Published : 29 May 2026, 04:06 PM
বর্তমানে অনলাইন ডেটিং অ্যাপগুলো ভুয়া প্রোফাইল, ক্যাটফিশিং ও এআইয়ের কারসাজিতে এক বিপজ্জনক ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। ডিজিটাল দুনিয়ার এ জালিয়াতি ও প্রতারণা ঠেকাতে এবং মানুষকে আবার অনলাইনের বাইরে বাস্তব পৃথিবীর খাঁটি সম্পর্কের দিকে ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে বেশ কিছু নতুন ডেটিং স্টার্টআপ।
‘গিক মিট ক্লাব’ নামের এক ডেটিং স্টার্টআপের প্রতিষ্ঠাতা ডেনি স্মিথ বলেছেন, “বেশিরভাগ ডেটিং সাইটই কেবল মানুষের সংখ্যা বাড়ানোর পেছনে ছোটে, যেখানে অনেক ভুয়া প্রোফাইল থাকে, যা জালিয়াতি বা প্রতারণার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়।”
বিবিসি লিখেছে, লন্ডনের দক্ষিণে ক্রয়ডন এলাকার এক হেয়ারড্রেসিং সেলুনের মালিক স্মিথ। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, ‘অদ্ভুত স্বভাবের মানুষদের বড় বাজারকে’ লক্ষ্য করে ডেটিংয়ের ব্যবসায় তার পা রাখা উচিত।
সেই ভাবনা থেকেই ‘গিক মিট ক্লাব’ প্রতিষ্ঠা করেছেন স্মিথ, যেখানে তিনি সমমনা মানুষদের এক সুতায় বাঁধতে চেয়েছিলেন। সেইসঙ্গে অনলাইন ডেটিংয়ের জগৎকে নষ্ট করে ফেলা ভুয়া প্রোফাইলের বড় বাহিনীকে দূরে রাখতে চেয়েছেন।
‘গিক মিট ক্লাব’-এ আবেদনকারী প্রত্যেকটি প্রোফাইল স্মিথ নিজেই যাচাই-বাছাই করেন এবং এতে তিনি বেশ আনন্দও পান।
“আমি ভুয়া প্রোফাইল চট করে ধরে ফেলতে পারি। তবে মাঝেমধ্যে এমনটা খুবই সহজ হয়, যেমন একবার একজন আবেদনকারী যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের ছবি দিয়েছিলেন!”
তার ক্লাবের তিন হাজার তিনশ জন সদস্য যেন কোনো খারাপ বা আপত্তিকর আচরণের মুখোমুখি না হন সেজন্য তিনি প্রতি মাসে প্রায় ৫০টি আবেদন বাতিল করতেও দ্বিধা করেন না।
‘গিক মিট ক্লাব’ তৈরির মূল উদ্দেশ্য ডেটিং বা চেনা-জানার বিষয়টিকে অনলাইনের বাইরে বাস্তব পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা।
স্মিথ বলেছেন, “আমরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করি, প্রতি মাসে কুইজ প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করি। আমি কিছু জায়গা ভাড়া করতে চাই, যেখানে মানুষজন বিভিন্ন চরিত্রের পোশাক পরে আসতে পারবেন।”
কল্পবিজ্ঞান ঘরানার অনুষ্ঠানগুলোতে যেভাবে মানুষজন জমকালো ছদ্মবেশ বা পোশাক পরে আসেন, স্মিথের এ ভাবনাটি সেই ধরনের মানুষদেরই ইঙ্গিত করে তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেছেন, “কমিক ও সায়েন্স ফিকশন কনভেনশনগুলো এ ধরনের অদ্ভুত বা ইতিহাসপ্রেমী মানুষদের ভীষণভাবে আকর্ষণ করে।”
অনলাইন ডেটিং এখন প্রতারণা ও জালিয়াতির এক বিপজ্জনক ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে ‘গিক মিট ক্লাব’-এর মূল উদ্দেশ্য, মানুষ যেন যত দ্রুত সম্ভব একে অপরের সঙ্গে সামনাসামনি দেখা করতে পারে।
“আমি আমার সদস্যদের বলি, যত দ্রুত সম্ভব সামনাসামনি দেখা করুন; পার্কের ভেতর বা কোনো ব্যস্ত রাস্তায় বসে এক কাপ কফি খান। এতে সহজেই বুঝতে পারবেন সামনের মানুষটি আসলেই খাঁটি কিনা।”
এদিকে, ডেটিংয়ের নামে প্রতারকদের ছেঁটে ফেলার ভাবনা থেকে তৈরি হয়েছে ‘চেরি ডেটিং’। লন্ডন শহরের একজন ব্যাংকার জো মেসন এ আইডিয়াটি নিয়ে আসেন। ডেটিং সাইটগুলোর ভুয়া প্রোফাইল দেখতে দেখতে তিনিও একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন।
মেসন বলেছেন, “আপনি যখন এসব সাইটে কারও প্রোফাইল দেখেন তখন নিজেকেই প্রশ্ন করতে হয়, ‘এ মানুষটি কি আদৌ সত্যি?’। কারও সঙ্গে যোগাযোগ করার আগেই আপনাকে যেন একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ বা গোয়েন্দার মতো তার প্রোফাইল নিয়ে গবেষণা করতে হয়।”
অনলাইন ডেটিং কীভাবে মানুষকে হতাশ করে তার একটি তালিকাও দিয়েছেন তিনি।
মেসন বলেছেন, “কিছু মানুষ কেবল কাল্পনিক প্রেম করতে চান। তবে বাস্তবে আপনার সঙ্গে দেখা করার কোনো উদ্দেশ্য তাদের থাকে না। আবার কেউ কেউ বিবাহিত বা তারা কেবল অনলাইনেই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে পছন্দ করেন।”
ভুয়া ছবি বা মিথ্যা পরিচয় ব্যবহার করে কাউকে প্রেমের ফাঁদে ফেলার কৌশলকে বলে ‘ক্যাটফিশিং’, যা নানা রকমের হতে পারে।
মেসন বলেছেন, “কম ক্ষতিকর ক্যাটফিশিংয়ের ক্ষেত্রে হয়ত কেউ তার ১০ বছর আগের ছবি ব্যবহার করে। তবে কিছু মানুষ এমনও থাকে, যাদের চেহারার সঙ্গে ছবির কোনো মিলই নেই বা তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো ব্যক্তি।”
ডিজিটাল দুনিয়ার এ জালিয়াতি ঠেকাতে প্রযুক্তির সাহায্য নিয়েছে ‘চেরি ডেটিং’। অ্যাপটি বিশেষ এক সফটওয়্যারের মাধ্যমে ব্যবহারকারীর তাৎক্ষণিক সেলফির সঙ্গে নিজের ড্রাইভিং লাইসেন্স বা পাসপোর্টের ছবি মিলিয়ে দেখতে পারেন। ফলে নিশ্চিত হওয়া যায়, প্রতিটি সদস্য আসলেই আসল ও নির্ভরযোগ্য।
অনেক সম্ভাব্য সদস্যই আইডি যাচাইকরণের এ নিয়মটি দেখে কিছুটা ইতস্তত বা ভয় পান এবং সাইটে আর সামনে এগোন না। এ পদ্ধতিটি মেসনের ব্যাংকিং পেশার অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলে।
তিনি বলেছেন, “বড় ব্যাংকগুলো অ্যাকাউন্টের যে কোনো অসঙ্গতি বা জালিয়াতি ধরার জন্য এ ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করে।”
‘চেরি ডেটিং’ ব্যবহারকারীদের মানসিক মিল বা সামঞ্জস্যতা বোঝার জন্য কিছু প্রশ্ন করে এবং সেই অনুসারে একটি স্কোর দেয়। ফলে ব্যবহারকারীরা বুঝেশুনে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন যে, তারা অন্য কোনো ব্যক্তির সঙ্গে যুক্ত হবেন কি না।
মেসন বলেছেন, “কারো সঙ্গে যদি আপনার ৮০ শতাংশ মিল থাকে তবে সেটা দারুণ। এর মাধ্যমে যার সঙ্গে আপনার কেবল পাঁচ শতাংশ মিল রয়েছে তার পেছনে আপনার সময় নষ্ট হবে না।”
মেসনের করা এক গবেষণায় উঠে এসেছে, যুক্তরাজ্যের ৪৭ শতাংশ মানুষ মনে করেন কোনো ডেটিং অ্যাপই তাদের চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। অন্যদিকে, ৪০ শতাংশ মানুষ বলেছেন, ডেটিং অ্যাপগুলোর কারণে মানুষের সঙ্গে বাস্তবে দেখা করার আগ্রহ তাদের কমে গেছে।
এদিকে, জালিয়াতি প্রতিরোধে সেবা দেওয়া কোম্পানি ‘সামসাব’ যুক্তরাজ্যের দুই হাজার ডেটিং অ্যাপ ব্যবহারকারীর ওপর একটি জরিপ চালিয়েছে, যেখানে আরেকটি নতুন তথ্য বা অপরাধের কথা সামনে এসেছে।
জরিপে অংশ নেওয়া ৫৪ শতাংশ মানুষ স্বীকার করেছেন, তারা নিজেদের অনলাইন প্রোফাইলকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে এআই ব্যবহার করেছেন।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক টেক্সাসের ডেটিং কোচ ও ‘ডেটিং ক্লাসরুম’-এর প্রতিষ্ঠাতা জোসেলিন পেঙ্কু ভুয়া তথ্য ও এআইয়ের কারসাজিতে ভরা প্রোফাইলের এ বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি দূর করার চেষ্টা করছেন।
পেঙ্কু বলেছেন, “আমি মানুষকে তাদের ডেটিং কৌশল নিয়ে পরামর্শ দিই। আমার মূল লক্ষ্য সেইসব মানুষ, যারা জীবনে সফল হয়েছেন তবে সম্পর্ককে এতদিন খুব একটা গুরুত্ব দেননি।”
প্রযুক্তি খাতে কাজের অভিজ্ঞতা থাকায় তিনি অনলাইন ডেটিংয়ের বিরোধী নন।
টেক্সাসে নিজের পরিবারের সুন্দর এক উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেছেন, “আমার বাবার বয়স ৭৯ বছর এবং তিনি ‘আওয়ার টাইম’ নামের বয়স্কদের এক ডেটিং অ্যাপের মাধ্যমে তার বান্ধবীর খোঁজ পেয়েছেন।”
পেঙ্কুর মতে, নির্দিষ্ট পছন্দ বা আগ্রহের ওপর ভিত্তি করে তৈরি বিভিন্ন সাইট যেমন বেশি সফল হয় ঠিক তেমনই বয়সভিত্তিক সাইটগুলোর ক্ষেত্রেও তা সত্যি। তার কাজের জগতেও এআইয়ের বড় ভূমিকা রয়েছে।
তিনি বলেছেন, “অনেকেই নিজেকে সুন্দরভাবে প্রকাশ করতে পারেন না। ফলে যারা লিখতে পছন্দ করেন না তাদের জন্য কোপাইলট বা চ্যাটজিপিটি বেশ উপকারী।”
তবে এআইয়ের ক্ষেত্রে বরাবরের মতোই ভুল বা অস্পষ্ট নির্দেশনা দিলে ফল উল্টো হতে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, “এআইকে দেওয়া আপনার নির্দেশনা বা প্রম্পটগুলো অবশ্যই আপনার আসল চাওয়া ও মূল্যবোধের ওপর ফোকাস করা উচিত। ফলে আপনি যদি সিরিয়াস সম্পর্ক ও সংসার করতে চান তবে কোপাইলটকে তা স্পষ্ট করে বলুন।”
এ সমস্যার সমাধানে পেঙ্কুর পরামর্শ হচ্ছে, শুরু হতে যাওয়া সম্পর্কটিকে যত দ্রুত সম্ভব স্ক্রিন বা অনলাইনের বাইরে নিয়ে আসা। এ কারণেই তিনি মে মাসে তার কয়েকজন ক্লায়েন্টকে সঙ্গে নিয়ে কিছুদিনের জন্য আজোরেস দ্বীপে বেড়াতে গিয়েছিলেন।
পর্তুগাল থেকে মহাসাগরের প্রায় এক হাজার মাইল ভেতরে অবস্থিত এসব দ্বীপ যেমন তিমি দেখার সুযোগ করে দিয়েছে তেমনই নিজের জন্য সঠিক সঙ্গী কীভাবে খুঁজে পাওয়া যায় সে বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তা করারও দারুণ পরিবেশ তৈরি করেছে।