক কার্ল ডি বোয়ার বলেছেন, “আলফাজিনোম সহজেই শনাক্ত করতে পারে যে কোনো মিউটেশন জিনের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে কি না, কোন জিনগুলো কীভাবে প্রভাবিত হচ্ছে এবং কোন ধরনের কোষে এমনটি ঘটছে। এরপর এ প্রভাব কাটানোর জন্য কার্যকর ওষুধ তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।”

এ গবেষণার জড়িত ছিলেন না বোয়ার।

“আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য, নির্ভুল এক এআই মডেল তৈরি করা, যার বিভিন্ন ভবিষ্যৎবাণী যাচাইয়ের জন্য নতুন কোনো ল্যাব পরীক্ষার প্রয়োজন হবে না। আলফাজিনোম যুগান্তকারী উদ্ভাবন হলেও এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে বিজ্ঞানীদের আরও নিরলস পরিশ্রম করে যেতে হবে।”

এরইমধ্যেই বেশ কিছু বিজ্ঞানী আলফাজিনোম ব্যবহার শুরু করেছেন। ‘ইউসিএল’-এর পেডিয়াট্রিক হেমাটো-অনকোলজির ক্লিনিকাল অধ্যাপক মার্ক মনসুর বলেছেন, ক্যান্সারের বিভিন্ন জেনেটিক কারণ খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে টুলটি ‘বড় পরিবর্তন’ এনেছে।

অন্যদিকে, ‘ইউনিভার্সিটি অফ এক্সেটার’-এর স্ট্যাটিস্টিক্যাল জেনেটিস্ট গ্যারেথ হকস বলেছেন, “আমাদের ৩০০ কোটি জোড়া বেস পেয়ার জিনোমের ৯৮ শতাংশই নন-কোডিং। আমরা বাকি ২ শতাংশ সম্পর্কে বেশ ভালোই জানি তবে এ আলফাজিনোম যে অন্য ২৯৪ কোটি জোড়া বেস পেয়ার কী কাজ করছে তা নিয়ে পূর্বাভাস দিতে পারছে তা আমাদের জন্য বড় এক অগ্রগতি।”