মহাকাশ স্টেশনে যাবে দূরনিয়ন্ত্রিত সার্জিকাল রোবট

মহাকাশ যাত্রায় অক্ষত থাকলে আইএসএসে প্রথমে রোবটটির জায়গা হবে এক্সপেরিমেন্টাল লকারে। নভোচারীরা রোবটটি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করবেন আরও বছরখানেক পর।

প্রযুক্তি ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 3 August 2022, 01:40 PM
Updated : 3 August 2022, 01:40 PM

ভবিষ্যতের কোনো এক সময়ে চাঁদ, মঙ্গল বা আরও দূরের মহাকাশ যাত্রায় নভোচারীদের সঙ্গী হবে সার্জিকাল রোবট। সে লক্ষ্য অর্জনের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশন (আইএসএস)-এ যাচ্ছে সার্জিকাল রোবট ‘মিরা’।

২০২৪ সালেই মিরা আইএসএসে যাচ্ছে বলে মঙ্গলবারে ঘোষণা দিয়েছেন ইউনিভার্সিটি অফ নেব্রাস্কা-লিংকনের রোবটিক্স বিজ্ঞানীরা। আইএসএসের মধ্যাকর্ষণহীন পরিবেশে ‘মিনিয়েচারাইজড ইন ভিভো রোবোটিক অ্যাসিস্ট্যান্ট’ বা মিরার কার্যক্ষমতা নিয়ে পরীক্ষা চালাবেন নভোচারী ও গবেষকরা।

মিরাকে নিয়ে এক বিবৃতিতে বিজ্ঞানী শেন ফারিটর বলেন, “মানুষ মহাকাশের যতো দূরে আর গহীনে যেতে থাকবে, কোনো এক সময়ে মহাকাশেই অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন পড়বে তাদের।”

ইউনিভার্সিটি অফ নেব্রাস্কা-লিঙ্কনের প্রকৌশল বিষয়ের অধ্যাপক ফারিটর; পাশাপাশি মিরার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘ভার্চুয়াল ইনসিশন’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতাও তিনি।

২ পাউন্ড ওজনের রোবটটি দেখতে লম্বা সাদা রডের মতো, যার এক দিকে রয়েছে অনেকটা মানুষের হাতের মতো দুটি যন্ত্রাংশ। সার্জারি অথবা চিকিৎসার কাজে ব্যবহৃত দুটি টুল ধরার সক্ষমতা আছে হাতের অনুকরণে তৈরি অংশগুলোর।

প্রযুক্তিবিষয়ক সাইট সিনেট বলছে, প্রায় দুই দশকের গবেষণার ফসল এই রোবটটি। ২০০৬ সালে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর পর ১০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ পেয়েছে ভার্চুয়াল ইনসিশন। এ ছাড়াও, রোবটটিকে ২০২৪ সালে আইএসএসে পাঠানোর জন্য প্রস্তুত করতে সম্প্রতি কোম্পানিকে এক লাখ ডলার অনুদান দিয়েছে নাসা।

ইতোমধ্যেই পৃথিবীতে নিজের কার্যক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে মিরা; জটিল অস্ত্রোপচারে রোবটটি ব্যবহার করেছেন চিকিৎসকরা। কাটা-ছেঁড়া নূন্যতম পর্যায়ে রেখে রোগীর শরীর থেকে মলাশয়ের একাংশ বের করে নেওয়ার কাজটি কোনো জটিলতা ছাড়াই শেষ করেছে মিরা।

মহাকাশে পৃথিবীর মতো ঠিকঠাক কাজ করলে, জরুরী চিকিৎসার প্রয়োজনে মিরার শরণাপন্ন হবেন আইএসএসের নভোচারীরা। বিশেষ করে মহাকাশে জনশক্তি, সময় এবং প্রয়োজনীয় টুলের মতো সবকিছুরই ঘাটতি থাকায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে মিরা।

রোবটটি ব্যবহার করে পৃথিবীতে বসেই মহাকাশে থাকা রোগীর শরীরে অস্ত্রোপচার চালাতে পারবেন চিকিৎসকরা। এই কাজে মিরার সক্ষমতা যাচাই করতে ইতোমধ্যেই পরীক্ষা চালিয়ে সফল হয়েছে নাসা। নাসার নভোচারী ক্লেটন অ্যান্ডারসন হিউস্টনের জনসন স্পেপস সেন্টারে বসেই প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার দূরে ইউনিভার্সিটি অফ নেব্রাস্কার মেডিকাল সেন্টারে থাকা মিরাকে দিয়ে সার্জারির মতো নানা কাজ করিয়ে নিয়েছেন সফলভাবে।

কেবল মহাকাশে নয়, পৃথিবীতেও জরুরী পরিস্থিতিতে অথবা রণক্ষেত্রে আহত সৈনিকদের দ্রুত চিকিৎসা দিতে মিরার ব্যবহার উপযোগিতা বিবেচনা করে দেখার কথা জানিয়েছে সিনেট। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যেই মিরা প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী।

তবে, পরীক্ষাগারের সীমা ছাড়িয়ে বাস্তব দুনিয়ায় মিরার জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে ২০২৪-এর মহাকাশ যাত্রা। মিরার জন্য প্রথম চ্যালেঞ্জ হবে রকেটের ঝাঁকি আর মাধ্যাকর্ষণের টান। মহাকাশ যাত্রায় অক্ষত থাকলে আইএসএসে প্রথমে রোবটটির জায়গা হবে এক্সপেরিমেন্ট লকারে। নভোচারীরা রোবটটি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করবেন আরও বছরখানেক পর।

একবার চালু হয়ে গেলে কারও নির্দেশনা ছাড়াই নিজের মতো কাজ করতে থাকবে মিরা।

“নভোচারী একটি সুইচ ফ্লিপ করবেন, আর রোবটটি নিজেই নিজের কাজ করতে থাকবে। ঘণ্টা দুয়েক পরে নভোচারীরা সুইচ বন্ধ করে দিলেই কাজ থামিয়ে দেবে রোবটটি,” বলেন ফারিটর।

সাম্প্রতিক সময়ে মহাকাশে অস্ত্রোপচারের প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা বেড়েছে গবেষকদের মধ্যে। এপ্রিল মাসে শল্য চিকিৎসক ড. জোসেফ শ্মিডকে ‘হলোপোর্ট’ করে আইএসএসে নিয়েছিল নাসা। পৃথিবীতেই ছিলেন ড, শ্মিড, আর আইএসএসের নভোচারীরা কথা বলেছেন তার হলোগ্রাফিক উপস্থিতির সঙ্গে।

‘হলোপোর্ট’ প্রযুক্তির সঙ্গে মিরার সমন্বয় হলে অদূর ভবিষ্যতে হয়তো স্টার ট্রেকের মতো সয়েন্স ফিকশন গল্পের চিকিৎসা কৌশলগুলোই কার্যকর হবে বাস্তবের মহাকাশে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক