Published : 11 Aug 2026, 11:40 AM
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চ্যাটবটের ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে থাকায় এতে কঠোর লাগাম টানতে যাচ্ছে ক্যালিফোর্নিয়া।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট প্রতিবেদনে লিখেছে, এআই’কে পূর্ণাঙ্গ থেরাপিস্ট হিসেবে ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিতে যাচ্ছেন ক্যালিফোর্নিয়ার আইনপ্রণেতারা।
নতুন প্রস্তাবিত ‘সেনেট বিল ৯০৩’-এর অধীনে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো চ্যাটবটকে ‘মানসিক থেরাপি’ হিসেবে প্রচার করতে পারবে না। পাশাপাশি, কোনো সনদপ্রাপ্ত পেশাদার চিকিৎসকের পর্যালোচনা ছাড়া এআই সিস্টেমগুলো সরাসরি কোনো চিকিৎসাসংক্রান্ত সিদ্ধান্তও নেবে না।
এই বিলে বলা হয়েছে, রোগীদের থেরাপি সেশনের তথ্য রেকর্ড করা বা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বাছাইয়ে এআই ব্যবহারের আগে সংশ্লিষ্ট রোগীর অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক হবে।
আইনটির প্রস্তাবক স্যান ডিয়াগোর সেনেটর স্টিভ প্যাডিলা এ বছরের শুরুতে বিলটি উত্থাপনের সময় বলেছিলেন, “এআইয়ের অনেক ইতিবাচক দিক রয়েছে এবং অঙ্গরাজ্যজুড়ে ক্যালিফোর্নিয়াবাসীদের জীবনমান উন্নত করার সুযোগও এতে আছে। তবে তা কেবল তখনই সম্ভব যদি আমরা এর দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারি।
“মানব থেরাপিস্টদের দক্ষতা ও যে প্রশিক্ষণ রয়েছে তা এআই কখনোই পুরোপুরি নকল করতে পারবে না। ফলে এআই অ্যালগরিদমগুলো থেরাপিস্টদের বিকল্প হওয়ার যোগ্য নয়। রোগীদের জন্য সম্ভাব্য ক্ষতিকর হতে পারে এমন উপায়ে এআই যাতে প্রয়োগ না হয়, সেজন্য এখনই আমাদের পদক্ষেপ নিতে এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষাপ্রাচীর তৈরি করতে হবে।”
বিলটির সমালোচকরা বলছেন, এমনটা এআইয়ের বৈধ ব্যবহারকে বাধার মুখে ফেলবে এবং রোগীদের সঠিক চিকিৎসার দিকে পরিচালিত করতে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের এআই ব্যবহারের সক্ষমতাকে ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে।
এ সপ্তাহে প্রযুক্তি খাতের সংগঠন ‘টেকনেট’-এর ক্যালিফোর্নিয়া নির্বাহী পরিচালক রবার্ট বয়কিন বলেছেন, “যে সময়ে ক্যালিফোর্নিয়ার প্রতিটি কাউন্টিতে আচরণগত মানসিক স্বাস্থ্যকর্মীর তীব্র সংকট চলছে সে সময়ে যে বিলটি রোগীদের দ্রুত চিকিৎসা পেতে সাহায্য করে এমন প্রাথমিক সেবা ও বাছাইকরণের টুলের সামনে চিকিৎসকনির্ভর বাধা তৈরি করবে।”
আইনটির সমর্থক ‘ন্যাশনাল ইউনিয়ন অফ হেলথকেয়ার ওয়ার্কার্স’ ক্যালিফোর্নিয়ার নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে ‘কাইজার পারমানেন্টে’ নামে এক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী কোম্পানির বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছে।
তাদের দাবি, কোম্পানিটি চিকিৎসকদের নজরদারি ছাড়াই স্বয়ংক্রিয় ‘ই-ভিজিট’ সিস্টেম ব্যবহার করে উদ্বেগ বা বিষণ্নতায় ভোগা রোগীদের প্রাথমিক মূল্যায়ন ও পরামর্শ দিয়েছিল।
তবে কাইজার পারমানেন্টে এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তারা ‘রোগীদের রোগ নির্ণয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণে এআই ব্যবহার করে না’। সংস্থাটি তাদের প্রক্রিয়া ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়েছে বলেও দাবি করেছে।
বিভিন্ন গবেষণা তথ্যে দেখা গেছে, মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় এআই ব্যবহারের প্রতি মানুষের ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, প্রকৃত চিকিৎসার সঙ্গে তুলনার আগে চ্যাটবটভিত্তিক এই সেবার ক্ষেত্রে আরও গবেষণা ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন।
‘র্যান্ড’, ‘ব্রাউন ইউনিভার্সিটি স্কুল অফ পাবলিক হেলথ’ ও ‘হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি’র যৌথ পরিচালনায় ২০২৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি আটজন টিনএজার ও তরুণ-তরুণীর মধ্যে একজন তাদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য চ্যাটবটের ওপর নির্ভর করছে।
এ গবেষণা প্রসঙ্গে র্যান্ড-এর জ্যেষ্ঠ নীতি গবেষক জোনাথন ক্যান্টর বলেছেন, “বিভিন্ন এআই চ্যাটবটের দেওয়া মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক পরামর্শ মূল্যায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট পরিমাপক খুব কমই আছে। এসব লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলকে যেসব ডেটা দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে সেগুলোর স্বচ্ছতাও সীমিত।”
অন্যদিকে, ‘আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন’-এর এ বছরের গবেষণায় উঠে এসেছে, ৭৭ শতাংশ মনোবিজ্ঞানী এমন রোগীদের সঙ্গে কথা বলেছেন যারা কোনো না কোনো প্রয়োজনে সহায়তা পেতে এআই ব্যবহার করেছেন।
গেল অক্টোবরে জনপ্রিয় চ্যাটবট চ্যাটজিপিটির নির্মাতা কোম্পানি ওপেনএআই বলেছে, সপ্তাহে আনুমানিক ১২ লাখ ব্যবহারকারী চ্যাটবটটিকে এমন সব বার্তা পাঠান যাতে তাদের ‘আত্মহত্যার সম্ভাব্য পরিকল্পনা বা ইচ্ছার স্পষ্ট ইঙ্গিত’ থাকে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরাসরি চিকিৎসকের পরামর্শ পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা জটিলতার কারণেই এ প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে।
জুনে ‘কিং’স কলেজ লন্ডন’-এর নিউরোসাইকিয়াট্রির ক্লিনিক্যাল ফেলো হ্যামিলটন মরিন বলেছেন, “অনেক দেশেই দীর্ঘ অপেক্ষমাণ তালিকা ও সরাসরি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া কঠিন হওয়ার কারণে অনেক মানুষ যে তাদের মানসিক স্থিতিশীলতার জন্য জেনারেটিভ এআইয়ের দিকে ঝুঁকছে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।”
বর্তমানে জনপ্রিয় এআই প্রযুক্তি মানুষের মতোই ভঙ্গিতে কথা বলতে ও নিজস্ব ব্যক্তিত্ব প্রকাশ করতে পারে। তবে অভিযোগ উঠেছে, এসব চ্যাটবটের প্রভাবেই কিছু তরুণ আত্মহত্যার মতো চরম পথ বেছে নিয়েছে, যার প্রেক্ষিতে বেশ কয়েকটি এআই নির্মাতা কোম্পানি মামলার মুখেও পড়েছে।