Published : 10 Aug 2026, 06:04 PM
রুটিন নিরাপত্তা পরীক্ষার সময় নিজেদের তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মডেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বেপরোয়া আচরণ করার কথা স্বীকার করেছে মার্কিন তিন এআই কোম্পানি ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক ও মেটা।
আমেরিকান সংবাদামধ্যম সিএনবিসি প্রতিবেদনে লিখেছে, এ ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনটি প্রযুক্তি জায়ান্টই ছোট এক ইসরায়েলি কোম্পানি ‘ইরেগুলার’-এর কথা উল্লেখ করেছে।
তিন বছর আগে ইসরায়েলের তেল আবিবে গঠিত এই নিরাপত্তা কোম্পানিটিতে জনপ্রিয় ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কোম্পানি ‘সিকোয়য়া’ ও ‘রেডপয়েন্ট’ ৮ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। গেল বছর এর বাজারদর দাঁড়িয়েছিল ৪৫ কোটি ডলারে।
বিভিন্ন এআই মডেলের সাইবার নিরাপত্তা পরীক্ষার প্ল্যাটফর্ম বা ‘টেস্টবেড’ হিসেবে কাজ করে এ কোম্পানির প্রযুক্তি।
শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন এআই মডেল দিন দিন যত বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠছে সেগুলোর ক্ষতিকর ভূমিকায় নামার সক্ষমতাও ততই সরকার ও বড় কর্পোরেট ও কোম্পানিগুলোর জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে যখন গুরুত্বপূর্ণ কম্পিউটার সিস্টেম ও অবকাঠামোতে অনুপ্রবেশের বা হ্যাকিংয়ের ঝুঁকি থাকে।
সাম্প্রতিক পরীক্ষায় ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক ও মেটা এই তিন কোম্পানিরই এআই মডেলগুলো নিরাপত্তা পরীক্ষা চলাকালে এমন সব ওয়েবসাইটে প্রবেশ করেছিল, যা তাদের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
ইরেগুলার-এর নাম বারবার উঠে আসার কারণ, তাদের প্ল্যাটফর্মেই এই মূল্যায়ন পরীক্ষাগুলো চালানো হচ্ছিল। গত ৪ অগাস্ট এক ব্লগ পোস্টে ওপেনএআই বলেছে, ইরেগুলারের পরীক্ষার পরিবেশের কনফিগারেশনে কিছু ত্রুটি ছিল, যা ‘এসব মডেলকে উন্মুক্ত ইন্টারনেটে প্রবেশের সুযোগ করে দিয়েছে’।
অন্যদিকে, এ ঘটনার এক সপ্তাহ আগে অ্যানথ্রপিক তাদের পোস্টে বলেছিল, ক্লড মডেলটি ইন্টারনেটে প্রবেশ করে থাকতে পারে– এমন তথ্য বিশ্লেষণ করে জানার পরপরই তারা ইরেগুলারকে সে বিষয়ে জানিয়েছে।
প্রযুক্তি দৌড়ে অন্য দুটি কোম্পানির চেয়ে পিছিয়ে থাকা মেটাও সম্প্রতি স্বীকার করেছে, ইন্টারনেটে প্রবেশ করে তাদের এআই মডেল এক থার্ড পার্টির সিস্টেমে অনুপ্রবেশ করেছে।
বিবৃতিতে মেটার একজন মুখপাত্র বলেছেন, তারা ইরেগুলারের কাছ থেকেই ঘটনাটি সম্পর্কে জেনেছেন এবং বিষয়টি তদন্ত করে দেখছেন।
“সব তথ্য হাতে পাওয়ার পর মেটা এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা প্রকাশ করবে।”
এ বিষয়ে ইরেগুলার বলেছে, এসব ঘটনা অ্যানথ্রপিকের মাধ্যমে প্রথম প্রকাশ করা ‘একই মূল্যায়ন-পরিবেশের সমস্যা’ থেকে ঘটেছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত ও নিরাপদে সাইবার পরীক্ষা চালানোর উপায় নিয়ে তারা একটি দিকনির্দেশনামূলক তথ্য তৈরি করছে।
কোম্পানিটির দাবি, “ঘটনাটিতে কোনো নিরাপত্তা বলয় ভেদ বা জটিল কোনো সাইবার কর্মকাণ্ডের বিষয় ছিল না।” বর্তমানে এই সংক্রান্ত কোনো অমীমাংসিত সমস্যা বা জটিলতা আর নেই।
ব্যবসায়িক স্টার্টআপ কোম্পানি ‘ভন’-এর এআই বিভাগের প্রধান সুদীপ ভিমিরেড্ডি বলেছেন, এসব নিরাপত্তা ত্রুটিই প্রমাণ করে, এআই প্রযুক্তি কতটা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এ শক্তিশালী প্রযুক্তির সুরক্ষাপ্রাচীর তৈরিতে সীমিত কিছু বিশেষজ্ঞ কোম্পানির ওপর নির্ভরশীলতার যে চাপ রয়েছে, সেটাও এখানে স্পষ্ট। তথ্য প্রশিক্ষণ, মডেলের সক্ষমতা যাচাই ও দুর্বলতা খুঁজতে নিরাপত্তা পরীক্ষা চালানোর ক্ষেত্রে বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন।
ভিমিরেড্ডি বলেছেন, মূল এআই নির্মাতা কোম্পানিগুলোকে আধুনিক নিরাপত্তা পরীক্ষায় সহায়তার মতো প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যে হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানির আছে, ইরেগুলার তার মধ্যে অন্যতম। অলাভজনক কোম্পানি ‘এমইটিআর’ ও ‘অ্যাপোলো রিসার্চ’-এর মতো কোম্পানির নামও উল্লেখ করেছেন তিনি।
“এসব মডেল পরীক্ষার ক্ষেত্রে কোনো কোম্পানিই নিজেদের পরীক্ষার নম্বর নিজেরা দিতে চায় না। ফলে তারা চায় কোনো স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তৃতীয় পক্ষ যেন এসব পরীক্ষা সম্পন্ন করে।”
‘ইরেগুলার’ আসলে কী?
২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ইরেগুলারের আগের নাম ছিল ‘প্যাটার্ন ল্যাবস’। এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড্যান লাহাভ আগে আইবিএম-এর এআই গবেষণা বিভাগে কাজ করেছেন এবং কোম্পানিটির প্রযুক্তি প্রধান ওমর নেভো দুবছরেরও বেশি সময় গুগলে কর্মরত ছিলেন।
বাজার পর্যবেক্ষক কোম্পানি ‘পিচবুক’-এর তথ্য অনুসারে, কোম্পানিটিতে বর্তমানে ৩৫ জনের মতো কর্মী রয়েছে।
গেল সেপ্টেম্বরে ইরেগুলার তাদের ৮ কোটি ডলারের তহবিল সংগ্রহের ঘোষণার সময় সিকোয়য়া’র পার্টনার শন ম্যাগুয়ার ও ডিন মেয়ার এক ব্লগ পোস্টে লিখেছিলেন, লাহাভ ও নেভোর নেতৃত্বাধীন দলটি ‘অন্যদের চেয়ে বেশি দূরদর্শী। তারা আধুনিক মডেলগুলোর ওপর সাইবার হামলার সক্ষমতা পরীক্ষা করে এবং সেগুলো বাজারে ছাড়ার আগেই সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলে’।
ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক ও মেটার সাম্প্রতিক এসব ঘটনা নিয়ে বেশ আলোচনা-সমালোচনা হলেও অনেক বিশেষজ্ঞ বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই দেখছেন।
ভিমিরেড্ডি বলেছেন, ঘটনাটিকে ‘একটু বেশিই বাড়িয়ে বলা হচ্ছে’। কারণ বাস্তব জগতের মতো বানিয়ে রাখা এ পরীক্ষার পরিবেশে এআই মডেলকে মূলত নিরাপত্তার ত্রুটি খুঁজে বের করতে বলা হয়েছিল। এ পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্যই ছিল সফটওয়্যারের এমন সব কোডিং ভুল বা কনফিগারেশনের সমস্যা ধরা, যা অজান্তেই ইন্টারনেটে সংযোগ তৈরি করে ফেলতে পারে।
তবে ভিমিরেড্ডি মনে করিয়ে দিয়েছেন, এআই মডেলটি যদি ইন্টারনেটে থাকা কোনো আসল সাইটে প্রবেশের উদ্দেশ্যে বানানো না হয়ে থাকে তবে ‘মূল বিভিন্ন গবেষণা কোম্পানি তাদের ইন্টারনেট ট্রাফিকের ওপর নজর রেখে পরীক্ষাটি সঙ্গে সঙ্গেই বন্ধ করে দিতে পারত’।
নিরাপত্তা কোম্পানি ‘ম্যাগনিচিউড’-এর প্রতিষ্ঠাতা বিজ্ঞানী গর্ডন রিওস পুরো প্রক্রিয়াটিকে বিজ্ঞানের ‘পরীক্ষামূলক নকশা’ বা এক্সপেরিমেন্টাল ডিজাইনের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
তিনি বলেছেন, আধুনিক বিভিন্ন এআই মডেলের সক্ষমতা ও অপ্রত্যাশিত আচরণের কারণে গতানুগতিক সফটওয়্যার পরীক্ষা ব্যবস্থা এখানে কার্যকর নাও হতে পারে। যেহেতু এআই মডেলগুলো প্রতিনিয়ত নতুন কৌশল শিখছে ফলে পরীক্ষার পরিবেশেই সফটওয়্যারের লুকিয়ে থাকা দুর্বলতা খুঁজে বের করা আশ্চর্যজনক নয়।
ঘটনাটি এখন ওয়াশিংটনের রাজনীতিতেও বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। গেল মাসে মার্কিন আইনপ্রণেতারা ‘এআই কিল সুইচ অ্যাক্ট’ নামের এক বিল উত্থাপন করেছেন, যেখানে বিভিন্ন এআই ল্যাবকে যে কোনো সময় তাদের মডেল বন্ধ, ধীরগতির বা সাময়িক স্থগিত রাখার ক্ষমতা বহাল রাখার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে।
ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিক উভয় কোম্পানি বলেছে, তারা ইরেগুলারের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে এবং ঘটনার পরবর্তী পর্যালোচনায় পূর্ণ সহযোগিতা করছে।