১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

দক্ষিণ আমেরিকার সিলিকন ভ্যালি হবে প্যারাগুয়ে?

অধিকাংশ দেশ বিশ্বমানের একটি প্রযুক্তি খাত গড়তে তুলতে চাইলেও প্যারাগুয়ের এক বিশেষ সুবিধা রয়েছে। দেশটি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব বিদ্যুতের প্রাচুর্য।

দক্ষিণ আমেরিকার সিলিকন ভ্যালি হবে প্যারাগুয়ে?
প্যারাগুয়ে এত বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করে যে তাদের কাছে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ থাকে। ছবি: রয়টার্স

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 13 Oct 2025, 06:48 PM

Updated : 26 Aug 2026, 02:28 PM

প্যারাগুয়ে নিজেকে দক্ষিণ আমেরিকার প্রযুক্তি কেন্দ্র বা উদ্ভাবনের হাব হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। ঠিক যেমনভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালি বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের প্রতীক হয়ে উঠেছে অনেকটা সেভাবেই।

ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার মধ্যবর্তী এ দেশে বড় হয়েছেন গ্যাব্রিয়েলা সিবিলস। প্যারাগুয়ে ‘প্রযুক্তিতে খুব একটা উন্নত না’ এমন ধারণা নিয়েই বড় হয়েছেন তিনি। তবে, এখন তার লক্ষ্য, প্যারাগুয়েকে দক্ষিণ আমেরিকার সিলিকন ভ্যালি হিসেবে গড়ে তোলা।

সিবিলসের জন্য সবকিছু একটু আলাদা ছিল। কারণ তার মা-বাবা প্রযুক্তি খাতে কাজ করতেন। ফলে ওই সময়ই তিনি আমেরিকায় গিয়ে পড়াশোনার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলে’ থেকে কম্পিউটিং ও নিউরোসায়েন্সে পড়াশোনা করেছেন সিবিলস।

স্নাতকোত্ততের পর সান ফ্রান্সিসকোর কাছে সিলিকন ভ্যালিতে আট বছর কাজের পাশাপাশি আমেরিকান বিভিন্ন স্টার্টআপে নানা পদে কাজের অভিজ্ঞতাও হয়েছে তার। তবে স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে থাকার বদলে কয়েক বছর আগে তিনি প্যারাগুয়েতে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন।

বর্তমানে দেশটিতে বৃহৎ ও সফল প্রযুক্তি খাত গড়ে তোলার কাজের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি। সিবিলসের লক্ষ্য, ৭০ লাখ মানুষের এই দেশকে বিশ্ব মানচিত্রে তুলে ধরা ও বিশ্বসেরা বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানিকে আকৃষ্ট করা।

বর্তমানে গ্লোবাল প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ কোম্পানি ‘সিবেরসন্স’-এর পার্টনার সিবিলস, যার সদর দফতর প্যারাগুয়ের রাজধানী আসুনসিয়নে।

সিবিলস বলেছেন, “আমি নিজের চোখে দেখেছি প্রযুক্তি কীভাবে জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে। সিলিকন ভ্যালির সেই ভিন্ন দুনিয়ার সঙ্গে পরিচিত হয়ে, আমার দায়িত্ব হচ্ছে সেই চিন্তাধারাটি ফিরিয়ে নিয়ে এসে প্যারাগুয়ের প্রতিভার সঙ্গে মিলিয়ে কাজ করা।”

বিবিসি লিখেছে, অধিকাংশ দেশ বিশ্বমানের একটি প্রযুক্তি খাত গড়তে তুলতে চাইলেও প্যারাগুয়ের এক বিশেষ সুবিধা রয়েছে। দেশটি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব বিদ্যুতের প্রাচুর্য। কারণ, প্যারাগুয়ে বর্তমানে জলবিদ্যুৎ থেকে শতভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদন করে।

জলবিদ্যুৎটি মূলত ‘পরানা’ নদীর উপর নির্মিত বিশাল ইটাইপু বাঁধের ওপর তৈরি, যা প্যারাগুয়ে ও ব্রাজিল সীমান্তের অংশ। এই বিশাল জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি প্যারাগুয়ের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ৯০ শতাংশ ও ব্রাজিলের ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করে থাকে।

প্যারাগুয়ে এত বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করে যে তাদের কাছে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ থাকে। এর কারণেই দেশটিতে বিদ্যুতের দাম দক্ষিণ আমেরিকার অন্যান্য দেশের তুলনায় সবচেয়ে কম। একইসঙ্গে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পরিবেশবান্ধব শক্তি রপ্তানিকারক দেশ প্যারাগুয়ে।

প্যারাগুয়ে সরকার আশা করছে, দেশের সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব বিদ্যুতের প্রাচুর্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানিকে আকৃষ্ট করবে, বিশেষ করে যারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই কম্পিউটিং-এর বিশাল শক্তি চাহিদার দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে তাদের বেলায়।

প্যারাগুয়ের সফটওয়্যার উন্নয়ন উদ্যোক্তা সেবাস্টিয়ান অর্তিজ-চামোরো বলেছেন, “কেউ যদি এআই ডেটা সেন্টার বা অন্য কোনো প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে চান তাহলে মনে রাখবেন যে, জলবিদ্যুৎ হচ্ছে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য ও স্থিতিশীল শক্তির উৎস।”

“বায়ু বা সৌর শক্তির মতো অন্যান্য পুনবায় ব্যবহারযোগ্য শক্তির তুলনায় জলবিদ্যুৎ এক্ষেত্রে অনেক বেশি কার্যকর। কারণ এটি স্থিতিশীলভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। ফলে এটি ডেটা সেন্টার বা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল এমন কোনো বিদ্যুৎ-বহুল কাজের জন্য উপযোগী।”

তিনি আরও বলেছেন, ইটাইপু ও প্যারাগুয়ের আরেকটি বড় সরকারি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ইয়াসিরেতা বাঁধের পাশাপাশি বেসরকারি বিভিন্ন কোম্পানিও সহজেই তাদের নিজস্ব ছোট ছোট জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে পারে।

গত বছর ক্যালিফোর্নিয়া সফরে প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনা মার্কিন সার্চ জায়ান্ট গুগল ও চ্যাটজিপিটির নির্মাতা ওপেনএআইয়ের মতো বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে কথা বলেছেন এবং প্যারাগুয়েতে বিনিয়োগের জন্য তাদেরকে উৎসাহিত করেছেন। এসব বড় প্রযুক্তি কোম্পানি দেশটিতে বড় আকারে কার্যক্রম শুরু করবে কি না সেটিই এখন দেখার বিষয় বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিবিসি।

এ চলমান প্রচেষ্টায় প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছেন প্রযুক্তি ও যোগাযোগমন্ত্রী গুস্তাভো ভিলাতে।

গর্বের সঙ্গে তিনি বলেছেন, “আমাদের দেশের জনগণ সবচেয়ে তরুণ, আমাদের অনেক পুনরায় ব্যবহারযোগ্য পরিবেশবান্ধব জ্বালানি রয়েছে। আমাদের দেশে করের হার কম ও অর্থনীতি স্থিতিশীল।”

দেশটির আসুনসিয়নের প্রধান বিমানবন্দরের কাছে পরিকল্পিত এক নতুন ডিজিটাল পার্ক তৈরি হচ্ছে। বর্তমানে জায়গাটিতে সবুজ মাঠ আর কয়েকটি সেনা ব্যারাক ছাড়া তেমন কিছুই নেই।

পার্কের পরিকল্পিত নকশা অনুসারে, এখানে থাকবে লেক, একটি শিশু যত্নকেন্দ্র এবং আরও কিছু ভবন। ভিলাতে বলেছেন, দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে প্রস্তুত হয়ে যাবে পার্কটি।

“সরকার প্রথম ধাপে প্রায় ২০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে। এর পরের ধাপের বিনিয়োগের দায়িত্ব থাকবে বেসরকারি বিভিন্ন কোম্পানির ওপর।”

পার্কটি এখনো প্রস্তুত না হলেও ভিলাতে বলেছেন, সরকার, বেসরকারি খাত ও বিভিন্ন ইউনিভার্সিটির মধ্যে যে সহযোগিতা এরইমধ্যে শুরু হয়েছে সেটিই বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্টের জন্য প্রয়োজনীয় এক শক্তিশালী প্রযুক্তি ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার মূল চাবিকাঠি।

দেশটির সরকারের ধারণা, এক্ষেত্রে দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীই হবে প্রধান আকর্ষণ যারা বড় প্রযুক্তি কর্মীবাহিনী গড়ে তুলতে পারবে। প্যারাগুয়ের মানুষের গড় বয়স কেবল ২৭ বছর।

তবে আরও বেশি সংখ্যক তরুণকে প্রশিক্ষিত করতে হবে। প্রযুক্তি মন্ত্রীর মতে, নতুন ডিজিটাল পার্কেই থাকবে ‘ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি’, যা তাইওয়ান ও প্যারাগুয়ের যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হবে।