Published : 08 Feb 2026, 12:16 PM
সিনেমার পর্দায় যেসব রোবটকে অবলীলায় দৌড়াতে বা নাচতে দেখি বাস্তবে এরা কি ঠিক ততটাই সাবলীল? দীর্ঘকাল ধরে রোবট মানেই ছিল যান্ত্রিক জড়তা আর হোঁচট খেয়ে চলা এক যন্ত্র। তবে বর্তমানে প্রযুক্তি নতুন মোড় নিচ্ছে।
শক্তিশালী ‘একচুয়েটর’ থেকে শুরু করে বাতাস দিয়ে চালানো ‘সফট রোবট’ পর্যন্ত প্রতিটি উদ্ভাবনই মানুষকে বড় এক প্রশ্নের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, রোবট কি কখনো সত্যিই মানুষের মতো সাবলীল হতে পারবে?
বিবিসি লিখেছে, ‘স্টার ওয়ার্স’-এর মতো বিশাল আকৃতির হাঁটার রোবট তৈরি করতে চেয়েছিলেন ব্রিটিশ ইউটিউবার জেমস ব্রুটন, যাতে এতে চড়ে নিজের বন্ধুর টেনিস কোর্টে ঘুরে বেড়াতে পারেন তিনি।
তার ভাষায়, “আমার লক্ষ্য ছিল এমন কিছু তৈরি করা, যা দেখে মানুষ দুবার তাকাতে আগ্রহী হবে।”
এ রোবটটি তৈরিতে দরকার ছিল চারটি শক্তিশালী পা, যা দিয়ে প্রচলিত ‘এট-এট’ রোবটটিকে নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন তিনি। রোবটটি প্রথম দেখা গিয়েছিল বিখ্যাত সিনেমা ‘এম্পায়ার স্ট্রাইকস ব্যাক’-এ।
ব্রুটন বেশ যুক্তিসঙ্গতভাবেই ব্যাখ্যা করেছেন, “আমি এমন কিছু বানাতে চাইনি, যা আকারে বড় ও নড়বড়ে হবে।”
ফলে তিনি মোটর ও গিয়ারের জটিল এক সিস্টেম তৈরি করেন, যা ‘সার্ভো’ হিসেবে কাজ করবে। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে রোবটের প্রতিটি অংশের নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
সবশেষে, একজন ‘স্টর্মট্রুপার’-এর পোশাক পরে সেই রোবটের ওপর চড়ে ঘুরে বেড়ানোর এক ভিডিও তৈরি করেন ব্রুটন। তবে তিনি একটি বিষয় স্বীকার করে নিয়েছেন-
“রোবটি বেশ ধীরগতিতে চলে।”
এখন দুই পাওয়ালা এক নতুন সংস্করণের রোবট তৈরির কাজ করছেন ব্রুটন, যা ভারসাম্য ধরে রাখার জন্য আরও বেশি সংবেদনশীল হবে। কারণ ব্রুটনকে পিঠে নিয়েই চলাফেরা করতে হবে রোবটটিকে।
ব্রুটন বলেছেন, তার ডিজাইন করা কিছু যন্ত্রাংশ ‘ভেরিয়েবল স্প্রিং’-এর মতো কাজ করে। এগুলো এমন ‘মোশন-কন্ট্রোল’ পার্টস, যা প্রয়োজনে উল্টো দিকে ঘুরতে পারে এবং মাটি থেকে আসা ধাক্কা বা ঝাকুনি সইতে পারে।
তার ভাষায়, “প্রয়োজন অনুসারে রোবটটি গতিশীলভাবে ভার বা লোড শোষণ করে নেবে।”
রোবটকে সচল করতে ‘একচুয়েটর’ বা নড়াচড়া সচলকারী যন্ত্রাংশ গুরুত্বপূর্ণ। সহজভাবে বললে, একচুয়েটরগুলো হয় সামনে-পিছে যাতায়াত করে বা গোল হয়ে ঘোরে। এমনটি করার ভিন্ন ভিন্ন উপায় রয়েছে।
এসব একচুয়েটরকে কৃত্রিম শরীর বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সঙ্গে যোগ করলেই রোবট হাত, রোবট কুকুর বা মানুষের মতো দেখতে ‘হিউম্যানয়েড’ তৈরি সম্ভব। ভবিষ্যতে এসব রোবটকে যদি আরও উন্নত ও দক্ষ হতে হয় তবে সেগুলোতে আরও কার্যকর, নিখুঁত ও বুদ্ধিমান একচুয়েটর ব্যবহার করতে হবে।
বর্তমানে খুব কম সংখ্যক কোম্পানিই নিখুঁত ও বড় পরিসরে একচুয়েটর তৈরির কাজ করছে। তবে প্রাণীরা যে অবিশ্বাস্য পেশি-শক্তির মাধ্যমে এত সহজ ও সাবলীলভাবে চলাফেরা করে সেই পর্যায়ের ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে এসব যন্ত্রাংশ এখনও অনেক দূরে।
তাত্ত্বিকভাবে নতুন প্রজন্মের এসব একচুয়েটর হোঁচট খেয়ে চলা ‘স্টাম্বল-বটস’-কে অনেক বেশি ছন্দময় বা ব্যালে নাচের মতো সাবলীল মেশিনে রূপান্তর করতে পারে।
‘ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি সান ডিয়েগো’র মাইক টলি বলেছেন, “দীর্ঘদিন ধরে রোবটবিদরা রোবটকে সচল করতে ডিসি বা ডাইরেক্ট কারেন্ট মোটর ব্যবহার করে আসছেন।”
এ ধরনের মোটর একটি ফ্যান ঘোরানোর জন্য চমৎকার। কারণ তা উচ্চ গতি ও কম ‘টর্ক’-এ ভালো কাজ করে। টর্ক হচ্ছে ঘোরানো বা মোচড়ানোর বল, যা কোনো চাকা বা বস্তুকে এর অক্ষের আশপাশে ঘোরাতে সাহায্য করে। তবে টলি বলেছেন, মানুষ মোটেও ফ্যানের মতো ঘোরে না।

“আমরা কোনো কিছু তুলতে চাই, ধাক্কা দিতে চাই ও এমন কাজ করতে চাই, যেখানে প্রচুর শক্তি ও টর্কের প্রয়োজন হয়।”
এ ছাড়া, কোনো রোবটের হাত যদি হঠাৎ কারো দিকে ধেয়ে আসে তবে নিরাপত্তার খাতিরেই মানুষটি চাইবেন সেটিকে সঙ্গে সঙ্গে থামাতে এবং নিজের কোনো ক্ষতি না করে সেটিকে উল্টো দিকে ঠেলে দিতে।
এজন্য প্রয়োজন ‘ব্যাক-ড্রাইভেবল একচুয়েটর’, যা তাৎক্ষণিকভাবে গতি পরিবর্তন করতে পারে। এ সক্ষমতা নেই এমন সাধারণ একচুয়েটর অনেকটা ম্যানুয়াল গিয়ার গাড়ির মতো, যেগুলোকে পেছনে নিতে হলে গিয়ার পরিবর্তন করতে হয়।
প্রযুক্তি অর্থায়ন সংস্থা ‘আরিয়া’র রোবট ডেক্সট্রিটি বিষয়ক প্রকল্প পরিচালক জেনি রিড বলেছেন, “বর্তমান রোবটের আরেকটি বড় সমস্যা এগুলোর ব্যাটারি খুব দ্রুত শেষ হয়ে যায়। এ দিক থেকে খুবই দুর্বল বৈদ্যুতিক বিভিন্ন মোটর।”
সবশেষে, প্রচলিত বৈদ্যুতিক মোটর দিয়ে তৈরি অতি ক্ষুদ্রাকৃতির বিভিন্ন একচুয়েটর খুব দ্রুত অতিরিক্ত গরম হয়ে যায়, যা মাথাব্যথার আরেকটি বড় কারণ।
বর্তমানে ব্রিটিশ রোবটিক্স কোম্পানি ‘হিউম্যানয়েড’-এর জন্য একচুয়েটর তৈরির কাজ করছে জার্মানিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘শেফলার’। তাদের লক্ষ্য, এমন সব যন্ত্রাংশ তৈরি করা, যা অত্যন্ত শক্তি-সাশ্রয়ী ও সুনিয়ন্ত্রিত তবে, মানুষের সঙ্গে নিরাপদভাবে চলাফেরা ও কাজ করতে পারে এমন ‘বাইপেডাল’ বা দুই পাওয়ালা রোবট তৈরির জন্য অত্যন্ত জরুরি।
এ পদ্ধতির বড় অংশ হল এমন সব একচুয়েটর তৈরি করা, যা তাদের বর্তমান অবস্থান ও কাজের গতি সম্পর্কে অনেক তথ্য দেবে। ফলে কম্পিউটার সেগুলোর কার্যক্রম রিয়াল-টাইমে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। তবে কেবল সফটওয়্যার নয়, হার্ডওয়্যারকেও আরও উন্নত হতে হবে।
‘হিউম্যানয়েড রোবটিক্স’-এর প্রেসিডেন্ট ডেভিড কার বলেছেন, “ঘর্ষণ ও ব্যাক-ড্রাইভেবিলিটির মধ্যে সঠিক ভারসাম্য খুঁজে বের করার জন্য আমাদের ক্রমাগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যেতে হচ্ছে, যা সত্যিই বড় এক ধাঁধা।”
শেফলার বলেছেন, নিজস্ব কারখানায় এসব রোবট ব্যবহার করবেন তারা, যেমন কনভেয়ার বেল্ট থেকে সদ্য তৈরি বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নিয়ে ওয়াশিং মেশিনে লোড করা, যাতে সেগুলো শিপমেন্টের জন্য প্যাকেজিং করা যায়। “আমরা এখনই কর্মী সংকটে ভুগছি।”
তবে বর্তমানে যারা এসব কাজ করছেন তাদের অন্য কোনো কাজে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে কি না এমন প্রশ্নে কার বলেছেন, “অবশ্যই।”
এদিকে, নিজেদের নতুন প্রজন্মের একচুয়েটরের জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিষ্ঠান ‘হুন্ডাই মোবিস’-এর ওপর ভরসা করছে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ রোবটিক্স কোম্পানি ‘বস্টন ডায়নামিক্স’। গাড়ির যন্ত্রাংশ তৈরির জন্য পরিচিত ‘হুন্ডাই মোবিস’।
‘হুন্ডাই মোবিস’-এর রোবটিক্স বিজনেস ডিভিশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট সে উক ওহ বলেছেন, “এসব একচুয়েটর একটি মোটর কন্ট্রোলার ও রিডাকশন গিয়ারের সমন্বয়ে গঠিত, যা অনেকটা ইলেকট্রিক পাওয়ার স্টিয়ারিং সিস্টেমের মতোই।”
ওহ বলেছেন, হিউম্যানয়েড রোবটের জন্য তার কোম্পানি এবারই প্রথম একচুয়েটর সরবরাহ করছে।
“মানুষের নিরাপত্তার জন্য মান ও নির্ভরযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে আমাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও উন্নত প্রযুক্তি রয়েছে।”
বর্তমান সময়ের অত্যাধুনিক একচুয়েটরগুলোও মূলত ধাতু, শক্ত প্লাস্টিক ও ইলেকট্রনিক্স দিয়ে তৈরি। তবে এর বাইরেও ভিন্ন কিছু ধারণা নিয়ে কাজ চলছে। সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করছেন মাইক টলি ও তার সহকর্মীরা।
টলি বলেছেন, “আমরা বায়ুচালিত সফট রোবট তৈরি করেছি, যা জমিতে হাঁটতে পারে ও সরাসরি পানিতেও নেমে যেতে পারে। ভেজা অবস্থায় এগুলোর কী হবে তা নিয়ে আমাদের দুশ্চিন্তা করতে হয় না।”
বিশেষ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, কোনো ইলেকট্রনিক্স ছাড়াই ছয় পায়ের রোবট কেবল পাইপের মাধ্যমে বাতাস পাম্প করে চলাফেরা করতে পারছে।