অবশেষে উঠল ফ্লোর প্রাইস, ‘তিন বিবেচনায়’ থাকল ৩৫টিতে
পুঁজিবাজারে ৩৫৭টি শেয়ারের দরে সর্বনিম্ন সীমা আর থাকছে না।
দেড় বছর পার করে শেয়ারের বেঁধে দেওয়া সর্বনিম্ন দর বা ‘ফ্লোর প্রাইস’ তুলে নেওয়া শুরু করল পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, বিএসইসি।
রোববার থেকে ৩৫টি ছাড়া বাকি সব কোম্পানির সর্বনিম্ন দর থাকছে না। এসব কোম্পানির মধ্যে ব্যাংক ও বীমা খাতের আছে কেবল একটি করে কোম্পানি। আর সবচেয়ে বেশি ৮টি কোম্পানি আছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের।
পুঁজিবাজারে এখন তালিকাভুক্ত কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের সংখ্যা ৩৯২টি। এর মধ্যে ৩৫৭টির শেয়ারদরের সর্বনিম্ন সীমা থাকছে না।
এসব কোম্পানির শেয়ারদর উঠানামার সার্কিট ব্রেকার নিয়ে বিশেষ কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। ফলে তার সর্বোচ্চ সীমা ১০ শতাংশই থাকছে।
বৃহস্পতিবার এক আদেশে এই সিদ্ধান্ত জানায় বিএসইসি। তবে কোন নীতিমালার ভিত্তিতে ৩৫টি কোম্পানিতে ফ্লোর বহাল রাখা হয়েছে, সে বিষয়ে সুষ্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
তবে বিএসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনটি বিবেচনার কথা উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেন, ফ্লোর প্রাইস’ তুলে নেওয়ার পরে মার্জিন ঋণ থাকা কোম্পানির শেয়ারে ‘ফোর্স সেল’ হতে পারে, প্রধান সূচকে প্রভাব পড়তে পারে বা ‘ফ্লোরে’ আছে কিন্তু এখনই তুলে নিলে শেয়ার বিক্রির চাপে দর আরো নিচে নামতে পারে-এসব বিবেচনায় নিয়ে ৩৫ কোম্পানি থেকে ‘ফ্লোর’ তুলে নেয়া হয়নি প্রথম পর্যায়ে।’’
সিদ্ধান্তের প্রভাব দেখে এসব কোম্পানির বিষয়ে কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশে পুঁজিবাজারে প্রথমবারের মতো করোনাভাইরাস মহামারীর সময়। ২০২০ সালের ৮ মার্চে দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ার পর শেয়ারদর ক্রমেই কমার মধ্যে ১৯ মার্চ এই সিদ্ধান্ত জানায় বিএসইসি।
ওই বছরের জুন থেকে প্রথমে বীমা খাত ও পরে আরো কিছু খাতের শেয়ারদর বাড়তে থাকলে ধাপে ধাপে ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে ফ্লোর প্রাইস তুলে নিয়েছিল কমিশন।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারির শেষে ইউক্রেইনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর আতঙ্কে আবার পুঁজিবাজারে দরপতন শুরু হলে দ্বিতীয়বারের মতো ফ্লোর প্রাইস দেওয়া হয় ২৮ জুলাই।
বিনিয়োগকারীদের একাংশের দাবির মুখে একই বছরের ডিসেম্বরে ১৬৯ কোম্পানির ফ্লোর প্রাইস তুলে শেয়ারের দরপতনের সর্বোচ্চ সীমা ১ শতাংশ বেঁধে দেওয়া হয়। এরপর এমন কোম্পানিও দেখা যায়, তার দর টানা ৪০ কর্মদিবস এক শতাংশের কাছাকাছি কমেছে। পরে ২০২৩ সালের মার্চে আবার এসব কোম্পানিতে ফ্লোর আরোপ করা হয়।
এরপর থেকে সূচক মোটামুটি একটি বৃত্তে ঘুরপাক খেলেও শেয়ারের লেনদেন একেবারেই কমে আসে। প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তি শ্রেণির বিনিয়োগকারীরা অর্ডার বসিয়ে শেয়ার বিক্রি করতে পারছিলেন না। লেনদেনও কমে আসে অনেকটাই।
এই অবস্থায় ফ্লোর তুলে স্টক ব্রোকার অ্যাসোসিয়েশনসহ বড় বিনিয়োগকারীরা ফ্লোর তুলে দেওয়ার অনুরোধ জানায় বিএসইসিকে। তবে নির্বাচনের আগ পর্যন্ত কোনো ‘ঝুঁকি’ নিতে চায়নি বিএসইসি।
নির্বাচনের পর ধাপে ধাপে ফ্লোর তুলে দেওয়ার কথা জানানো হয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে।
ভোট শেষে পুঁজিবাজারে লেনদেন ও সূচক বাড়তে শুরু করেছে। এতদিন ক্রেতা না পাওয়া কোম্পানির শেয়ারও চাহিদা তৈরি হয়েছে।
যেসব কোম্পানির শেয়ারদর কমতে পারবে না
যে ৩৫টি কোম্পানির ফ্লোর প্রাইস বহাল আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আটটি কোম্পানি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের। এই খাতের ২৩টি কোম্পানির মধ্যে
বারাকা পাওয়ার, ডরিন পাওয়ার, খুলনা পাওয়ার, মেঘনা পেট্রোলিয়াম, পদ্মা অয়েল, শাহজিবাজার পাওয়ার, সামিট পাওয়ার ও ইউনাইটেড পাওয়ারের সর্বনিম্ন শেয়ারদর বহাল থাকবে।
বস্ত্র খাতের ৫৮টি কোম্পানির মধ্যে ছয়টির ফ্লোর বহাল আছে। এগুলো হল: এনভয় টেক্সটাইল, এইচআর টেক্সটাইল, কাট্টলি টেক্সটাইল, মালেক স্পিনিং, সায়হাম কটন ও শাশা ডেনিমস।
প্রকৌশল খাতের ৪২টি কোম্পানির মধ্যে পাঁচটির ফ্লোর প্রাইস বহল থাকবে। এগুলো হল: আনোয়ার গ্যালভ্যানাইজিং, বিএসআরএম লিমিডেট, বিএসআরএম স্টিল, কেডিএস এক্সেসরিজ ও ন্যাশনাল পলিমার।
আর্থিক খাতের ২৩ কোম্পানির মধ্যে যে তিনটির ফ্লোর প্রাইস বহাল আছে, সেগুলো হল ডিবিএইচ, আইডিএলসি ও ন্যাশনাল হাউজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স।
টেলিযোগাযোগ খাতের তিন কোম্পানির সবগুলোর ফ্লোর প্রাইস বহাল থাকবে। এগুলো হল: গ্রামীণফোন, রবি আজিয়াটা ও বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি।
বিবিধ খাতের ১৪টি কোম্পানির মধ্যে বেক্সিমকো লিমিটেড ও ইনডেক্স অ্যাগ্রোর শেয়ারদর সর্বনিম্ন সীমার নিচে নামতে পারবে না।
ওষুধ ও রসায়ন খাতের ৩৩ কোম্পানির মধ্যে ফ্লোরের সুবিধা আছে দুটির। এগুলো হল ওরিয়ন ফার্মা ও রেনাটা।
এছাড়া ব্যাংক খাতের ৩৫ কোম্পানির মধ্যে কেবল ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, বীমা খাতের ৫৭ কোম্পানির মধ্যে সোনার বাংলা ইনস্যুরেন্স, খাদ্য খাতের ২১ কোম্পানির মধ্যে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো, সিমেন্ট খাতের ৭ কোম্পানির মধ্যে কনফিডেন্স সিমেন্ট, সিরামিকস খাতের ৫ কোম্পানির মধ্যে শাইনপুকুর সিরামিকস এবং কাগজ ও প্রকাশনা খাতের ৬ কোম্পানির মধ্যে সোনালী পেপারের ফ্লোর প্রাইস বহাল আছে।
