Published : 15 Mar 2026, 12:09 PM
অ্যানথ্রপিক ও পেন্টাগনের মধ্যকার সাম্প্রতিক দ্বন্দ্ব এআই প্রযুক্তির সামরিক ব্যবহার নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। গত এক দশকে গুগল ও ওপেনএআইয়ের মতো বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো যুদ্ধের কাজে প্রযুক্তি ব্যবহারে যে কঠোর নৈতিক অবস্থান নিয়েছিল বর্তমানে ভূ-রাজনীতি ও ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার চাপে তা দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান লিখেছে, অ্যানথ্রপিক ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনের মধ্যকার বিরোধ প্রযুক্তি জগতকে আবারও এক কঠিন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে, যুদ্ধের কাজে প্রযুক্তি কীভাবে ব্যবহৃত হবে ও এর সীমা কতটুকু?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সময় সিলিকন ভ্যালির চিন্তাধারায় পরিবর্তন ও প্রতিরক্ষা খাতে বড় বড় চুক্তির ফলে বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানির মনোভাব গত দশ বছরের তুলনায় অনেক বদলেছে।
তিন দিন আগে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে অ্যানথ্রপিকের বিরোধ আরও তীব্র হয়। প্রতিরক্ষা দপ্তরের বিরুদ্ধে মামলা করেছে কোম্পানিটি। তাদের দাবি, সরকারি কাজ থেকে তাদের কালো তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা বাক স্বাধীনতার লঙ্ঘন।
গেল কয়েক মাস ধরেই দুই পক্ষ দ্বন্দ্বে জড়িয়ে আছে। অ্যানথ্রপিক চায় না তাদের তৈরি এআই গণ-নজরদারি বা মানুষের নিয়ন্ত্রণহীন কোনো মারাত্মক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত হোক।
অ্যানথ্রপিকের যুক্তি, পেন্টাগনের সব শর্ত মেনে নেওয়া তাদের মূল নিরাপত্তা নীতির পরিপন্থী। এতে প্রযুক্তির অপব্যবহার হতে পারে। এর মাধ্যমে কোম্পানিটি এক নৈতিক সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে, যা অন্যান্য প্রযুক্তি কোম্পানি মেনে চলবে কি না তা এখন দেখার বিষয়।
এ লড়াই এআইয়ের অপব্যবহার নিয়ে পুরোনো বিভিন্ন উদ্বেগ সামনে আনলেও আরও একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে যে, বর্তমানে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানির সম্পর্ক আগের চেয়ে অনেক বেশি গভীর হয়েছে।
ডেভেলপারদের প্ল্যাটফর্ম ‘হাগিং ফেইস’-এর নীতি গবেষক মার্গারেট মিচেল বলেছেন, “মানুষ যদি এখানে এমন কাউকে খোঁজে, যে যুদ্ধকে মোটেও সমর্থন করেন না তবে তারা হতাশ হবেন। কারণ এখানে পুরোপুরি ‘ভালো’ বা ‘মন্দ’ বলে কিছু নেই।”
সামরিক প্রতিবাদ থেকে সামরিক চুক্তির পথ
বর্তমানে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সামরিক খাতের প্রতি এ বিশেষ ঝোঁকের পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে এসব কোম্পানির সখ্যতা ও অনেক বড় কোম্পানির প্রধান নির্বাহীদের সরাসরি সমর্থন প্রযুক্তি খাতকে সরকারের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
এ ছাড়া, ট্রাম্প প্রশাসন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে সরকারি বিভিন্ন সংস্থাকে ঢেলে সাজানোর যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তা বিভিন্ন এআই কোম্পানির সামনে দীর্ঘমেয়াদি আয়ের বড় এক সুযোগ তৈরি করেছে। পাশাপাশি চীনের প্রযুক্তিগত উন্নতি নিয়ে উদ্বেগ ও বিশ্বজুড়ে সামরিক ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এ শিল্পের মনোভাব বদলেছে।
অথচ কিছুদিন আগেও সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কোনো ক্ষতিকর প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করাকে অনেক প্রযুক্তি কর্মীই এক ‘নিষিদ্ধ সীমা’ বা ‘রেড লাইন’ হিসেবে দেখতেন।
২০১৮ সালে গুগলের হাজার হাজার কর্মী পেন্টাগনের ‘প্রজেক্ট ম্যাভেন’ নামের এক প্রোগ্রামের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করেছিলেন। এ প্রজেক্টের কাজ ছিল ড্রোন থেকে পাওয়া ভিডিও ফুটেজ এআই দিয়ে বিশ্লেষণ করা।
সে সময় তিন হাজারেরও বেশি কর্মী এক খোলা চিঠিতে লিখেছিলেন, “আমরা বিশ্বাস করি, গুগলের যুদ্ধ ব্যবসায় জড়ানো উচিত নয়।”
প্রতিবাদের মুখে ওই সময় ‘প্রজেক্ট ম্যাভেন’ আর নবায়ন না করার সিদ্ধান্ত নেয় গুগল এবং এমন এক নীতিমালা তৈরি করে যেখানে বলা হয়, তারা এমন কোনো প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করবে না, যা ‘মানুষের সরাসরি ক্ষতির কারণ হতে পারে’।
প্রজেক্ট ম্যাভেন নিয়ে প্রতিবাদের পর থেকে গুগল তাদের কর্মীদের আন্দোলনের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করেছে। ২০১৮ সালে তাদের নীতিমালায় অস্ত্র তৈরির প্রযুক্তি নিষিদ্ধ করার যে ভাষা ছিল তা সরিয়ে ফেলেছে।
বর্তমানে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে অনেকগুলো চুক্তি সই করেছে মার্কিন সার্চ জায়ান্টটি। ২০২৪ সালে ইসরায়েলি সরকারের সঙ্গে গুগলের সামরিক সম্পর্কের প্রতিবাদ করায় প্রতিষ্ঠানটি তাদের ৫০ জনেরও বেশি কর্মীকে ছাঁটাই করেছে।
এ ঘটনার পর গুগলের প্রধান নির্বাহী সুন্দার পিচাই কর্মীদের এক মেমো পাঠিয়ে বলেছিলেন, গুগল এক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং এটি কোনো ‘বিতর্কিত বিষয়ে লড়াই বা রাজনীতি নিয়ে আলোচনার জায়গা নয়’।
এ সপ্তাহে গুগল ঘোষণা করেছে, তারা নিজেদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই জেমিনাই সামরিক বাহিনীকে ব্যবহারের সুযোগ দেবে। এর মাধ্যমে সামরিক বাহিনী বিভিন্ন সাধারণ প্রজেক্টের জন্য ‘এআই এজেন্ট’ তৈরি করতে পারবে।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালের আগে নিজেদের এআই মডেল সামরিক কাজে ব্যবহারের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছিল চ্যাটজিপিটি নির্মাতা ওপেনএআই। বর্তমানে তাদের প্রধান পণ্য কর্মকর্তা মার্কিন সামরিক বাহিনীতে থাকা অবস্থায় লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদমর্যাদায় ‘এক্সিকিউটিভ ইনোভেশন কোর’-এ দায়িত্ব পালন করছেন।
গেল বছর গুগল, অ্যানথ্রপিক ও ইলন মাস্কের এআই স্টার্টআপ এক্সএআই-এর পাশাপাশি ওপেনএআইও প্রতিরক্ষা দপ্তরের সঙ্গে প্রায় ২০ কোটি ডলারের এক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
যেদিন মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ অ্যানথ্রপিককে ‘সাপ্লাই-চেইন ঝুঁকি’ বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা করেন ঠিক সেই দিনই ওপেনএআই প্রতিরক্ষা দপ্তরের সঙ্গে একটি নতুন চুক্তি করে, যার ফলে তাদের প্রযুক্তি এখন গোপন সামরিক সিস্টেমেও ব্যবহৃত হবে।
প্রযুক্তি জগতের অন্য প্রান্তে প্যালান্টির ও অ্যান্ডুরিল-এর মতো যুদ্ধংদেহী মনোভাবের বিভিন্ন কোম্পানি পেন্টাগনের সঙ্গে পার্টনারশিপকে তাদের ব্যবসার প্রধান ভিত্তি হিসেবে গড়ে তুলেছে।
২০১৮ সালে গুগলের সেই প্রতিবাদের এক বছর আগেই অ্যান্ডুরিল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এসব কোম্পানি সিলিকন ভ্যালির রাজনীতিকে তাদের নিজেদের চিন্তাধারার দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
অনেক আগে থেকেই সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কাজ করে আসছে প্যালান্টির। ২০১০-এর দশকের শুরুতে আফগানিস্তানে পুঁতে রাখা বিস্ফোরক শনাক্তের জন্য তারা সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাকে প্রযুক্তি দিয়ে সহায়তাও করেছিল।
গত বছর একটি বই প্রকাশ করেছেন প্যালান্টির-এর প্রধান নির্বাহী অ্যালেক্স কার্প। সেই বইয়ের বড় অংশ জুড়ে তিনি প্রযুক্তি শিল্প ও এআইকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যোগ করার পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। বইটির এক জায়গায় তিনি ২০১৮ সালে প্রতিবাদকারী গুগল কর্মীদের ‘নৈরাজ্যবাদী’ বলেও বর্ণনা করেছেন।
২০১৯ সালে গুগল যখন ‘প্রজেক্ট ম্যাভেন’ চুক্তিটি ছেড়ে দেয় তখন প্যালান্টির তা গ্রহণ করে। ওয়াশিংটন পোস্টের তথ্য অনুসারে, ‘ম্যাভেন’ এখন এক গোপন সিস্টেমের নাম, যা ব্যবহার করে সামরিক কর্মকর্তারা অ্যানথ্রপিকের ক্লড এআই মডেলটি ব্যবহার করেন।
যুদ্ধের ময়দানে অ্যানথ্রপিক
পেন্টাগনের সঙ্গে বিরোধের জেরে অ্যানথ্রপিক সাধারণ মানুষের প্রশংসা পেলেও কোম্পানির সহ প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী ডারিও আমোদেই জোর দিয়ে বলেছেন, এআই কোম্পানি ও সরকার একই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে চায়।
বৃহস্পতিবার এক ব্লগ পোস্টে আমোদেই লিখেছেন, “প্রতিরক্ষা দপ্তরের সঙ্গে অ্যানথ্রপিকের পার্থক্যের চেয়ে মিলই অনেক বেশি।”
হোয়াইট হাউস অ্যানথ্রপিককে ‘চরম বামপন্থী’ বা ‘ঔক’ কোম্পানি হিসেবে অভিযুক্ত করলেও যুদ্ধে এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে আমোদেইয়ের ভাবনা মোটেও পুরোপুরি যুদ্ধবিরোধী নয়।
জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক দীর্ঘ প্রবন্ধে আমোদেই সতর্ক করে বলেছেন, এআই ব্যবহার করে প্রাণঘাতী জৈব অস্ত্র তৈরি হতে পারে এবং চীন এ প্রযুক্তির অপব্যবহার করলে তা বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
একইসঙ্গে তিনি যুক্তি দিয়েছেন, একনায়কতান্ত্রিক শত্রুদের ঠেকানোর জন্য গণতান্ত্রিক বিভিন্ন দেশের সরকার ও সামরিক বাহিনীকে সবচেয়ে উন্নত এআই প্রযুক্তি দিয়ে শক্তিশালী করা উচিত।
এআই ব্যবহারের ফলে যুদ্ধ করা বা মানুষ মারা সহজ হয়ে যাবে এ নিয়ে আমোদেই যতটা না চিন্তিত তার চেয়ে বেশি চিন্তিত এই প্রযুক্তির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে। তিনি ভয় পাচ্ছেন, অল্প কিছু মানুষের হাতে অটোনমাস ড্রোন বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা বা ‘বোতামে আঙুল’ রাখার সুযোগ চলে গেলে তবে সেটিই হবে বড় বিপদ।
আমোদেইয়ের প্রবন্ধটিতে পেন্টাগনের সঙ্গে তার বিরোধের মূল বিষয়গুলোর আভাস মিলেছিল, যার মধ্যে অন্যতম গণ-নজরদারির কাজে এআই ব্যবহারের ঝুঁকি।
এআইয়ের অপব্যবহার ঠেকাতে ঢাল তৈরির পক্ষে যুক্তি দিলেও তিনি বলেছেন, জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এ প্রযুক্তি সবভাবেই ব্যবহার করা যেতে পারে। ব্যতিক্রম হিসাবে তিনি জুড়ে দিয়েছেন, ‘কেবল সেইসব ক্ষেত্র ছাড়া, যা আমাদের একনায়কতান্ত্রিক শত্রুদের মতো করে তুলবে’।
আমোদেই এখন পর্যন্ত কোম্পানির নির্ধারিত ‘রেড লাইন’ বা সীমানাগুলো মেনে চললেও বারবার বলেছেন, তিনি চান অ্যানথ্রপিক প্রতিরক্ষা দপ্তরের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাক। প্রতিরক্ষা দপ্তরের বিরুদ্ধে করা মামলা থেকেই বোঝা যায়, কোম্পানিটি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কাজ করতে ও তাদের প্রয়োজনে নিজেদের পণ্য পরিবর্তন করতে কতটা আগ্রহী।
ক্যালিফোর্নিয়ায় করা মামলায় অ্যানথ্রপিক বলেছে, “সাধারণ গ্রাহকদের জন্য ক্লড ব্যবহারের ক্ষেত্রে যেসব বিধিনিষেধ থাকে সামরিক বাহিনীর ব্যবহারের ক্ষেত্রে অ্যানথ্রপিক সেই একই নিয়ম চাপিয়ে দেয় না।
“ক্লড গভ সংস্করণটি সামরিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো অনুরোধ বাতিলের প্রবণতা কম দেখায়, যেমন গোপন নথি পর্যালোচনা করা, সামরিক অভিযান পরিচালনা বা হুমকি বিশ্লেষণের মতো কাজগুলো, যা সাধারণ প্রেক্ষাপটে নিষিদ্ধ।”
ইরানের বিরুদ্ধে বোমাবর্ষণ অভিযানে লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন ও বিশ্লেষণের জন্য মার্কিন সরকার ক্লড ব্যবহার করছে এবং এ কাজে অ্যানথ্রপিকের কোনো আপত্তি আছে বলে মনে হয় না।
গত সপ্তাহে কোম্পানির ওয়েবসাইটে দেওয়া এক ব্লগ পোস্টে আমোদেই দাবি করেছেন, সামরিক বাহিনীর কোনো অভিযানগত সিদ্ধান্তে তার কোম্পানির কোনো ভূমিকা নেই। অ্যানথ্রপিক যুক্তরাষ্ট্রের সম্মুখসমরের যোদ্ধাদের সমর্থন করে এবং তাদের প্রযুক্তি দিয়ে সহায়তা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
“আমরা প্রতিরক্ষা দপ্তরকে বলেছি, আমরা সব ধরনের ব্যবহারের পক্ষেই আছি। তারা যা যা করতে চায় তার ৯৮ বা ৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রেই আমাদের সম্মতি আছে, কেবল দুটি বিষয় ছাড়া।”