আক্রমণের স্রোতে নেপালের দেয়াল ভাঙতে চায় বাংলাদেশ

গত চার ম্যাচে গোল হজম না করা নেপালের ডিফেন্ডারদের সমীহ করলেও নিজেদের নিয়ে আশাবাদী বাংলাদেশের ফরোয়ার্ডরা।

কাঠমান্ডু থেকে মোহাম্মদ জুবায়েরবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 18 Sept 2022, 10:45 AM
Updated : 18 Sept 2022, 10:45 AM

কখনও দূরপাল্লার চোখ ধাঁধানো শটে লক্ষ্যভেদ করছেন সাবিনা খাতুন। কখনও গতির তোড়ে ডিফেন্ডারদের ছিটকে দিয়ে জাল খুঁজে নিচ্ছেন সিরাত জাহান স্বপ্না। কৃষ্ণা রানী সরকারের নিখুঁত শট খুঁজে পাচ্ছে ঠিকানা। ঋতুপর্ণা চাকমা, তহুরা খাতুনরাও কম যাবেন কেন! বদলি নেমে তারাও আলো ছড়াচ্ছেন আক্রমণভাগে। গত চার ম্যাচে এমন দৃশ্যের দেখা মিলেছে হরহামেশাই। বাংলাদেশের আক্রমণভাগ যেন প্রতিপক্ষের জন্য আতঙ্ক!

পরিসংখ্যানও স্বাক্ষ্য দিছে সেটির। এবার মেয়েদের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি গোলের সৌরভ ছড়ানো (২০টি) দল বাংলাদেশ।

এই উত্তুঙ্গ আত্মবিশ্বাস সঙ্গী করে সোমবার কাঠমান্ডুর দশরথ স্টেডিয়ামে শিরোপা লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে স্বাগতিক নেপাল ও বাংলাদেশ। দুই দলই ঝাঁপাবে প্রথম শিরোপার অনির্বচনীয় স্বাদ নিতে।

আগে চারবার শিরোপার মঞ্চে উঠেও ট্রফি ছোঁয়া হয়নি নেপালের। কাছে গিয়ে না পারার আক্ষেপ আছে বাংলাদেশেরও। ২০১৬ সালের শিলিগুঁড়ির আসরের ফাইনালে বাংলাদেশের স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল ভারতের কাছে হেরে।

এবার আর খালি হাতে ফিরতে চায় না বাংলাদেশ। নেপালের বিপক্ষে সাফে কখনও জিততে না পারার পরিসংখ্যানের চোখ রাঙানিতেও ভীত নয় দল। তাদের মতো নেপালও গত তিন ম্যাচের পথচলায় কোনো গোল হজম করেনি। গীতা রানা, পুনম জারগা মাগাররা প্রতিটি ম্যাচে গড়ে তুলেছেন জমাট রক্ষণ দেয়াল। পোস্টের নিচে অধিনায়ক আঞ্জিলা থাম্বাপো সুব্বা ছিলেন বিশ্বস্ত।

গীতা-পুনমদের সঙ্গে লড়াইয়ে সাবিনা-স্বপ্নারা জিতলেই লেখা হয়ে যাবে শিরোপা জয়ের দারুণ গল্পটা। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে আলাপচারিতায় আক্রমণভাগের সবার কণ্ঠে ফুটে উঠল সেই ইতিহাস লেখার প্রতিজ্ঞা।

পায়ের চোটের অনিশ্চয়তার মেঘ সরিয়ে ফাইনাল খেলতে মুখিয়ে আছেন স্বপ্না। পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ভারতের জালে এবার দুটি এবং সেমি-ফাইনালে ভুটানের বিপক্ষে ১ মিনিট ৩৪ সেকেন্ডে গোল করা এই গতিময় ফরোয়ার্ড আশাবাদী নিজেদের আক্রমণভাগ নিয়ে।

“আমাদের মতো ওরাও এ পর্যন্ত কোনো গোল খায়নি। মানে ওদের ডিফেন্স ভালো। তবে ওদের ডিফেন্স ভেদ করার মতো গতি আমাদের ফরোয়ার্ডদের সবার আছে। গতির সঙ্গে আত্মবিশ্বাসও আছে।”

শক্তিশালী ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে গোলের খাতা খুলেছিলেন কৃষ্ণা। সেমি-ফাইনালে দলের ৮-০ ব্যবধানে জেতা ম্যাচে লক্ষ্যভেদ করেছিলেন তিনি হেডে। ২১ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ডের কণ্ঠেও আত্মবিশ্বাসের স্ফুরণ।

“এর আগেও নেপালের বিপক্ষে আমি খেলেছি, সেখানে পারফরম্যান্স ভালো ছিল। এটা যেহেতু ফাইনাল, ওরাও ভালো করতে চাইবে, আমাদেরও ভালো করতে হবে। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ একটা ম্যাচ হবে। যেহেতু অ্যাটাকিং পজিশনে খেলি, আমিও চাইব সর্বোচ্চটা দিয়ে গোল করতে।”

“নেপালের ডিফেন্স ভাঙার মতো গতি আমাদের আক্রমণভাগের সবার অবশ্যই আছে। ভারতের বিপক্ষে আমরা যেভাবে খেলেছি, ওটার ধারাবাহিকতা যদি ধরে রাখতে পারি, যদি ওই ম্যাচের চেয়ে আরও বেশি এফোর্ট দিতে পারি, তাহলে ভালো করব।”

ভুটানের বিপক্ষে সেমি-ফাইনালে জালের দেখা পেয়েছিলেন তহুরা। ফাইনালে খেলার সুযোগ পেলে তা কাজে লাগাতে উন্মুখ হয়ে আছেন তিনি। আক্রমণভাগের সতীর্থদের আত্মবিশ্বাসের পারদ কতটা উঁচুতে, তা বোঝাতে তহুরা টানলেন ভারত ম্যাচের প্রসঙ্গও।

“যদি ফাইনালে খেলার সুযোগ পাই, তাহলে অবশ্যই চেষ্টা করব গোল করার। আমাদের খেলায় অনেক উন্নতি হয়েছে। দেখুন, এর আগে আমরা যদি ভারতের বিপক্ষে খেলতাম, তাহলে ভাবতাম গোল যত কম খাওয়া যায়; এখন আমরা চাই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করতে। ওদেরকে হারানোর চেষ্টা করি। (ফাইনালর ব্যক্তিগত লক্ষ্য) এটা বলব না, মাঠেই দেখা যাবে…(হাসি)।”

আরেক ফরোয়ার্ড ঋতুপর্ণা পাকিস্তান ম্যাচে ৭৭তম মিনিটে দারুণ শটে লক্ষ্যভেদ করেছিলেন। ভুটান ম্যাচেও লেফট উইং দিয়ে কয়েকবার হানা দিয়ে সফল হয়েছিলেন একবার। ১৮ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ডের বিশ্বাস ‘ওয়ান অন ওয়ান’ পরিস্থিতিতে সাবিনা-স্বপ্নাদের আটকাতে পারবে না নেপালের ডিফেন্ডারদের কেউ!

“আমি যখনই নামি, নিজের শতভাগ দিয়ে খেলার চেষ্টা করি। যেহেতু গত ম্যাচে সুযোগ হয়েছে খেলার, সেটা আমি কাজে লাগিয়েছি। ওদের যে ডিফেন্স লাইন…আমাদের যে ফরোয়ার্ড আছে, আমরা যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী খেলতে পারি, পরিকল্পনা কাজে লাগাতে পারি, তাহলে ওদের ডিফেন্সকে পরাস্ত করতে পারব।”

“আমার বিশ্বাস, নেপালের ডিফেন্ডারদের তুলনায় সাবিনা আপু, কৃষ্ণাদি, স্বপ্না আপুর গতি অনেক বেশি। আমাদের ফরোয়ার্ডদের রানিং ভালো। সাবিনা-স্বপ্না আপু যদি ওদের ডিফেন্ডারদের ওয়ান অন ওয়ান পজিশনে পায়, তাহলে ওরা আপুদের আটকাতে পারবে না।”

দুটি হ্যাটট্রিকসহ ৮ গোল করে এবারের আসরের গোলদাতার তালিকায় শীর্ষে আছেন সাবিনা। বাংলাদেশের আক্রমণভাগের এই প্রাণভোমরার কাঁধে আবার অধিনায়কত্বের ভার। দলনেতা বলেই হয়তো তিনি নিজের চেয়ে সতীর্থদের নিয়ে কথা বলতে বেশি আগ্রহী।

“আপনারাও দেখেছেন, স্বপ্না ওর সর্বোচ্চটা দিচ্ছে। আশা করি ফাইনালেও নেপালের রক্ষণে ও  একটা চাপ সৃষ্টি করবে। ভারতের বিপক্ষে ম্যাচেও আপনারা দেখেছেন, কৃষ্ণা, সানজিদাও কতবার বল নিয়ে ওদের রক্ষণে ঢুকে পড়েছে। আমাদের ফরোয়ার্ডদের সামর্থ্য আছে ভালো করার।”

তবে সাবিনারা যতোই রোমাঞ্চিত হন কেন, কোচ গোলাম রব্বানী একটু বেশি সতর্ক। তাই চলতি সাফে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি গোল উৎসব করা শিষ্যদের তাগিদ দিচ্ছেন ফিনিশিংয়ে আরও মনোযোগী হওয়ার।

“মালদ্বীপের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে আমাদের ফিনিশিং নিয়ে সমস্যা ছিল। পরের ম্যাচে সেটার উন্নতি হয়েছে। এরপর প্রতিটি ম্যাচে সব বিভাগে উন্নতির ধারায় আছে মেয়েরা। নেপালের বিপক্ষে ম্যাচটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচ হবে। ফিফটি-ফিফটি ম্যাচ হবে। এখানে সুযোগ কম আসবে, কিন্তু যেগুলোই আসবে ফিনিশিং করতে হবে।”

কোচ হয়তো তার জায়গা থেকে সাবধানী, তবে সাবিনারা আত্মবিশ্বাসে ফুটছেন টগবগ করে। সেই বিশ্বাসের ভেলায় এবার শেষের বৈতরণী পার হওয়ার পালা।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক