Published : 09 Aug 2026, 01:07 PM
শিশু নিপীড়নমূলক কনটেন্ট ছড়ানোর অভিযোগে জনপ্রিয় মেসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রাম’কে বারবার অ্যাপ স্টোর থেকে সরিয়ে দিলেও একই ধরনের অভিযোগে ইলন মাস্কের এক্স’কে বারবার ছাড় দিচ্ছে প্রযুক্তি কোম্পানি অ্যাপল।
প্রযুক্তি খাতের দুই বড় প্ল্যাটফর্মের ক্ষেত্রে অ্যাপলের এই স্পষ্ট দ্বিমুখী নীতি ও রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক দেখা দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ভার্জ।
শিশু যৌন নিপীড়নমূলক কনটেন্টর উপস্থিতি শনাক্তের জের ধরে টেলিগ্রাম’কে সাময়িকভাবে অ্যাপ স্টোর থেকে সরিয়ে দেয় অ্যাপল।
বিতর্কিত কনটেন্ট মুছে ফেলার পর অ্যাপটি পুনরায় ফিরিয়ে আনা হলেও অ্যাপলের কনটেন্ট মডারেশন বা তথ্য নিয়ন্ত্রণ নীতি ও বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের ক্ষেত্রে অসমান আচরণ নিয়ে কথা উঠেছে।
এ সপ্তাহে প্রায় এক ঘণ্টার জন্য অ্যাপলের অ্যাপ স্টোর থেকে হঠাৎ গায়েব হয়ে যায় বিশ্বজুড়ে ১০০ কোটিরও বেশি মানুষের ব্যবহৃত সামাজিক প্ল্যাটফর্ম টেলিগ্রাম, বিশেষ করে যেসব দেশে কড়া সেন্সরশিপ ও সামাজিক বিধিনিষেধ রয়েছে সেসব দেশের মানুষের কাছে নিরাপদ যোগাযোগের প্রধান আশ্রয় হওয়ায় হঠাৎ এর অনুপস্থিতি ব্যবহারকারীদের মধ্যে বড় উদ্বেগ তৈরি করেছিল।
পরবর্তীতে অ্যাপল খোলসা করেছে, শিশু যৌন নিপীড়নমূলক বেআইনি উপাদান পাওয়ার কারণেই তারা প্ল্যাটফর্মটি সাময়িকভাবে মুছে দিয়েছিল। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্ম থেকে বিতর্কিত কনটেন্ট পুরোপুরি সরিয়ে ফেলা হলে অ্যাপ স্টোরে টেলিগ্রামের উপস্থিতি পুনর্বহাল করা হয়।
টেলিগ্রামকে নিয়ে অ্যাপল দ্রুত ব্যবস্থা নিলেও ইলন মাস্কের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এর বেলায় তাদের ছাড় দেওয়ার ইতিহাস রয়েছে।
এক্স-এর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই গ্রক ব্যবহার করে শিশুদের বিকৃত ও যৌন উদ্দীপক ছবি বা ডিপফেইক তৈরি হয়ে পুরো প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়লেও সেটিকে অ্যাপ স্টোর থেকে সরানোর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি অ্যাপল।
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্ল্যাটফর্মভেদে এই ধরনের সিদ্ধান্তের পেছনের কারণটি প্রযুক্তিগত নয়, বরং রাজনৈতিক।
অ্যাপলের এ দ্বিমুখী আচরণের বিষয়ে ‘জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি’র আইন ও প্রযুক্তি বিষয়ের অধ্যাপক অনুপম চন্দর বলেছেন, “আপনি যখন বড় ও প্রভাবশালী প্ল্যাটফর্মের বিরুদ্ধে পুরো কনটেন্ট মডারেশন নীতি প্রয়োগ করতে যাবেন তখন এর থেকে তৈরি হওয়া সম্ভাব্য বড় ধরনের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়ার ঝুঁকি আপনাকেই নিতে হবে।”
দুবাইভিত্তিক কোম্পানি টেলিগ্রাম শুরু থেকেই তথ্যের সেন্সরশিপ বা মডারেশনের বিষয়ে শিথিল নীতি ধরে রাখার জন্য পরিচিত।
অন্যদিকে, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘এক্স’কে অ্যাপ স্টোর থেকে সরালে অ্যাপলকে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে যে ভয়াবহ ঝড় বা চাপের মুখে পড়তে হত টেলিগ্রামের ক্ষেত্রে সেই রাজনৈতিক ঝুঁকি ছিল না। ‘এ পার্থক্যের কারণেই একই ধরনের বা তার চেয়েও স্পর্শকাতর ঘটনার পরেও আলাদা নীতি প্রয়োগ করেছে অ্যাপল’।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারের পক্ষ থেকে টেলিগ্রামের ওপর কড়াকড়ি আরোপের চাপ ও কনটেন্ট সরিয়ে নেওয়ার দাবি ক্রমাগত বাড়ছে।
২০১৭ সালে ইন্দোনেশিয়া সরকারের নিষেধাজ্ঞার হুমকির পর ‘সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কিত কনটেন্ট’ মুছতে শুরু করে টেলিগ্রাম। ২০২২ সালে উসকানিমূলক ও বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য ছড়ানোর অভিযোগে অ্যাপটি নিষিদ্ধের কথা বিবেচনা করেছিল জার্মানি।
পরিস্থিতি সবচেয়ে জটিল আকার ধারণ করে ২০২৪ সালে। ওই সময় ফ্রান্সে টেলিগ্রামের রুশ বংশোদ্ভূত প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও পাভেল দুরভকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে অবৈধ লেনদেন ও শিশু নিপীড়নমূলক কনটেন্ট ছড়ানোর ক্ষেত্রে ‘সহযোগি’ হওয়ার অভিযোগ আনে ফরাসি কর্তৃপক্ষ।
এ ছাড়া গেল মাসে রাশিয়া দুরভের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদে সহায়তার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করে। ক্রেমলিনের দাবি, ইউক্রেনীয় গোয়েন্দারা রাশিয়ায় হামলার পরিকল্পনা করতে টেলিগ্রাম ব্যবহার করছে। যার জবাবে একটি ভিডিওতে দুরভ ক্যামেরার দিকে নিজের মধ্যাঙ্গুলি প্রদর্শনের ছবি পোস্ট করে প্রতিবাদ জানান।
এসব চাপের মুখে টেলিগ্রাম তাদের কনটেন্ট মডারেশন বা তথ্য নিয়ন্ত্রণ নীতিতে কড়া পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়েছে। প্রাইভেট মেসেজিং মডারেশনের ক্ষেত্রে নিজেদের কঠোর অবস্থানের কথা বলেছে তারা।
‘আশপাশের ব্যবহারকারীদের খুঁজে বের করার’ সুবিধাসহ কয়েকটি বিতর্কিত ফিচার বন্ধ এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে ব্যবহারকারীদের তথ্য চেয়ে আদালতের দেওয়া নির্দেশে সাড়া দিতে শুরু করেছে। পাশাপাশি বেআইনি কনটেন্ট শনাক্তে নজরদারি বাড়িয়েছে অ্যাপটি।
আইন ও প্রযুক্তি বিশ্লেষক অধ্যাপক অনুপম চন্দর বলেছেন, “টেলিগ্রামের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে এক্সের রাজনৈতিক ভিত্তি ও সমর্থন বেশি শক্তিশালী। টেলিগ্রামকে অ্যাপ স্টোর থেকে সরানোর চেয়ে এক্স’কে সরালে অ্যাপলকে যে ভয়াবহ রাজনৈতিক ঝড়ের মুখে পড়তে হত তা তারা এড়াতে চেয়েছে।
এর আগেও, ২০১৮ সালে শিশু যৌন নির্যাতনমূলক কনটেন্টের কারণে টেলিগ্রামকে সাময়িকভাবে অ্যাপ স্টোর থেকে সরিয়ে দিয়েছিল অ্যাপল। তবে বেআইনি কনটেন্টের ক্ষেত্রে টেলিগ্রামের বিরুদ্ধে অ্যাপল কঠোর হলেও এক্সের ক্ষেত্রে দেখিয়েছে ভিন্ন নীতি।
গেল বছরের শেষদিকে এক্সের এআই চ্যাটবট গ্রক ব্যবহার করে ছবি এডিটের সুবিধা চালু করা হলে পুরো প্ল্যাটফর্মে পূর্ণ বয়স্ক ও শিশুদের বিকৃত যৌন উদ্দীপক ডিপফেইক ছবি ছড়িয়ে পড়ে।
এ ঘটনার পর যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বজুড়ে চরম ক্ষোভের তৈরি হয় এবং অ্যাপল ও গুগলের অ্যাপ স্টোর থেকে এক্স’কে ফেলে দেওয়ার দাবি ওঠে।
সম্মতি ছাড়া ডিপফেইক ছবি তৈরির অভিযোগে এক্স ও এর এআই কোম্পানি ‘এক্সএআই’-এর বিরুদ্ধে মামলাও ঠুকে দেন মাস্কের সন্তানের মা অ্যাশলে সেন্ট ক্লেয়ার ও একদল টিনএজার।
এতসব বৈশ্বিক চাপ ও আইনি জটিলতার পরও এক্স’কে অ্যাপ স্টোর থেকে সরায়নি অ্যাপল, বরং পর্দার আড়ালে তাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে পরিবর্তন আনার অনুরোধ জানিয়ে আসছে আইফোন নির্মাতা কোম্পানিটি।
মার্কিন সিনেটরদের কাছে পাঠানো অ্যাপলের এক চিঠির বরাত দিয়ে এনবিসি নিউজ বলেছে, এক্স ও এর এআই চ্যাটবট গ্রকের তৈরি ডিপফেইক কেলেঙ্কারির পর নানা অভিযোগ ও সংবাদ দেখে অ্যাপল স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে।
এনবিসি নিউজের প্রতিবেদন অনুসারে, সংশ্লিষ্ট ডেভেলপারদের অবিলম্বে তাদের ‘কনটেন্ট মডারেশন’ বা তথ্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার উন্নতির জন্য স্পষ্ট পরিকল্পনা জমা দিতে বলে অ্যাপল।
পরবর্তীতে অ্যাপল বলেছে, এক্স তাদের নীতিমালার লঙ্ঘন অনেকটাই সমাধান করেছে। তবে গ্রকের টিমকে সতর্ক করে অ্যাপল বলেছে, প্রয়োজনীয় পরিবর্তন না আনলে অ্যাপ স্টোর থেকে তাদের সরিয়ে দেওয়া হতে পারে।
এই বিতর্কের মুখে এ বছরের জানুয়ারিতে মাস্ক বিবৃতিতে বলেছেন, “বেআইনি কোনো উপাদান প্রকাশের ক্ষেত্রে সাধারণ নিয়ম যেমন, গ্রক ব্যবহার করে অবৈধ কনটেন্ট তৈরি করলেও ব্যবহারকারীকে ঠিক একই পরিণতি ভোগ করতে হবে।”
গ্রক ব্যবহার করে শিশুদের বিকৃত ছবি তৈরি ও ছড়ানোর অভিযোগে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে সরাসরি মামলাও করেছে মাস্কের এআই কোম্পানি এক্সএআই। বিতর্ক চলাকালীন এক্স বা গ্রক কোনোটিকেই অ্যাপ স্টোর থেকে সরায়নি অ্যাপল।
অনুপম চন্দর বলেছেন, “এক্স’কে অ্যাপ স্টোর থেকে ফেলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হলে তা একেবারেই সর্বোচ্চ পর্যায়, অর্থাৎ অ্যাপলের সিইও বা পরিচালনা পর্ষদ থেকে আসতে হবে। এমন সিদ্ধান্তের ফলে মাস্কের মতো ক্ষুব্ধ ব্যক্তিত্বের মুখে পড়া এবং রাজনৈতিক পরিণতি ভোগের মানসিক প্রস্তুতি অ্যাপলকে নিতে হত।”
অ্যাপল ভালো করেই জানে মাস্ককে চটালে কী হতে পারে। ২০২২ সালে টুইটার (বর্তমান এক্স) কেনার পরপরই মাস্ক প্রকাশ্যে অভিযোগ এনেছিলেন, অ্যাপল নাকি অ্যাপ স্টোরে তাদের সীমিত করার চেষ্টা করছে। সেই বিতর্কের জল বেশিদূর গড়ায়নি। অ্যাপল সিইও টিম কুক সরাসরি অ্যাপল কার্যালয়ে মাস্ককে স্বাগত জানান এবং মুখোমুখি আলোচনার মাধ্যমে সেই ‘ভুল বোঝাবুঝি’র অবসান ঘটান।
অন্যদিকে, টেলিগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা দুরভ দাবি করেছেন, টেলিগ্রামের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার আগে অ্যাপল তাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগই করেনি। দুইটি অ্যাপের ক্ষেত্রে এমন স্পষ্ট বৈষম্যমূলক ও ভিন্ন আচরণের বিষয়ে অ্যাপল আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি নয়।
অ্যাপ স্টোর থেকে কোনো অ্যাপ সরানো বা রাখার ক্ষেত্রে তারা ঠিক কীভাবে কাজ করে, সেই ভেতরের প্রক্রিয়াটি অ্যাপল সবসময়ই গোপন রাখে।
সাম্প্রতিক এসব ঘটনায় ইঙ্গিত মেলে, অ্যাপলের কড়া নীতিমালার মধ্যেও নমনীয়তা রয়েছে, প্রতিপক্ষ হিসেবে বিশ্বের ট্রিলিয়নেয়ার যখন এতে যোগ থাকেন তখন তো বটেই!