Published : 30 Jul 2026, 11:55 AM
ফ্রান্স ও স্পেনে কয়েক দশকের মধ্যে ভয়াবহ দাবানলের মধ্যে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে নতুন এক বিপদ, যার নাম আগুনে মেঘ বা ফায়ার ক্লাউড।
বিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলা হয় পাইরোকিউমুলোনিম্বাস (Pyrocumulonimbus) বা পাইরোসিবি (pyroCb)।
সহজ কথায়, এটি বিশাল এক বজ্রঝড়ের মেঘ, যা দাবানলের প্রচণ্ড তাপ থেকে নিজে নিজেই তৈরি হয়।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, একবার তৈরি হলে এই মেঘ নিজেই আগুনকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে। ফলে আগুন দ্রুত ছড়ায়, নতুন নতুন স্থানে দাবানল শুরু হয় এবং পরিস্থিতি হয়ে ওঠে আরও অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক।
ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এবং স্পেনের মধ্যাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া দাবানলের কারণে ইতোমধ্যে তিন লাখের বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।
ফ্রান্সের জিরোন্দ অঞ্চলে ২২ জুলাই শুরু হওয়া এ দাবানল ইতোমধ্যে ৪২০ বর্গকিলোমিটার বনভূমি পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে, যা আয়তনে প্যারিস শহরের প্রায় চারগুণ।
এ আগুনে ধ্বংস হয়েছে প্রায় আড়াইশ ঘরবাড়ি; আহত হয়েছেন অন্তত ৮০ জন অগ্নিনির্বাপক কর্মী।
অন্যদিকে, স্পেনে মাদ্রিদের পশ্চিম ও দক্ষিণে প্রায় ৭৭০ বর্গকিলোমিটার এলাকা পুড়ে গেছে। এর মধ্যে আভিলা প্রদেশের দাবানলটি স্পেনের ইতিহাসে সবচেয়ে বড়, প্রায় ৫০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে জ্বলছে।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ একে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় দাবানল সংকট হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
এর মধ্যেই অগ্নিনির্বাপক কর্মীদের লড়তে হচ্ছে 'ফায়ার ক্লাউড' নামের এক বিরল অভিজ্ঞতার সঙ্গে। কী এই 'ফায়ার ক্লাউড', কীভাবে তা তৈরি হয়, 'ফায়ার ক্লাউড' কীভাবে বিপদ বাড়িয়ে তুলছে, সেসব তথ্য নিয়ে একটি এক্সপ্লেইনার প্রকাশ করেছে টাইম ম্যাগাজিন।
কী এই ‘ফায়ার ক্লাউড’?
যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা একসময় একে বলেছিল, ‘মেঘের আগুন-উগরে দেওয়া ড্রাগন’।
ফরাসি ন্যাশনাল সেন্টার ফর সায়েন্টিফিক রিসার্চের গবেষক জ্যঁ-ব্যাপতিস্ত ফিলিপি জানান, দাবানলের প্রচণ্ড তাপে ভূমির কাছের বাতাস অত্যন্ত দ্রুত ওপরে উঠতে থাকে। সেই উত্তপ্ত বাতাস, ধোঁয়া ও জলীয় বাষ্প মিলে প্রথমে পাইরোকিউমুলাস নামে একটি মেঘ তৈরি করে।
তাপ ও বায়ুমণ্ডলীয় পরিস্থিতি আরও অনুকূল হলে সেই মেঘ বিশাল বজ্রমেঘে পরিণত হয়, যাকে বলা হয় পাইরোকিউমুলোনিম্বাস বা ফায়ার ক্লাউড।
এই মেঘ ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত উচ্চতায় উঠে কখনও কখনও স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারেও পৌঁছে যেতে পারে।
কীভাবে তৈরি হয়?
এর গঠনপ্রক্রিয়া সাধারণ বজ্রঝড়ের মতই, তবে শক্তির উৎস সূর্যের তাপ নয়, বরং দাবানল।
আগুনের তাপে উত্তপ্ত বাতাস, ধোঁয়া ও আর্দ্রতা দ্রুত ওপরে উঠে যায়। ওপরে উঠে বাতাস ঠান্ডা হলে জলীয় বাষ্প ছাইয়ের ক্ষুদ্র কণাকে কেন্দ্র করে ঘনীভূত হয়।
দাবানলে ক্ষতিগ্রস্ত ফ্রান্সের জিরন্দ অঞ্চলের ল্য তঁপল এলাকায় একটি পুড়ে যাওয়া বাড়ি। ড্রোনের সহায়তায় গত ২৯ জুলাই ছবিটি তোলা হয়
আরও উপরে উঠে বরফকণায় পরিণত হলে তাদের সংঘর্ষে বৈদ্যুতিক চার্জ সৃষ্টি হয়। সেখান থেকেই তৈরি হতে পারে বজ্রপাত।
আবহাওয়াবিদ থিওডোর এম জিয়ান্নারোসের ভাষায়, “বিশাল বড় এবং উত্তপ্ত একটি ক্যাম্পফায়ারের কথা ভাবুন, যার ধোঁয়া আকাশে উঠে ঝড়ের মেঘে পরিণত হচ্ছে। সেটাই পাইরোসিবি।”
ফায়ার ক্লাউডের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হল, এটি আগুনকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
মেঘ তৈরি হলে তার ভেতরের শক্তিশালী ঊর্ধ্বমুখী ও নিম্নমুখী বায়ুপ্রবাহ আগুনের চারপাশে প্রবল বাতাস সৃষ্টি করে। তাতে আগুনের দিক হঠাৎ বদলে যেতে পারে, আগুন একাধিক অংশে বিভক্ত হতে পারে কিংবা মুহূর্তে নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।
একই সঙ্গে বজ্রপাত মূল দাবানলের বাইরে নতুন নতুন জায়গায় আগুন লাগাতে পারে। জ্বলন্ত কাঠ, ছাই ও অঙ্গার অনেক দূরে উড়ে গিয়ে নতুন দাবানলের সূত্রপাত ঘটাতে পারে।
ফিলিপি বলেন, এখানে একটি ‘ফিডব্যাক লুপ’ কাজ করে। আগুন যত বড় হয়, মেঘ তত শক্তিশালী হয়; আবার শক্তিশালী মেঘ আগুনকে আরও বাড়িয়ে দেয়। ফলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
গবেষকদের মতে, দাবানলের ধোঁয়ার কণার কারণে অনেক সময় বৃষ্টির ফোঁটা মাটিতে পৌঁছানোর আগেই উত্তপ্ত বাতাসে বাষ্প হয়ে যায়। তখন শক্তিশালী নিম্নমুখী বায়ুপ্রবাহ ও বজ্রপাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলে আগেও ফায়ার ক্লাউডের দেখা মিলেছিল; তবে ইউরোপে এটি তুলনামূলক বিরল।
ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিরন্দ অঞ্চলে দেশটির ইতিহাসে প্রথমবারের মত একটি পাইরোকিউমুলোনিম্বাস মেঘের উৎপত্তি নথিভুক্ত করেছে দেশটির দমকল কর্তৃপক্ষ।
|
সাল |
দেশ/অঞ্চল |
প্রভাব ও তথ্য |
|
২০২৩ |
কানাডা |
রেকর্ডসংখ্যক ১৪২টি ফায়ার ক্লাউড তৈরি হয়েছিল। |
|
২০১৯-২০ |
অস্ট্রেলিয়া |
'ব্ল্যাক সামার' দাবানলে ফায়ার ক্লাউডের কারণে ৩০ কিলোমিটার দূরে জ্বলন্ত অঙ্গার গিয়ে পড়ে। এতে ৩৩ জন নিহত ও ১১ মিলিয়ন হেক্টর জমি পুড়ে যায়। |
|
২০২১ |
যুক্তরাষ্ট্র |
ক্যালিফোর্নিয়া এবং পার্শ্ববর্তী অঙ্গরাজ্যগুলোতে দাবানলের সময় ফায়ার ক্লাউড দেখা যায়। |
|
২০১৭ |
পর্তুগাল |
ইউরোপের দেশটিতে প্রাণঘাতী দাবানলের সময় এই মেঘের উপস্থিতি রেকর্ড করা হয়। |
বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে তাপ ও জলীয় বাষ্প—দুটিই বাড়ছে। তাতে একদিকে দাবানলের ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে বজ্রঝড় সৃষ্টির উপযোগী পরিবেশও বেশি তৈরি হচ্ছে।
ফলে দাবানল ও ঝড়–এ দুই উপাদান একসঙ্গে উপস্থিত থাকার সম্ভাবনা আগের তুলনায় বেড়ে যাচ্ছে। আর এ কারণেই ভবিষ্যতে ইউরোপেও ফায়ার ক্লাউডের মত ঘটনা আরও ঘন ঘন দেখা যেতে পারে বলে সতর্ক করছেন গবেষকরা।
স্পেনের জামোরা প্রদেশের ফরমারিজ এলাকার কাছে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া দাবানল নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন এক অগ্নিনির্বাপক কর্মী
এ কারণেই ফ্রান্স, স্পেনসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে দাবানল মোকাবিলায় নতুন প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে।
ফ্রান্সে ভবনের আশপাশে বাধ্যতামূলকভাবে ঝোপঝাড় পরিষ্কার রাখার নিয়মে জোর দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে স্পেন চালু করেছে নতুন জাতীয় অগ্নিঝুঁকি সূচক, যেখানে আবহাওয়ার তথ্যের পাশাপাশি স্যাটেলাইটের মাধ্যমে উদ্ভিদ, মাটির আর্দ্রতা ও ভূমি ব্যবহারের তথ্য বিশ্লেষণ করে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা শনাক্ত করা হচ্ছে।