১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ডিপসিকে নজরদারি বাড়াচ্ছে বিভিন্ন দেশের সরকার, নিয়ন্ত্রকরা

ব্যবহারকারীর এআই প্রোগ্রামকে দেওয়া নির্দেশ বা আপলোড করা বিভিন্ন ফাইল চীনের কম্পিউটারে বা সার্ভারে সংরক্ষণ করে এআই কোম্পানিটি।

ডিপসিকে নজরদারি বাড়াচ্ছে বিভিন্ন দেশের সরকার, নিয়ন্ত্রকরা
আমেরিকানদের জন্য এ এআই পরিষেবা ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ করা যায় কি না তা নিয়েও আলোচনা চলছে। ছবি: রয়টার্স

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 07 Jan 2026, 03:04 PM

Updated : 26 Aug 2026, 05:31 PM

গেল বছরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার কেবল এক সপ্তাহ আগে সিলিকন ভ্যালিতে ঝড় তুলেছিল চীনা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই অ্যাপ ডিপসিক। রাতারাতি যুক্তরাষ্ট্রে অ্যাপল চার্টে সবচেয়ে বেশি ডাউনলোড হওয়া ফ্রি অ্যাপ হিসেবেও শীর্ষে উঠে আসে তারা।

ওই সময় কোম্পানিটি বলেছিল, তাদের নতুন চ্যাটবটটি কেবল ওপেনএআইয়ের এআই অ্যাপ চ্যাটজিপিটিরই প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং মডেলটি তৈরিতে খুব সামান্য অর্থই খরচ হয়েছে তাদের।

তবে এখন কোম্পানিটির নিরাপত্তা নীতিমালা ও প্রাইভেসি রক্ষার পদ্ধতি নিয়ে বিভিন্ন দেশের কড়া নজরদারি ও সমালোচনার মুখে পড়েছে ডিপসিক।

কোম্পানিটির নিজস্ব প্রাইভেসি নীতি অনুসারে, ব্যবহারকারীর অনেক ব্যক্তিগত তথ্য, বিশেষ করে এআই প্রোগ্রামকে দেওয়া নির্দেশ বা আপলোড করা বিভিন্ন ফাইল চীনের কম্পিউটারে বা সার্ভারে সংরক্ষণ করে এআই কোম্পানিটি।

অস্ট্রেলিয়া

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুতে নিরাপত্তা ঝুঁকির আশঙ্কায় সকল সরকারি ডিভাইসে ডিপসিক ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে অস্ট্রেলিয়া। দেশটির সরকারের ধারণা, অ্যাপটি ব্যবহারের ফলে তাদের জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে।

চেক রিপাবলিক

তথ্য নিরাপত্তার উদ্বেগের কারণে গেল বছরের জুলাইয়ে দেশের সরকারি প্রশাসনে চীনা এআই স্টার্টআপ ডিপসিক-এর সকল পরিষেবা ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে চেক সরকার। তাদের ধারণা, প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করলে সরকারি গোপন তথ্য ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

ফ্রান্স

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ফ্রান্সের ‘প্রাইভেসি ওয়াচডগ’ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বলেছে, ডিপসিককে জিজ্ঞাসাবাদ করবে তারা। কোম্পানিটির এআই সিস্টেম কীভাবে কাজ করে ও ব্যবহারকারীদের জন্য এতে কোনো প্রাইভেসির ঝুঁকি আছে কি না, সে সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেতেই এ পদক্ষেপ নিয়েছে দেশটি।

জার্মানি

জার্মানির তথ্য সুরক্ষা কর্তৃপক্ষের একজন কমিশনার গেল বছরের জুনে বলেছিলেন, তথ্য নিরাপত্তার উদ্বেগের কারণে অ্যাপল ও গুগলকে নিজেদের অ্যাপ স্টোর থেকে ডিপসিক সরিয়ে ফেলার অনুরোধ করেছে তারা। অ্যাপটি ব্যবহার করলে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য অনিরাপদ হয়ে পড়তে পারে।

ভারত

গত বছরের ফেব্রুয়ারির শুরুতে নিজেদের কর্মীদের দাপ্তরিক কাজে চ্যাটজিপিটি ও ডিপসিক-এর মতো এআই টুল ব্যবহার না করার নির্দেশ দিয়েছিল ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয়। সরকারি নথি ও তথ্যের প্রাইভেসি রক্ষার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটি।

ইতালি

চীনা এআই সিস্টেম ডিপসিকের বিরুদ্ধে চলা একটি তদন্ত শেষ করেছে ইতালির অ্যান্টিট্রাস্ট ওয়াচডগ বা এজিসিএম। কারণ কোম্পানিটি ব্যবহারকারীদের আগেভাগে বলেনি যে, এই এআই মাঝেমধ্যে ভুল বা মিথ্যা তথ্য দিতে পারে। পরে ডিপসিক কর্তৃপক্ষ ভবিষ্যতে এ বিষয়ে স্বচ্ছতা বজায় রাখার ও প্রয়োজনীয় সতর্কবার্তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে সংস্থাটি তাদের তদন্ত থামিয়েছে।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ব্যক্তিগত ডেটা ব্যবহার নিয়ে পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব উল্লেখ করে অ্যাপটি ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে ইতালি।

নেদারল্যান্ডস

গেল বছরের জানুয়ারির শেষ দিকে নেদারল্যান্ডসের প্রাইভেসি রক্ষা বিষয়ক সংস্থা বলেছিল, ডিপসিকের তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি নিয়ে তদন্ত শুরু করবে তারা। একইসঙ্গে ডাচ ব্যবহারকারীদের এই কোম্পানির সফটওয়্যার ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বানও জানিয়েছে সংস্থাটি।

সরকারি কর্মকর্তাদের অ্যাপটির ব্যবহারও নিষিদ্ধ করেছে দেশটির সরকার। নেদারল্যান্ডস সরকারের একজন মুখপাত্র জুলাইয়ের শেষদিকে বলেছিলেন, যেসব দেশের আক্রমণাত্মক সাইবার প্রোগ্রাম রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে দেশটির সরকারের যে নীতি আছে সেই অনুসারেই এ পদক্ষেপ নিয়েছে তারা।

রাশিয়া

ফেব্রুয়ারির শুরুতে ‘শেরব্যাংক’-কে চীনা গবেষকদের সঙ্গে যৌথ এআই প্রকল্পে কাজের নির্দেশ দিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। রয়টার্সকে এই তথ্য জানিয়েছেন রাশিয়ার বড় এই ব্যাংকের একজন শীর্ষ নির্বাহী।

যেখানে বিশ্বের অনেক দেশ নিরাপত্তার কারণে চীনা এআই (যেমন- ডিপসিক) নিয়ে কড়াকড়ি করছে, সেখানে রাশিয়া চীনের সাথে মিলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়া

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার তথ্য সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ বলেছিল, দেশটিতে ডিপসিক অ্যাপটি নতুন করে ডাউনলোড স্থগিত করেছে তারা। ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় দক্ষিণ কোরিয়ার সংস্থাটির কিছু নিয়ম মেনে চলতে কোম্পানিটি ব্যর্থ হয়েছে– এমন কথা ডিপসিক স্বীকার করে নেওয়ার পর এ ব্যবস্থা নিয়েছে দেশটি।

গত ফেব্রুয়ারির শুরুতে নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগের কারণে সাময়িকভাবে কর্মীদের জন্য ডিপসিক ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছিলেন দক্ষিণ কোরিয়ার শিল্পমন্ত্রী। এপ্রিলের শেষে পরিষেবাটি আবারও চালু হয়।

তাইওয়ান

ফেব্রুয়ারিতে নিজেদের সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে ডিপসিকের পরিষেবা ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে তাইওয়ান। কারণ অ্যাপটিকে নিরাপত্তার জন্য বড় এক ঝুঁকি হিসেবে দেখছে দেশটি। এ ছাড়া ডিপসিকে তথ্য সেন্সরশিপ ও ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য চীনে চলে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে তাইওয়ান।

যুক্তরাষ্ট্র

২০২৫ সালের এপ্রিলে নিউ ইয়র্ক টাইমস প্রতিবেদনে লিখেছিল, মার্কিন প্রযুক্তি কেনা থেকে ডিপসিককে দূরে রাখকে কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা বিবেচনা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। আমেরিকানদের জন্য এ পরিষেবা ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ করা যায় কি না তা নিয়েও আলোচনা চলছে।

ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথকে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন নয়জন মার্কিন আইনপ্রণেতার একটি দল। সেই চিঠিতে ডিপসিক’সহ বেশ কিছু চীনা প্রযুক্তি কোম্পানিকে পেন্টাগনের এমন এক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা, যা চীনা সামরিক বাহিনীকে সহায়তা করে বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০২৫ সালের অগাস্টে সাতজন রিপাবলিকান সিনেটর বাণিজ্য বিভাগকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন, তারা যেন ডিপসিকের মতো চীনা ওপেন-সোর্স বিভিন্ন এআই মডেলের মাধ্যমে তৈরি সম্ভাব্য তথ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিগুলো মূল্যায়ন করে দেখেন।