Published : 09 Aug 2026, 05:19 PM
২০৪০ সালের মধ্যে নেট জিরো বা শূন্য কার্বন নির্গমনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল মার্কিন ই কমার্স জায়ান্ট অ্যামাজন। সে প্রতিশ্রুতিতে বড় ধাক্কা আসছে কোম্পানিটির সাম্প্রতিক এক উদ্যোগ থেকে।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে নির্মাণাধীন তাদের নতুন বড় ডেটা সেন্টার প্রকল্পে বসানো হচ্ছে প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, যা শেষ পর্যন্ত এককভাবে দেশটির সবচেয়ে বড় কার্বন দূষণকারী কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট প্রতিবেদনে লিখেছে, টেক্সাসের প্যাকোস কাউন্টিতে পরিকল্পিত ডেটা সেন্টার ক্যাম্পাসের অংশ হিসেবে অন-সাইট গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিনিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে অ্যামাজন।
নিউ ইয়র্ক টাইমস ও জলবায়ুবিষয়ক গবেষণা আউটলেট ‘ডিসটিল্ড’-এর হাতে আসা নথিপত্র অনুসারে, বিদ্যুৎকেন্দ্রটি থেকে বছরে সর্বোচ্চ ৩ কোটি ৩০ লাখ টন কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমনের অনুমোদন মিলেছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমস প্রতিবেদনে লিখেছে, চূড়ান্তভাবে কেন্দ্রটি যদি এ অনুমোদিত মাত্রা ছুঁয়ে ফেলে তবে এটা হবে পুরো যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় জলবায়ু দূষণকারী একক উৎস।
এতে করে বর্তমানে শীর্ষে থাকা অ্যালাবামার ‘জেমস এইচ মিলার জুনিয়র’ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বার্ষিক ১ কোটি ৬০ লাখ টন কার্বন নির্গমনের রেকর্ড দ্বিগুণ ছাড়াবে।
এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র সবসময় এদের অনুমোদিত সর্বোচ্চ সক্ষমতার সমান নির্গমন করে না ও অ্যামাজনের প্রকল্পটির নির্মাণ কাজ এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
কোম্পানিটির দাবি, এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে টেক্সাসের স্থানীয় বাসিন্দাদের বিদ্যুতের বিল বাড়বে না।
বিবৃতিতে অ্যামাজনের একজন মুখপাত্র বলেছেন, “অ্যামাজন তার নিজস্ব কার্যক্রম চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের পূর্ণ খরচ বহনে বিশ্বাসী। প্যাকোস কাউন্টিতে আমাদের নতুন ডেটা সেন্টার ক্যাম্পাসটি ঠিক সেটাই করছে।
“অন-সাইট নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদনে চলবে এই ডেটা সেন্টার, যা টেক্সাসের বিভিন্ন পরিবারের বিদ্যুতের খরচ বাড়াবে না। জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযোগ পাওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এটাকে মূল গ্রিডে যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।”
অ্যামাজন বলেছে, তারা প্রকল্পের স্থানে সৌরশক্তি ও ব্যাটারি স্টোরেজ ব্যবহারের সুযোগ নিয়েও চিন্তাভাবনা করছে। এ প্যাকোস প্রজেক্টের মাধ্যমে ‘হাজার হাজার নতুন কর্মসংস্থান’ তৈরি হবে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুসারে, কোনো ডেটা সেন্টারের জন্য গ্রিড-বহির্ভূত বা অফ-গ্রিড নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনে এটাই অ্যামাজনের প্রথম বড় অংকের বিনিয়োগ।
এর মাধ্যমে মাইক্রোসফট, গুগল ও মেটার মতো প্রযুক্তি কোম্পানি হাইপারস্কেলার ডেটা সেন্টার অপারেটিং কোম্পানিগুলোর তালিকায় যোগ হল অ্যামাজন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের আকাশচুম্বী চাহিদা মেটাতে ডেটা সেন্টার চালু রাখার দৌড়ে এসব কোম্পানিও এবার জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎসে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে।
এ নতুন ডেটা ক্যাম্পাস অ্যামাজনের বহুল প্রচারিত জলবায়ুবিষয়ক প্রতিশ্রুতির ক্ষেত্রে আরেক নতুন জটিলতা তৈরি করল।
জীবাশ্ম জ্বালানি খাতের বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে কাজ করার কারণে অ্যামাজন দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচিত হয়ে আসছে। ২০১৯ সালে নিজেদের জলবায়ু প্রতিশ্রুতি বা ‘ক্লাইমেট প্লেজ’ ঘোষণার পর থেকে কোম্পানিটির কার্বন নির্গমনের মাত্রা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।
২০২৫ সালের টেকসই প্রতিবেদনে অ্যামাজন বলেছে, “আমরা স্বীকার করি, একটি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই কোম্পানিতে রূপান্তরিত হওয়ার পথটি সবসময় সোজা বা সহজ নয়। ২০২৫ সালে আমাদের কার্বন নির্গমন বাড়লেও টেকসইয়ের অঙ্গীকারে আমরা অটল।”
টেক্সাস প্রকল্পের বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যামাজন তাদের জলবায়ু প্রতিশ্রুতির বিষয়ে ইতিবাচক থাকার কথা পুনরায় ব্যক্ত করেছে। পাশাপাশি অঙ্গরাজ্যে এর আগে তাদের অর্থায়নে তৈরি হওয়া ৪০টি পরিবেশবান্ধব শক্তি প্রকল্পের কথা তুলে ধরেছে।
বর্তমানে বিভিন্ন ডেটা সেন্টার ক্রমাগত রাজনৈতিক তোপের মুখে পড়ছে। পরিবেশ দূষণ, বিপুল পরিমাণ পানির ব্যবহার থেকে শুরু করে স্থানীয় বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়ার মতো নানা বিষয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ছে এসব অবকাঠামো।
এ সপ্তাহেই টেক্সাস অঙ্গরাজ্য নতুন সব ডেটা সেন্টার প্রকল্পের ওপর সাময়িক স্থগিতাদেশ জারি করেছে, যতক্ষণ না অঙ্গরাজ্যটির বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রতিটি প্রস্তাবিত কেন্দ্র অডিট বা নিরীক্ষা করেছে।
বিবৃতিতে রিপাবলিকান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট বলেছেন, “এক কথায় বললে, টেক্সাসের নাগরিকদের স্বার্থই সবার আগে।”
টেক্সাস গভর্নরের কার্যালয় বলেছে, টেক্সাসের বিদ্যুৎ গ্রিডে যোগ হতে নতুন যেসব আবেদন এসেছে তার প্রায় ৯০ শতাংশই ডেটা সেন্টারের। এসব কেন্দ্রের জন্য প্রায় ৪৭৪ গিগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে, যা পুরো অঙ্গরাজ্যটিতে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদার রেকর্ডের তুলনায় পাঁচ গুণেরও বেশি।
এদিকে, ট্রাম্প প্রশাসন ডেটা সেন্টার নির্মাণপ্রক্রিয়া দ্রুতগতির করার জন্য নানা পদক্ষেপ জোরদার করছে। যার অংশ হিসেবে সরকারি জমি পুনরায় ব্যবহারের উদ্যোগও নিয়েছে।
তবে এসব ডেটা সেন্টার সাধারণ কেন্দ্রের চেয়ে বহুগুণ বেশি বিদ্যুৎ খরচ করায় বিশ্বজুড়ে জলবায়ু সংকট ঠেকানোর উদ্যোগকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ডেটা সেন্টারের চড়াও চাহিদা ও এর সঙ্গে জাতীয় গ্রিডে সংযোগ পাওয়া ও নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরির সূত্রতা সব মিলিয়ে বিকল্প পথের খোঁজে নেমেছে বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানি।
এ বিকল্প হিসেবে তারা নিজস্ব প্রযুক্তির গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ থেকে শুরু করে ভবিষ্যতের পারমাণবিক চুল্লিতেও বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে।