Published : 29 Jul 2026, 06:07 PM
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ‘অগ্রহণযোগ্য ঝুঁকি’ তৈরির অভিযোগে নতুন করে সব ধরনের বিদেশি হিউম্যানয়েড রোবট আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ট্রাম্প প্রশাসন।
মঙ্গলবার এক ঘোষণায় যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন বলেছে, চার পায়ে হাঁটা উন্নতমানের রোবট ও মানবাকৃতির হিউম্যানয়েড রোবট উভয় ক্ষেত্রক্ষেত্রেই এ নতুন বিধিনিষেধ কার্যকর হবে।
বিবিসি লিখেছে, বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ও আধুনিক রোবোটিক্স প্রযুক্তির দৌড়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীন। মার্কিন বাজারে নিষিদ্ধ হতে যাওয়া এসব উন্নত প্রযুক্তিপণ্যের বড় অংশই তৈরি হয় দেশটিতে।
রোবটের পাশাপাশি ডেটা সেন্টার ও সৌর প্যানেলে বহুল ব্যবহৃত পাওয়ার ইনভার্টার আমদানিতেও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি ও যোগাযোগ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন’ বা এফসিসি।
সংস্থাটির দাবি, এসব যন্ত্রাংশ মার্কিন অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
মার্কিন প্রশাসনের এ পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছে ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীন দূতাবাস।
বিবৃতিতে দূতাবাস বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্যিক বিভিন্ন বিষয়কে ‘রাজনীতিকরণ’ করছে এবং ‘ভিত্তিহীন অজুহাতে’ বিভিন্ন দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দিচ্ছে, যার বিরোধিতা শুরু থেকেই করে আসছে বেইজিং।
তবে মার্কিন প্রশাসন তাদের অবস্থানের পক্ষেই যুক্তি দিচ্ছে।
এফসিসি চেয়ারম্যান ব্রেন্ডন কার বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ সাপ্লাই চেইনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই’ সময়োচিত এ পদক্ষেপ নিয়েছে তাদের সংস্থা।
যেসব পণ্য বা সেবা মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত সেগুলোকে এফসিসির ‘কাভার্ড লিস্ট’-এ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সম্প্রতি এ নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা বিদেশি রোবটিক প্রযুক্তি ও ইনভার্টারগুলোকেও সেই তালিকায় যুক্ত করেছে সংস্থাটি।
এফসিসি বলেছে, এ বিধিনিষেধ কেবল নতুন করে উৎপাদিত বিদেশি প্রযুক্তিপণ্য ও ইনভার্টারের ওপর থাকবে। ফলে আগে থেকেই এফসিসির অনুমোদন পেয়ে বাজারে থাকা আগের কোনো মডেলের বিক্রি বা আমদানিতে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটবে না।
বিদেশি ইনভার্টার ব্যবহারের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এফসিসি বলেছে, এসব যন্ত্রের মাধ্যমে বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানি চাইলে দূর থেকেই সেগুলোর বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দিতে পারে।
এ ছাড়া স্পর্শকাতর তথ্য চুরি, দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও ‘বিদেশি সরকারি সংস্থাগুলোর মাধ্যমে নজরদারি বা সাইবার হামলার সুযোগ তৈরির’ আশঙ্কা রয়েছে।
পাশাপাশি বিদেশি রোবট ব্যবহারের ঝুঁকি তুলে ধরে সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, দেশের বাইরে তৈরি এসব রোবটের মাধ্যমে ‘ক্ষতিকর ব্যক্তি বা গোষ্ঠী মার্কিন নাগরিকদের ওপর নজরদারি চালাতে পারে, বিদেশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সক্ষমতা বাড়াতে পারে বা রোবটগুলোকে দূর থেকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিতে পারে’।
মার্কিন পদক্ষেপের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ওয়াশিংটনে চীন দূতাবাস বলেছে, দেশটির স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে এমন যে কোনো পদক্ষেপের জবাবে বেইজিং ‘প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেবে’।
পাশাপাশি সব দেশকে একযোগে কাজ করে মানবকল্যাণে এআই বিকাশের আহ্বান জানিয়েছে তারা।
যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে চীন দূতাবাস বলেছে, ওয়াশিংটনের উচিত তাদের ‘একচ্ছত্র আধিপত্যবাদী মানসিকতা ত্যাগ ও চীনা বিভিন্ন কোম্পানিকে মিথ্যা দোষারোপ ও নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেওয়া বন্ধ করা’।
এ বিষয়ে বিবিসির মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি চীনের প্রধান রোবট উৎপাদক কোম্পানি ‘ইউনিট্রি’, ‘ইউবিটেক’ ও ‘এজিবট’।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর লক্ষ্যে ট্রাম্প প্রশাসন যখন কঠোর অবস্থান নেওয়া সময়ই বেইজিংয়ের রপ্তানি খাত মার্কিন প্রশাসনের কড়া নজরদারির মুখে পড়ল।
বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি উৎপাদনে চীন বিশ্বের শীর্ষে থাকলেও চড়া শুল্ক আরোপের কারণে দেশটির জন্য মার্কিন বাজার প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছে।
অন্যদিকে, জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা, বেইজিংয়ের সামরিক আধুনিকীকরণের গতি কমানো এবং এআই প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থান ধরে রাখার কৌশল হিসেবে চীনের কাছে আধুনিক সেমিকন্ডাক্টর চিপ বিক্রিও বন্ধ করেছে ওয়াশিংটন।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থসচিব স্কট বেসেন্ট সতর্ক করে বলেছেন, মার্কিন মেধাস্বত্ব চুরির অভিযোগে চীনা বিভিন্ন এআই কোম্পানিকে কঠোর নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হতে পারে।
এসব অভিযোগের জবাবে চীন সরকার বলেছে, তাদের এআই খাতের এ অভাবনীয় অগ্রগতি ‘নিজেদের কঠোর নিষ্ঠা, প্রচেষ্টা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতারই ফল’।
গত বছর চীন ইলেকট্রনিক্স শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় ‘রেয়ার আর্থ’ বা বিরল খনিজ উপাদানের রপ্তানিতে কড়াকড়ি আরোপ করায় বিশ্বজুড়ে সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থায় যে সংকটের তৈরি হয়েছিল এবার তেমন কোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া এড়াতে সতর্ক রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
সাম্প্রতিক সময়ে চীনা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো বাসা-বাড়ি ও কারখানা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য দ্রুতগতিতে হিউম্যানয়েড রোবট তৈরি করছে।
ইলন মাস্কের টেসলা ও বস্টন ডাইনামিকসের মতো মার্কিন প্রতিদ্বন্দীদের টেক্কা দিয়ে সাধারণ গ্রাহক ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে বাণিজ্যিকভাবে এসব রোবট সরবরাহ করতে বেশ দ্রুত বাজার তৈরি করে নিয়েছে চীনা বিভিন্ন কোম্পানি।