Published : 06 Jan 2026, 01:24 PM
স্মার্টফোন ও ওয়্যারলেস ইয়ারবাড থেকে শুরু করে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি পর্যন্ত আধুনিক জীবনের সবকিছুই এখন ব্যাটারিতে চলে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এগুলোর কার্যসক্ষমতা কমে যায়। কয়েক বছর ধরে একটি ফোন ব্যবহার করলে এর ব্যাটারি চিরদিন টেকে না।
এখন ব্যাটারি নষ্ট হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ খুঁজে বের করেছেন গবেষকরা।
ব্যাটারি যখন চার্জ ও চার্জ শেষ হয় তখন তা শারীরিকভাবে অনেকটা মানুষের মতো ‘নিশ্বাস নেয়’ বা সংকুচিত ও প্রসারিত হয়। এই ক্রমাগত পরিবর্তনের কারণেই ব্যাটারি ধীরে ধীরে চার্জ ধরে রাখার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
‘ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাস অ্যাট অস্টিন’, ‘নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি’, ‘স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি’ ও ‘আর্গন ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি’র একদল গবেষক বলছেন, ব্যাটারি ব্যবহারের সময় খুব সূক্ষ্মভাবে প্রসারিত ও সংকুচিত হয়।
এ বারবার নড়াচড়া ব্যাটারির ভেতরের বিভিন্ন উপাদানের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি করে, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে ফেলে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট নোরিজ।
গবেষণার ফলাফল প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘সায়েন্স’-এ।
ব্যাটারি বিজ্ঞানের দীর্ঘদিনের এ রহস্যের সমাধান ভবিষ্যতে আরও দীর্ঘস্থায়ী ও নির্ভরযোগ্য ব্যাটারি তৈরির পথ খুলে দিতে পারে।
কোনো ব্যাটারি চার্জের সময় এতে থাকা বিভিন্ন লিথিয়াম আয়ন ইলেকট্রোড বা তড়িৎদ্বার উপাদানের ভেতরে প্রবেশ করে। আবার যখন ব্যাটারিটি ব্যবহারের মাধ্যমে ডিসচার্জ বা চার্জ শেষ করা হয় তখন সেসব আয়ন আবার সেখান থেকে বেরিয়ে আসে।
এই অনবরত আসা-যাওয়া ব্যাটারির অভ্যন্তরীণ কাঠামোকে ফুলিয়ে তোলে ও আবার সংকুচিত করে। বিষয়টি ঠিক মানুষের ফুসফুসে বাতাসে ভরে ওঠা ও পরে তা বের করে দেওয়ার মতোই।
এ নড়াচড়া বা পরিবর্তনটি খুব সূক্ষ্ম হলেও একটি ব্যাটারির পুরো আয়ুষ্কালে তা হাজার হাজার বার ঘটে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বারবার হতে থাকা নড়াচড়া ব্যাটারির স্থায়ী ক্ষতি করে। যাকে ‘কেমোমেকানিক্যাল ডিগ্রেডেশন’ বা যন্ত্ররাসায়নিক ক্ষয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন বিজ্ঞানীরা।
এ গবেষণার প্রধান গবেষক ইজিন লিউ বলেছেন, ব্যাটারির প্রতিটি ‘নিশ্বাস’ বা এই সংকোচন-প্রসারণ এর পেছনে ছোট ও অপরিবর্তনীয় পরিবর্তন রেখে যায়। প্রতিটি পরিবর্তন আলাদাভাবে খুব সামান্য হলেও ক্রমাগত ব্যবহারের ফলে এগুলো জমা হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত তা ব্যাটারির কার্যসক্ষমতা কমিয়ে দেয় বা পুরোপুরি নষ্ট করে ফেলে।
এ গবেষক দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারটিকে ‘স্ট্রেইন ক্যাসকেডস’ বা চাপের ধারাবাহিক প্রবাহ বলে বর্ণনা করেছেন গবেষকরা। একটি ব্যাটারির ইলেকট্রোডের ভেতর লাখ লাখ অণুবীক্ষণিক কণা থাকে ও চার্জ হওয়ার সময় প্রতিটি কণা এই চাপের প্রতি ভিন্ন ভিন্নভাবে সাড়া দেয়।
কিছু কণা খুব দ্রুত নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে আবার অন্যগুলো প্রায় নড়াচড়াই করে না। এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণের ফলে নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে আশপাশের এলাকাগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে ব্যাটারির ভেতরে ফাটল ধরা, উপাদানের আকৃতি নষ্ট ও অন্যান্য কাঠামোগত ক্ষতি হতে পারে।
এ প্রক্রিয়াটি সরাসরি পর্যবেক্ষণের জন্য উন্নত এক্স-রে ইমেজিং প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন গবেষকরা। ফলে ব্যাটারি চার্জ ও ডিসচার্জের সময় এর ভেতরের বিভিন্ন উপাদান ঠিক কীভাবে কাজ করে তা দেখার সুযোগ মিলেছে।
ট্রান্সমিশন এক্স-রে মাইক্রোস্কোপি ও থ্রিডি এক্স-রে ল্যামিনোগ্রাফির মতো শক্তিশালী যন্ত্র ব্যবহার করে চাপের মুখে প্রতিটি কণা কীভাবে নড়াচড়া করে এবং একে অপরের সঙ্গে কেমন আচরণ করে তার বিস্তারিত ও রিয়াল-টাইম ছবি তুলতে পেরেছেন গবেষকরা।
প্রথম এ বিষয়টি অনেক ছোট এক যন্ত্র নিয়ে কাজের সময় খেয়াল করেছিল গবেষক দলটি, যা বাজারে প্রচলিত ওয়্যারলেস ইয়ারবাড। এগুলোর ক্ষুদ্র ব্যাটারিতে যে প্রক্রিয়াটি ক্ষতি করে ঠিক একই প্রক্রিয়া বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির মতো অনেক বড় ব্যাটারি সিস্টেমের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।