নোনা ও মিঠা পানির প্রাণীদের জন্য বন্ধুদের সংকেত পাঠানো, চারপাশে নজরদারী বা শত্রু শনাক্ত করতে সবচেয়ে কার্যকর এবং কখনও কখনও একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে এই পানি।
Published : 13 Jun 2024, 02:35 PM
আমরা অনেকেই হয়তো জানি না, শব্দ কীভাবে পানির নিচে কাজ করে বা জলজ প্রাণীদের জীবনকে প্রভাবিত করে।
কীভাবে শব্দ পানির নিচে প্রাণীদের জীবনে প্রভাব ফেলে সে সম্পর্কে সাম্প্রতিক এক লেখায় ধারণা দিয়েছেন বিজ্ঞানবিষয়ক লেখক আমোরিনা কিংডন। নটিলাস সাময়িকীতে প্রকাশিত ওই লেখায় কী বলেছেন তিনি- আসুন দেখে নেই।
আমোরিনা কিংডন শুরুতেই বলেছেন, শব্দ বাতাসের মতো পানিতে একইরকমভাবে চলাচল করে না।
আত্মকথন রীতিতে ওই লেখায় তিনি বলেছেন, বেশিরভাগ মানুষের মতো আমিও ভেবেছিলাম, শব্দ পানিতে ভালভাবে কাজ করতে পারে না। তার উপর আবার ফরাসি নৌ অফিসার, সমুদ্রবিজ্ঞানী, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও লেখক জ্যাঁক কৌস্টো নিজেই সমুদ্রকে এক ‘নিঃশব্দ পৃথিবী’ আখ্যা দিয়েছেন। আমি ভেবেছিলাম, তিমি মাছের বাইরে বোধহয় জলজ প্রাণীরা খুব একটা শব্দের ব্যবহার করে না।
তবে, আমি অসম্ভব ভুল ছিলাম।
পানিতে একটি শব্দ তরঙ্গ সাড়ে চারগুণ দ্রুত চলাচল করতে পারে ও বাতাসের তুলনায় কম শক্তি হারায়। ফলে, বাতাসের তুলনায় পানিতে শব্দ অনেক দূর পযন্ত যেতে পারে ও দ্রুততর চলাচল করতে পারে, এমনকি আরও ভালভাবে তথ্য বয়ে নিয়ে যায়।
সমুদ্রের পানির ঘনত্বের ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন স্তর বিভাজন হয়। আর এই ভিন্নতার কারণে পানিতে ঘূর্ণী তৈরি হয়। আর এসবের ওপর সার্বিকভাবে প্রভাব ফেলে পানির গভীরতা, তাপমাত্রা ও লবণাক্ততা। পদার্থবিদ্যায় পারদর্শী পাঠকরা জানেন, যে মাধ্যমের মধ্যদিয়ে শব্দ চলাচল করে তার ঘনত্ব এর গতিকে প্রভাবিত করে।
তাই শব্দ তরঙ্গ সমুদ্রের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে এদের গতি পরিবর্তিত হয়। ফলে পানিতে জটিল প্রতিফলন বা প্রতিসরণ ঘটে ও বিভিন্ন শব্দ তরঙ্গকে ‘নালা’ ও ‘চ্যানেল’-এ পরিণত করে। আর সঠিক পরিস্থিতিতে এসব নালা ও চ্যানেল শব্দ তরঙ্গ শত শত এমনকি হাজার হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত বয়ে নিয়ে যেতে পারে।
সংবেদনশীলতার ওপর নির্ভরশীল অন্যান্য ঘটনা, বিশেষ করে যেগুলো স্পর্শ ও স্বাদনির্ভর, সেগুলো সমুদ্রের পানিতে কীভাবে কাজ করে? যেসব রাসায়নিক উপাদান ঘ্রাণ বহন করে তা বাতাসের তুলনায় পানিতে ধীর গতিতে চলে। পাশাপাশি পানি খুব সহজে আলো শোষণ করে এর দৃশ্যমানতা কমিয়ে দেয়। এমনকি উপকূলীয় ঘোলা পানি ছাড়াও স্বচ্ছ সমুদ্রে আলো কয়েকশো মিটারের নিচে পৌঁছায় না এবং খালি চোখে দেখা যায় কেবল ৭০-৮০ মিটার পর্যন্ত।
এই বৈশিষ্ট্যের কারণে নোনা ও মিঠা পানির প্রাণীদের জন্য বন্ধুদের সংকেত পাঠানো, চারপাশে নজরদারী বা শত্রু শনাক্ত করতে সবচেয়ে কার্যকর এবং কখনও কখনও একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে এই পানি।
আরও আছে! ভূমিকম্প, কাদা ধ্বসে যাওয়া ও আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপের অনেক আওয়াজই মানুষের শ্রবণ সীমার বাইরে। এইসব শব্দ সমুদ্রের পানির মধ্যে দিয়ে চলাচল করে। এর মধ্যে রয়েছে বরফে ফাটল ধরার আওয়াজ, ঢেউয়ের হিস হিস গর্জন, বৃষ্টির ফোঁটা টলমলের শব্দ। আপনি যদি মনোযোগ সহকারে শোনেন তবে ঝড়ের সময় সমুদ্রের আওয়াজ থেকে আপনি বাতাসের গতি, বৃষ্টিপাত ও পানির ফোঁটার আকারও বলে দিতে পারবেন। এমনকি তুষারপাতেরও নিজস্ব শব্দ রয়েছে।
সাগর কখনোই নীরব ছিল না। আর এর গভীরে গেলে শব্দ শোনার বিষয়টি তথ্য পাওয়ার জন্য কার্যকর, কখনও কখনও একমাত্র উপায় হতে পারে।
কান ছাড়াও শোনার অনেক উপায় আছে
যে কোনো প্রাণীর শব্দ শোনার জন্য কান থাকতে হবে, তাই কী? পানিতে থাকা প্রাণীদের বিবর্তনের ইতিহাস থেকে ধারণা মেলে, পানিতে বসবাসকারী শুরুর দিকের প্রাণীদের চুলের কোষ হিসেবে বিবেচিত কিছু একটা অঙ্গের বিবর্তন ঘটে। সহজভাবে বললে, এগুলো ছোট আকারের ‘হেয়ার’ বা চুলের বান্ডলযুক্ত কাঠামো, যা শারীরিকভাবে বাঁকা হয়ে দেহের সঙ্গে যুক্ত নিউরনের নিচে একটি সংকেত পাঠায়।
জলজ স্তন্যপায়ী প্রাণীদের কানের ভেতরেও এসব চুলের কোষের বৈশিষ্ট্য রয়েছে, বিশেষ করে তিমি মাছের। এদের সর্পিল-আকৃতির কক্লিয়া বা কানের ভাগে এ ধরনের চুল আছে। তবে এসব চুলের কোষ দেহের অন্যান্য জায়গা ও সামুদ্রিক প্রাণীর বিভিন্ন অঙ্গেও দেখা যায়। স্কুইডের মতো অনেক অমেরুদণ্ডী প্রাণীর ‘স্ট্যাটোসিস্ট’ নামের অঙ্গে চুলের কোষ থাকে, যা এরা ভারসাম্য ও অভিযোজনে ব্যবহার করে।
যেখানে ‘হেয়ার’ বাঁকানোর সুবিধা আছে সেখানে শব্দ শনাক্ত করার সম্ভাবনাও রয়েছে। শব্দ এখানে একটি চাপ তরঙ্গ হিসেবে কাজ করে এবং শব্দ তরঙ্গের মাধ্যমে ধাক্কা দেওয়া পানির বিভিন্ন অণু জলজ প্রাণীদের সেই ছোট চুলকে বাঁকিয়ে দিতে পারে। এভাবেই অনেক কানবিহীন প্রাণী শব্দ শুনতে পায়।
তবে, অবশ্যই মাছেরও কান আছে, যেটি ‘কানকো’ হিসেবে পরিচিত। এই অঙ্গটি শব্দ শনাক্ত করার বিশেষ একটি অঙ্গ। আসলে মাছদেরও প্রথম কান বিবর্তিত হয়েছিল, তবে তা স্তন্যপায়ী প্রাণীদের থেকে কিছুটা আলাদা। স্তন্যপায়ীদের মতো মাছদের কান তিনটি অংশে বিভক্ত নয়।
হট্টগোল বা হৈ চৈ সমুদ্রের প্রাণীদের জন্য ক্ষতিকর
‘সিং লাইক ফিশ’ বইটি লেখা শুরু করার আগে আমার জানা ছিল না, শব্দ কীভাবে প্রাণীদের জন্য ক্ষতিকর। পানিতে তেল ছড়িয়ে পড়া ও উষ্ণতার বিভিন্ন প্রভাব আমি বুঝতে পারি। তবে হট্টগোল বা হৈ চৈ কেমন প্রভাব ফেলে? মৌলিকভাবে সামুদ্রিক জীবন শব্দের উপর অনেক বেশি নির্ভরশীল।
‘নয়েজ’ একটি প্রযুক্তিগত শব্দ। এমনকি এটি একেবারেই অবাঞ্ছিত একটি শব্দ, যেখানে কোনো সংকেতে এটি বাধা দেয়। ‘নয়েজ’ সরাসরি কোনো প্রাণীকে শারীরিকভাবে ক্ষতি না করলেও এটি ওই প্রাণীর কাছে আসা সংকেতটিকে অস্পষ্ট করে দেয়। যেমন– একটি প্রাণী যেভাবে নিজের জগতকে বোঝার চেষ্টা করে যেখানে ‘নয়েজ’ দূরত্বকে কমিয়ে দিতে পারে। এমনকি কোনো জলজ প্রাণীর কাছাকাছি চলে আসা শিকারীর উপস্থিতি টের পাওয়ার শব্দকেও বাধাগ্রস্থ করতে বা পুষ্টিকর কোনো শিকার ধরার ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সংকেতকে বাধা দেয় ‘নয়েজ’। পাশাপাশি জাহাজের উচ্চ শব্দ অমেরুদণ্ডী প্রাণীর চুলের কোষকেও ক্ষতিগ্রস্থ করে, এমনকি ভেঙে দেয়। ফলে জলজ প্রাণীরা কেবল বধির নয়, বরং নিস্তেজ বা দিশেহারাও হয়ে যায়।
অনেক জলজ প্রাণী বিশেষ করে তিমি মাছ তাদের সন্তানদের ধরে রাখার জন্য শব্দ ব্যবহার করে। ‘নয়েজ’-এর কারণে এরা অপরকে খুঁজে পাওয়ার কোনও উপায় ছাড়াই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
আমরা যখন ভাবতে বসি, কীভাবে শব্দ পানির নিচে কাজ করে ও বিস্ময়কর বিভিন্ন উপায়ে এটি পানির ক্ষুদ্রতম জীবনকেও প্রভাবিত করে তখন আমরা বুঝতে পারি, আমাদের মানবিক অনুভূতিগুলোকে পৃথিবী ঠিক কতটা এড়িয়ে যায় এবং কতটা গভীরভাবে আমরা অজানাতে অনধিকার প্রবেশ করি।