ইইউ এর নিয়ম মেনে চ্যাটজিপিটিতে জলছাপ জুড়ছে ওপেনএআই
প্রযুক্তিগত দিক থেকে এ জলছাপ কোনো দৃশ্যমান লোগো বা প্রতীক নয়, বরং মডেলের শব্দ চয়ন বা বাক্য গঠনের প্রক্রিয়ার ওপর সূক্ষ্মভাবে প্রভাব ফেলবে, যা দিয়ে অদৃশ্য প্যাটার্ন তৈরি হবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ইইউ-এর নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই আইন মেনে চলার অংশ হিসেবে চ্যাটজিপিটি ও কোডেক্সের মাধ্যমে তৈরি লেখার ভেতরে অদৃশ্য ওয়াটারমার্ক বা জলছাপ যোগের ঘোষণা দিয়েছে ওপেনইএআই।
সোমবার এক ব্লগ পোস্টে এআই কোম্পানিটি বলেছে, ইইউর স্বচ্ছতা সংক্রান্ত নীতিমালা বাস্তবায়নের জন্যই এ উদ্যোগ নিয়েছে তারা।
প্রযুক্তি সংবাদের সাইট টেকক্রাঞ্চ প্রতিবেদনে লিখেছে, এ বছরের গত ২ অগাস্ট থেকে কার্যকর হওয়া ইইউ এআই আইন বা স্বচ্ছতা বিধি অনুসারে, এআই দিয়ে তৈরি যে কোনো কনটেন্ট এমনভাবে চিহ্নিত করতে হবে যেন অন্য কোনো স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম সহজেই তা শনাক্ত করতে পারে।
ওপেনইএআই বলেছে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আওতাধীন এলাকার সব প্ল্যানের যোগ্য চ্যাটজিপিটি ও কোডেক্স ব্যবহারকারীদের জন্য এ জলছাপ সুবিধা চালু হবে।
আপাতত এটা কেবল ইইউর ভৌগোলিক সীমানার মধ্যেই সীমিত থাকছে। অন্যদিকে, বিশ্বের যে কোনো প্রান্তের ডেভেলপাররা সোমবার থেকেই তাদের এপিআই-এর নির্দিষ্ট মডেলে ফিচারটি চালু করতে পারবেন।
এটা ডিফল্টভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে ও এই মুহূর্তে বিশ্বজুড়ে টেক্সট ওয়াটারমার্ককে ডিফল্ট ফিচার হিসেবে চালুর কোনো পরিকল্পনা ওপেনএআইয়ের নেই।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে এ জলছাপ কোনো দৃশ্যমান লোগো বা প্রতীক নয়, বরং মডেলের শব্দ চয়ন বা বাক্য গঠনের প্রক্রিয়ার ওপর সূক্ষ্মভাবে প্রভাব ফেলবে, যা দিয়ে অদৃশ্য প্যাটার্ন বা বিন্যাস তৈরি হবে।
পাঠকরা খালি চোখে এটা ধরতে না পারলেও বিশেষ ডিটেক্টর বা শনাক্তকারী যন্ত্র তা সহজেই ধরে ফেলবে। যেহেতু এই চিহ্ন সরাসরি লেখার শব্দগুলোর ভেতরেই গেঁথে থাকে ফলে লেখাটি কপি ও পেস্ট করে অন্য কোথাও নিয়ে গেলেও জলছাপটি অপরিবর্তিত থাকবে।
ওপেনইএআই বলেছে, এ জলছাপের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তিগত ব্যবহারকারীকে চিহ্নিত করা সম্ভব নয় এবং এটা চালু রাখার কারণে এআই মডেলের কাজের গতি বা কার্যসক্ষমতায় কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
এ ঘোষণার পাশাপাশি ‘টেক্সটগ্রেইন’ নামের পদ্ধতিটির ওপর বিস্তারিত প্রযুক্তিগত প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছে ওপেনইএআই।
‘ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভানিয়া’ ও ‘ইয়েল ইউনিভার্সিটি’র গবেষকদের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “কীভাবে একটি গোপন চাবি ব্যবহার করে পরবর্তী শব্দের ভবিষ্যদ্বাণীগুলোকে সুবিন্যস্ত করে বাক্য সম্পন্ন করা যায়।”
এরকম শত শত সূক্ষ্ম পরিবর্তন বা নির্দেশকে একসঙ্গে যোগ করে একটিমাত্র মূল লেখা ও গোপন চাবির সাহায্যে যে কোনো এআইনির্মিত কনটেন্ট নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে পারে ডিটেক্টর।
সম্পাদনা বা এডিটিংয়ের মাধ্যমে কি এই জলছাপ মুছে ফেলা সম্ভব? ওপেনইএআইয়ের নিজস্ব পরীক্ষামূলক ফলাফল বলছে, হ্যাঁ, তা সম্ভব।
পরীক্ষায় দেখা গেছে, লেখার ১০ শতাংশ শব্দ সমার্থক শব্দ দিয়ে পরিবর্তন বা প্রতিস্থাপন করায় ডিটেক্টরের শনাক্তকরণের হার প্রায় ৯২ শতাংশ থেকে কমে ৬৬ শতাংশে নেমে এসেছে।
কোম্পানিটি বলেছে, ছোট অনুচ্ছেদ, অঙ্কের সমাধান ও অনুদিত বিভিন্ন লেখা শনাক্ত করা তুলনামূলকভাবে কঠিন।
“এসব সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করেই আমরা প্রাথমিক অবস্থায় কেবল অনুমোদিত গবেষক ও বিশেষজ্ঞ সংস্থাগুলোর কাছে ডিটেক্টর ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যারা এর নির্ভরযোগ্যতা ও দায়িত্বশীল ব্যবহার মূল্যায়নে আমাদের সহায়তা করতে পারবেন।”
একইসঙ্গে ওপেনইএআই সতর্ক করে বলেছে, ওয়াটারমার্ক না থাকলেই ‘তা মানুষের লেখা বলে প্রমাণ হয় না’। এর কারণ হতে পারে লেখাটি হয়ত খুব ছোট বা খুব বেশি সম্পাদনা করা হয়েছে বা এটা অন্য কোনো কোম্পানির এআই দিয়ে তৈরি।
“ওয়াটারমার্ক ইঙ্গিত দিতে পারে, একটি ওপেনইএআই সিস্টেম কোনো অনুচ্ছেদের অংশবিশেষ তৈরি বা প্রক্রিয়াজাত করেছে। তবে এর পেছনে ঠিক কতখানি মানুষের বিচারবুদ্ধি, সম্পাদনা বা সৃজনশীলতা কাজ করেছে তা এটা নির্ধারণ করতে পারে না।”
এর আগে, অ্যানথ্রপিক তাদের ক্লড চ্যাটবট দিয়ে তৈরি লেখায় বিশ্বজুড়ে জলছাপ যোগের ঘোষণা দিয়েছিল। এর দুই মাস পর ওপেনইএআই এই পদক্ষেপ নিল।
অ্যানথ্রপিকের ওই সিদ্ধান্ত সে সময় কিছু ক্লড ব্যবহারকারীর মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল। ব্যবহারকারীরা বলেছিলেন, মূল নির্দেশিকা, প্রেক্ষাপট ও সিদ্ধান্তগুলো তারাই দিয়েছেন আর ক্লড কেবল একটি টুল বা মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে।
ওয়াল স্ট্রিটের ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুসারে, এর আগে ওপেনইএআই টেক্সট ওয়াটারমার্ক তৈরি করলেও তা বাজারে ছাড়েনি। ব্যবহারকারীরা জলছাপহীন প্রতিদ্বন্দ্বী প্ল্যাটফর্মগুলোতে চলে যেতে পারে এমন আশঙ্কায় কোম্পানিটি তা স্থগিত রেখেছিল।
