এ সপ্তাহে পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণের সঙ্গে দেখা মিলবে শনির
রোববারের রাত কেবল পূর্ণিমা বা ব্লাড মুনের জন্যই বিশেষ নয়, বরং আরও চমকপ্রদ হবে। কারণ চাঁদ ও শনি গ্রহ আকাশে খুব কাছাকাছি থাকবে।
এ সপ্তাহের শেষ দিকে পূর্ব দিগন্তে পূর্ণচাঁদ উঠবে, যেখানে চাঁদকে খুব বড় ও উজ্জ্বল দেখাবে। সঠিক জায়গায় থাকলে ‘ব্লাড মুন’ চন্দ্রগ্রহণ দেখারও সযোগ মিলবে, যেখানে চাঁদ রক্তিম বা লালচে রং ধারণ করে।
সেই সন্ধ্যার আকাশে চাঁদ ও শনি গ্রহকেও খুব কাছাকাছি দেখা যাবে, যেন এরা একসঙ্গেই রওনা হয়েছে কোথাও।
চাঁদের বড় ও উজ্জ্বল রূপকে ‘কর্ন মুন’ বলা হয়, যেটি এ বছরের ৭ সেপ্টেম্বর সূর্যাস্তের ঠিক পরেই রাতের আকাশে দেখা যাবে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিবিসি।
পূর্ণচাঁদ বা পূর্ণিমা অসাধারণ এক দৃশ্য। কয়েকশ বছর আগে যখন বিদ্যুতের আলো ছিল না তখন পূর্ণিমা ছিল আকাশের সবচেয়ে চমৎকার দৃশ্য, যা রাতের বেলায় আশপাশকে আলোয় ভরিয়ে দিত। ওই সময় সন্ধ্যার আকাশের মূল আকর্ষণ ছিল পূর্ণিমা, যা বছরে অন্তত একবার আকাশকে আলোকিত করে রাখত।
কর্ন মুন কী?
মাসে একবার পূর্ণিমা দেখা যাওয়ার কারণে ইতিহাসে প্রতিটি পূর্ণিমাকে সেই মাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বা প্রকৃতির বড় পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে ধরা হত বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিবিসি।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রতিটি পূর্ণিমাকে এক বা একাধিক বিশেষ নামে ডাকা হয়েছে।
সেপ্টেম্বর মাসের পূর্ণিমাকে বলা হয় ‘কর্ন মুন’। কারণ এই সময়ে পুরানো দিনে উত্তর আমেরিকায় ভুট্টা বা অন্যান্য ফসল কাটা হত। এ মাসের চাঁদটি সেই ফসল কাটার সময়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।
সেপ্টেম্বরের পূর্ণিমাকে কখনও কখনও ‘হার্ভেস্ট মুন’ বা ফসল কাটার চাঁদও বলা হয়, তবে সব সময় নয়। কারণ ‘হার্ভেস্ট মুন’ হল সেই পূর্ণিমা যা ‘শরৎ বিষুব’-এর সবচেয়ে কাছের পূর্ণিমা। ফলে এটি কখনও সেপ্টেম্বরের পূর্ণিমা হতে পারে, আবার কখনও অক্টোবরের পূর্ণিমাও হতে পারে।
‘শরৎ বিষুব’ এমন এক সময়, যখন পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধে দিন ও রাত প্রায় সমান দৈর্ঘ্যের হয়। সাধারণত এটি সেপ্টেম্বর মাসের ২১ থেকে ২৪ তারিখের মধ্যে ঘটে। এসব দিনে সূর্য সরাসরি পৃথিবীর বিষুবরেখার ওপর দিয়ে যায়। যার কারণে পৃথিবীর সব জায়গায় প্রায় সমান সময় দিনের আলো ও রাত থাকে।
এ বছর ‘হার্ভেস্ট মুন’-এর দেখা মিলবে ৬ অক্টোবর। ফলে এ বছরের চাঁদ কর্ন মুন, হার্ভেস্ট মুন নয়। চাঁদের এসব বিশেষ নাম কেবলই চাঁদের ডাক নাম। নাম আলাদা হলেও এসব চাঁদ দেখতে অন্য যে কোনো পূর্ণিমার চাঁদের মতই থাকবে, কোনো ভিন্নতা নেই।
তবে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের পূর্ণিমা পৃথিবীর কিছু জায়গায় একটু আলাদা দেখাবে। কারণ এ সময় চাঁদের পূর্ণগ্রাস গ্ৰহণ ঘটবে, যাকে ‘ব্লাড মুন’ নামেও ডাকা হয়।
কেন কর্ন মুনকে ব্লাড মুন বলা হয়?
কর্ন মুন হল সেপ্টেম্বর মাসের পূর্ণিমা। আর পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্ৰহণের সময় চাঁদ যে রক্তিম বা লাল রং ধারণ করে তাকে ‘ব্লাড মুন’ বলা হয়। সেপ্টেম্বরের পূর্ণিমা বা কর্ন মুনের সময় পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্ৰহণ ঘটলে তখনই কর্ন মুন হয়ে যাবে ব্লাড মুন।
রোববার ৭ সেপ্টেম্বর ইউরোপ, আফ্রিকার কিছু অংশ, এশিয়া বা অস্ট্রেলিয়ার বাসিন্দারা পূর্ণিমার পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্ৰহণ দেখার সুযোগ পাবেন। ওই রাতে ওসব অঞ্চলে চাঁদ পুরোপুরি লাল রং ধারণ করবে বা ‘ব্লাড মুন’-এর দেখা মিলবে।
চাঁদের গ্ৰহণ ঘটে যখন পৃথিবী, সূর্য ও চাঁদ সরলরেখায় চলে আসে। চাঁদের নিজস্ব আলো না থাকায় এ সময় সূর্যের আলো পড়ে এসে পড়ে চাঁদের ওপর। ফলে পৃথিবী চাঁদ ও সূর্যের মাঝে চলে এলে সূর্যের আলো আর চাঁদে পড়ে না। বদলে পৃথিবীর ছায়া পড়ে চাঁদের উপরে। তখনই চন্দ্রগ্রহণ ঘটে।
সূর্যের আলো যখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে চাঁদের দিকে যায়, তখন আলোটা পৃথিবীর ঘন বায়ুমণ্ডলের কারণে বেঁকে যায় ও ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে আলো যখন চাঁদের ওপর গিয়ে পড়ে তখন চাঁদকে অনেকটা লালচে রঙের দেখায়।
রোববারের চন্দ্রগ্রহণ উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় দেখা যাবে না। তবে নাসার মতে, আলাস্কার পশ্চিমাংশে কিছু জায়গায় চাঁদ অস্ত হওয়ার সময় ব্লাড মুনের দেখা মিলতে পারে।
আর্জেন্টিনার পূর্ব অংশে চাঁদ ওঠার সময় চন্দ্রগ্রণের কিছু অংশ দেখা যেতে পারে।
‘টাইমঅ্যান্ডডেটডটকম’-এর তথ্য অনুসারে, চন্দ্রগ্রহণ দেখার জন্য সবচেয়ে সেরা জায়গা তবে আলাস্কার আদাক শহর। তবে ওখানে চন্দ্রগ্রহণ দেখার বিষয়টি একটু চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।
পূর্ণিমার পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্ৰহণ আফ্রিকার পূর্বাংশ, মধ্য এশিয়া, যেমন– ভারত, চীন এবং অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিম অংশ থেকে সবচেয়ে ভালো দেখা যাবে।
শনি ও কর্ন মুন
রোববারের রাত কেবল পূর্ণিমা বা ব্লাড মুনের জন্যই বিশেষ নয়, বরং আরও চমকপ্রদ হবে। কারণ চাঁদ ও শনি গ্রহ আকাশে খুব কাছাকাছি থাকবে। খালি চোখে শনিকে চাঁদের খুব কাছে এক উজ্জ্বল বিন্দুর মতো দেখাবে। টেলিস্কোপে দেখলে শনির বলয়ও দেখা যেতে পারে।
এ ঘটনা খুবই বিরল না হলেও একসঙ্গে পূর্ণিমা, পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ ও শনি গ্রহের যোগ– এই তিনটি জিনিস একই রাতে দেখা খুবই বিশেষ এক মুহূর্ত।
শনি থেকে সোম বা ৬ থেকে ৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যাবেলায় চাঁদ ও শনি গ্রহ আকাশের একই অংশে দেখা যাবে। এতে করে খালি চোখেই একসঙ্গে কর্ন মুন ও শনি গ্রহের দারুণ সুন্দর এক জুটি দেখা দেবে আকাশে।
শনিবার সন্ধ্যায় চাঁদ উঠবে আকাশের দক্ষিণ-পূর্ব দিগন্তে, এ সময় শনি গ্রহটি থাকবে চাঁদের বাঁ দিকে, একটু দূরে, এক উজ্জ্বল বিন্দুর মতো দেখা যাবে শনিকে।
রোববার আবার আকাশের দিকে তাকালে সেই রাতে কর্ন মুনের দেখা মিলবে পূর্ব দিগন্তে, আর সেই সঙ্গেই ঘটবে পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্ৰহণ।
রোববার রাতে, চাঁদ তার আগের রাত থেকে আরও পূর্ব দিকে সরে আসবে তবে শনি গ্রহ আকাশের একই জায়গায় থাকবে। কারণ গ্রহগুলো ধীরে সরে। ফলে চাঁদ ও শনিকে আকাশে আরও কাছাকাছি দেখা যাবে।
চাঁদ ও শনিকে একসঙ্গে দেখার সবচেয়ে সেরা সময় সোমবার বা ৮ সেপ্টেম্বর। কারণ সূর্যাস্তের পরে পূর্ব দিগন্তের উপরে এরা একে অপরের খুব কাছাকাছি থাকবে।
তবে এ মাসের ২১ তারিখে শনিকে সবচেয়ে ভালোভাবে দেখা যাবে। এদিন ‘অপোজিশন’-এ পৌঁছাবে গ্রহটি। অপোজিশন মানে হচ্ছে যখন পৃথিবী, শনি ও সূর্য এক সরল রেখায় থাকে তখন ঠিক সূর্যের বিপরীত দিকে অবস্থান করে গ্রহটি। এ রাতে সবচেয়ে উজ্জ্বল ও স্পষ্ট দেখা যাবে শনিকে।
আগামী কয়েক সপ্তাহে চাঁদ যখন ক্ষয় হতে শুরু করবে বা পূর্ণচাঁদ থেকে সাধারণ চাঁদে রূপ নেবে ও আকাশে এর আলো কমে আসবে তখনই হবে শনিকে দেখার সেরা সুযোগ। দুরবিন বা টেলিস্কোপ দিয়ে দেখলে শনিকে আরও স্পষ্টভাবে দেখার সুযোগ মিলবে।
