Published : 07 Jun 2026, 08:29 AM
মেক্সিকোয় ১৯৮৬ সালের ৩১ মে থেকে ২৯ জুন বসে বিশ্বকাপে ত্রয়োদশ আসর। ১২১ দলের বাছাই পর্ব পেরিয়ে চূড়ান্ত পর্বে জায়গা করে নেয় ২২ দেশ। সরাসরি খেলে মেক্সিকো ও শিরোপাধারী ইতালি।
‘গোল অব দা সেঞ্চুরি’ কিংবা ‘হ্যান্ড অব গড’ বলার পর ফুটবল প্রেমীদের বুঝতে বাকি থাকে না কোন আসরের কথা বলা হচ্ছে কিংবা কার কথা বলা হচ্ছে। ফুটবলের গল্পগাঁথায় চিরস্থায়ী জায়গা পেয়ে গেছে দিয়েগো মারাদোনার জাদুকরী নৈপুণ্য ও ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো আসর। চার দশক পরেও এ নিয়ে চর্চার কমতি নেই।
অথচ এই আসর মেক্সিকোতে হওয়ারই কথা ছিল না! ১৯৭৪ সালের জুনে ফিফা কংগ্রেসে ত্রয়োদশ আসরের আয়োজক হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল কলম্বিয়াকে। কিন্তু ১৯৮২ সালে ফিফার মান অনুযায়ী টুর্নামেন্ট আয়োজনে অপারগতা জানিয়ে সরে দাঁড়ায় লাতিন আমেরিকার দেশটি। ১৯৮৩ সালে কনমেবল অঞ্চলের দুই দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাকে পেছনে ফেলে আয়োজনের দায়িত্ব পায় মেক্সিকো।
প্রথম দেশ হিসেবে দুবার বিশ্বকাপ আয়োজনে কীর্তি গড়ে মেক্সিকো। যা বেশ বিতর্কেরও জন্ম দেয়।
বিশ্বকাপে অংশ নেয় যে দেশগুলো-
ইউরোপ: বেলজিয়াম, বুলগেরিয়া, ডেনমার্ক, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, হাঙ্গেরি, ইতালি, নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, স্কটল্যান্ড, সোভিয়েত ইউনিয়ন, স্পেন ও পশ্চিম জার্মানি
দক্ষিণ আমেরিকা: আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে ও উরুগুয়ে
উত্তর আমেরিকা: মেক্সিকো ও কানাডা
আফ্রিকা: আলজেরিয়া ও মরক্কো
এশিয়া: ইরাক ও দক্ষিণ কোরিয়া
বিশ্বকাপে অভিষেক হয় কানাডা, ডেনমার্ক ও ইরাকের।
২৪ দল ছয়টি গ্রুপে খেলে, গ্রুপগুলো হলো-
গ্রুপ ‘এ’: আর্জেন্টিনা, ইতালি, বুলগেরিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া
গ্রুপ ‘বি’: মেক্সিকো, বেলজিয়াম, প্যারাগুয়ে, ইরাক
গ্রুপ ‘সি’: সোভিয়েত ইউনিয়ন, ফ্রান্স, হাঙ্গেরি, কানাডা
গ্রুপ ‘ডি’: ব্রাজিল, স্পেন, নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড, আলজেরিয়া
গ্রুপ ‘ই’: পশ্চিম জার্মানি, উরুগুয়ে, ডেনমার্ক, স্কটল্যান্ড
গ্রুপ ‘এফ’: ইংল্যান্ড, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, মরক্কো
এই আসরে আরও একবার পরিবর্তন আসে ফরম্যাটে। ২৪ দলকে ভাগ করা হয় ৬ গ্রুপে। প্রতিটি গ্রুপের সেরা দুই দল এবং তৃতীয় সেরা চারটি দল যায় পরের রাউন্ডে।
১৬ দলের দ্বিতীয় রাউন্ড থেকেই শুরু হয় নক আউট পর্ব। সেখান থেকে ধাপে ধাপে হয় কোয়ার্টার-ফাইনাল, সেমি-ফাইনাল ও ফাইনাল।
প্রথম পর্ব
গ্রুপ ‘এ’ থেকে পরের ধাপে যায় আর্জেন্টিনা, ইতালি ও বুলগেরিয়া। দুই জয় ও এক ড্রয়ে ৫ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ সেরা হয় আর্জেন্টিনা। এক জয় ও দুই ড্রয়ে ৪ পয়েন্ট নিয়ে রানার্সআপ ইতালি। দুটি ড্রয়ে ২ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় বুলগেরিয়া। টুর্নামেন্টে ফেরার আসরে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রাপ্তি ১ পয়েন্ট।
গ্রুপ ‘বি’ থেকে পরের ধাপে যায় মেক্সিকো, প্যারাগুয়ে ও বেলজিয়াম। তিন ম্যাচে হেরে শূন্য হাতে ফেরে ইরাক।
দুই জয় ও এক ড্রয়ে ৫ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ সেরা মেক্সিকো। এক জয় ও দুই ড্রয়ে ৪ পয়েন্ট নিয়ে রানার্সআপ প্যারাগুয়ে। একটি করে জয় ও ড্রয়ে ৩ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় বেলজিয়াম।
গ্রুপ ‘সি’ পরের ধাপে যায় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ফ্রান্স। দুই জয় ও এক ড্রয়ে দুই দলেই পয়েন্ট ছিল ৫। গোল পার্থক্যে এগিয়ে থেকে গ্রুপ সেরা হয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। এক জয়ে ২ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় হয় হাঙ্গেরি। তিন ম্যাচে হেরে শূন্য হাতে ফেরে কানাডা।
গ্রুপ ‘ডি’ থেকে পরের ধাপে যায় ব্রাজিল ও স্পেন। তিন জয়ে ৬ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ সেরা হয় ব্রাজিল। দুই জয়ে ৪ পয়েন্ট নিয়ে রানার্সআপ স্পেন। নিজেদের মধ্যে ড্র থেকে একটি করে পয়েন্ট পায় নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড ও আলজেরিয়া।
গ্রুপ ‘ই’ থেকে পরের ধাপে যায় ডেনমার্ক, পশ্চিম জার্মানি ও উরুগুয়ে। চমক দেখায় প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলতে আসা ডেনমার্ক। তিন জয়ে ৬ পয়েন্ট নিয়ে তারাই হয় গ্রুপ সেরা। একটি করে জয় ও ড্রয়ে ৩ পয়েন্ট নিয়ে রানার্সআপ পশ্চিম জার্মানি। এক জয়ে ২ পয়েন্ট নিয়ে সেরা তৃতীয় দলের একটি হয়ে তাদের সঙ্গী হয় উরুগুয়ে। ১ পয়েন্ট নিয়ে তলানিতে থেকে বিদায় নেয় স্কটল্যান্ড।
গ্রুপ ‘এফ’ থেকে পরের ধাপে যায় মরক্কো, ইংল্যান্ড ও পোল্যান্ড। ২ পয়েন্ট নিয়ে চারে থেকে বিদায় নেয় পর্তুগাল। ইংল্যান্ডকে হারিয়ে শুরুটা দারুণ করে তারা। তবে পরের দুই ম্যাচে হেরে বিদায় নিতে হয় আগেভাগেই।
দ্বিতীয় রাউন্ড
শেষ ষোলোয় মুখোমুখি: মেক্সিকো-বুলগেরিয়া, সোভিয়েত ইউনিয়ন-বেলজিয়াম, আর্জেন্টিনা-উরুগুয়ে, ব্রাজিল-পোল্যান্ড, পশ্চিম জার্মানি-মরক্কো, ফ্রান্স-ইতালি, স্পেন-ডেনমার্ক এবং ইংল্যান্ড-প্যারাগুয়ে
বুলগেরিয়াকে ২-০ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার-ফাইনালে যায় মেক্সিকো। অতিরিক্ত সময়ে যাওয়া ম্যাচে সোভিয়েত ইউনিয়নকে ৪-৩ গোলে হারায় বেলজিয়াম। দারুণ এক হ্যাটট্রিক করেও দলের বিদায় ঠেকাতে পারেননি ইগর বেলানভ।
পোল্যান্ডকে ৪-০ গোলে উড়িয়ে দেয় ব্রাজিল। উরুগুয়ের বিপক্ষে ১-০ গোলে জেতে আর্জেন্টিনা।
গত আসরের চ্যাম্পিয়ন ইতালিকে ২-০ গোলে হারিয়ে এগিয়ে যায় ফ্রান্স। গ্রুপ পর্বের চমক মরক্কোকে ৮৮তম মিনিটের গোলে হারায় পশ্চিম জার্মানি।
প্যারাগুয়েকে ৩-০ গোলে হারিয়ে শেষ আটে যায় ইংল্যান্ড। ডেনমার্ককে ৫-১ গোলে উড়িয়ে তাদের সঙ্গী হয় স্পেন। একাই চার গোল করেন এমিলিও বুত্রাগেনো।
কোয়ার্টার-ফাইনাল
শেষ আটে মুখোমুখি: ব্রাজিল-ফ্রান্স, পশ্চিম জার্মানি-মেক্সিকো, আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ও স্পেন-বেলজিয়াম
চার ম্যাচেই হয় জমজমাট লড়াই। এর তিনটি গড়ায় টাইব্রেকারে। যেটি যায়নি, সেটি নিয়েই আলোচনা বেশি হয়। আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের সেই লড়াই নিয়ে কথা হয় আজও।
ফরাসিদের বিপক্ষে ১৭তম মিনিটে এগিয়ে যায় ব্রাজিল। ৪০তম মিনিটে সমতা ফেরায় ফ্রান্স। বাকি সময়ে জালের দেখা পায়নি কোনো দলই। টাইব্রেকারে ৪-৩ গোলে জিতে সেমি-ফাইনালে পৌঁছে যায় ফ্রান্স।
নির্ধারিত ৯০ মিনিটের পর অতিরিক্ত ৩০ মিনিটেও কোনো গোল পায়নি পশ্চিম জার্মানি ও মেক্সিকো। ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানে ৪-১ গোলে জেতে পশ্চিম জার্মানি।
২২ জুন, ১৯৮৬। আর্জেন্টিনা ও ইল্যান্ডের ম্যাচে যেন জাদু দেখান মারাদোনা। ৫১তম মিনিটে করা প্রথম গোল প্রবল বিতর্কিত। রেফারির চোখ ফাঁকি দিয়ে লাফিয়ে হেডের ভঙিমায় হাত দিয়ে জালে পাঠান বল! চার মিনিট পর আট জনকে কাটিয়ে উপহার দেন দুর্দান্ত এক গোল। যা পরিচিত ‘গোল অব দা সেঞ্চুরি’ নামে। বিশ্বকাপ তো বটেই, ফুটবলেরই আইকনিক এক মুহূর্ত এই গোল।
শেষ দিকে গ্যারি লিনেকার একটি গোল শোধ করেন। তবে বাকি সময় ব্যবধান ধরে রাখে আর্জেন্টিনা। ২-১ গোলের জয়ে জায়গা করে নেয় শেষ চারে।
সেদিনেরই আরেক ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। নির্ধারিত সময় ও অতিরিক্ত সময়ে ১-১ সমতা থাকার পর, ৫-৪ ব্যবধানে স্পেনকে হারিয়ে এগিয়ে যায় বেলজিয়াম।
সেমি-ফাইনাল
দুই অর্ধের দুই গোলে ফ্রান্সকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে ফাইনালে যায় পশ্চিম জার্মানি। সেদিনই অন্য সেমি-ফাইনালে বেলজিয়ামকে একই ব্যবধানে হারায় আর্জেন্টিনা। ৫১ ও ৬৩তম মিনিটে গোল দুটি করেন মারাদোনা।
২৮ জুন তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ফ্রান্স ও বেলজিয়াম মুখোমুখি হয়। ৯০ মিনিটে ২-২ সমতার পর ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। সেখানে দুই গোল করে ৪-২ ব্যবধানের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে ফ্রান্স।
ফাইনাল
২৯ জুন, ১৯৮৬। মেক্সিকো সিটির আজতেকা স্টেডিয়ামে প্রায় এক লাখ ১৫ হাজার দর্শক উপস্থিত ছিল আর্জেন্টিনা ও পশ্চিম জার্মানির ফাইনাল দেখতে।
টানটান উত্তেজনার ম্যাচে ২৩তম মিনিটে হোসে লুইস ব্রাউন ও ৫৫তম মিনিটে হোর্হে ভালদানোর গোলে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। ৭৪ ও ৮০তম মিনিটে দুই গোলে সমতা ফিরিয়ে ঘুরে দাঁড়ায় পশ্চিম জার্মানি। তবে ৮৩তম মিনিটে ফের আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে নেন হোর্হে বুরুচাগা। এই ব্যবধান ধরে রেখেই মাঠ ছাড়ে আর্জেন্টিনা।
৩-২ গোলের জয়ে শিরোপা পুনরুদ্ধার করে লাতিন আমেরিকার দেশটি। টানা দ্বিতীয়বার ফাইনালে হারের হতাশায় ডোবে পশ্চিম জার্মানি।
এক নজরে ত্রয়োদশ বিশ্বকাপ
স্বাগতিক: মেক্সিকো
চ্যাম্পিয়ন: আর্জেন্টিনা
রানার্সআপ: পশ্চিম জার্মানি
মোট ম্যাচ: ৫২
মোট গোল: ১৩২
গোল গড়: ২.৫৪
সর্বোচ্চ গোল: গ্যারি লিনেকার (ইংল্যান্ড- ৬ গোল)
সেরা খেলোয়াড়: দিয়েগো মারাদোনা (আর্জেন্টিনা)