২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫ আশ্বিন ১৪৩৩

বেলজিয়ামের সোনালি প্রজন্মের সেরা সাফল্যের অপেক্ষা

কাতার বিশ্বকাপে শিরোপার দাবিদারদের মধ্যে থাকবে রবের্তো মার্তিনেসের বেলজিয়াম।

স্পোর্টস ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 08 Oct 2022, 09:00 AM

Updated : 17 Nov 2022, 07:21 PM

ঠিক যে শেষের গান শুনছে বেলজিয়ামের সোনালি প্রজন্ম, তা নয়। কিন্তু দিনে দিনে বয়স তো আর কম হলো না একেবারে। এদেন আজার ও কেভিন ডে ব্রুইনের তিরিশ পেরিয়েছে; তিরিশ চলছে থিবো কর্তোয়ার; লুকাকু তিরিশ ছুঁই ছুঁই। অভিজ্ঞতায় এখন তারা আরও ঋদ্ধ। এর সঙ্গে বয়সের মিশেলে আরও পরিণত। কাতার বিশ্বকাপে বেলজিয়ামকে নিয়ে বাজি ধরার লোক নেহাত কম থাকবে না।  

আক্রমণভাগে আজার, লুকাকুর মতো নির্ভরযোগ্য ফরোয়ার্ড আছে। মাঝমাঠের সুর বেঁধে দেওয়ার জন্য আছে ডে ব্রুইনের মতো সুনিপূণ শিল্পী। পোস্টের নিচে বিশ্বস্ত কর্তোয়া। ডাগআউটে কৌশলী কোচ রবের্তো মার্তিনেস-সাফল্যের চূড়ায় ওঠার প্রয়োজনীয় সব রসদই মজুদ আছে বেলেজিয়াম দলে। বিশ্বকাপের অধরা ট্রফি জয়ের দুর্বিবার আকাঙ্ক্ষা নিয়েই এবার কাতারের নোঙর ফেলবে তারা।

সোনালী এই প্রজন্মের হাত ধরে একই চাওয়া নিয়ে চার বছর আগে রাশিয়াতেও পা রেখেছিল বেলজিয়াম। কিন্তু চূড়ায় পদচিহ্ন একেঁ দেওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তবে একেবারে যে রিক্ত-শূন্য হাতে ফিরেছিল বেলজিয়াম, তাও নয়। তৃতীয় হয়েছিল তারা; বৈশ্বিক ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরে এখন পর্যন্ত এটাই সেরা সাফল্য বেলজিয়ামের।

ওই সাফল্যের পরের পথচলায় বেলজিয়ামের খেলোয়াড়রা সপ্তাহর পর সপ্তাহ ক্লাব পর্যায়ে দ্যুতি ছড়িয়ে চলেছেন। ২০১৮ সালে ফিফার সেরা গোলরক্ষকের মুকুট জেতা কর্তোয়া ২০২১-২২ মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে পান চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের অনির্বচনীয় স্বাদ। ম্যানচেস্টার সিটির জার্সিতে এ পর্যন্ত চারটি প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা জিতেছেন ডে ব্রুইনে। রাশিয়া বিশ্বকাপে ‘সিলভার বল’ জেতা আজার, ‘ব্রোঞ্জ বুট’ পাওয়া লুকাকুও আছেন বেলজিয়ামের তাবুতে।

কাতার বিশ্বকাপের বাছাইয়েও আলো ঝলমলে পারফরম্যান্সের পসরা মেলেছিল বেলজিয়াম। উয়েফা অঞ্চলের ‘ই’ গ্রুপে তারা সেরা হয়েছিল ৮ ম্যাচের ছয়টি জিতে, দুটিতে ড্র করে। তবে এর মাঝেও যে দুঃসময় মার্তিনেসের দলকে একেবারে তাড়া করেনি, তা নয়। গত সেপ্টেম্বরে উয়েফা নেশন্স লিগের ফাইনাল ফোরে জায়গা করে নিতে পারেনি তারা। তারপরও অনেক কারণে এবারের বিশ্বকাপে সমীহ পাওয়ার মতো দল বেলজিয়াম।

মার্তিনেসের মানসিকতা এবং ট্যাকটিকস

উইগান অ্যাথলেটিকের দায়িত্ব নেওয়ার সময় থেকে ৩-৪-৩ ফরমেশন আঁকড়ে ধরেন মার্তিনেস। এই দলের জার্সিতে ক্লাব ক্যারিয়ারের দারুণ সময় কাটান তিনি, ২০১৩ সালের এফএ কাপ জেতেন উইগানের কোচ হিসেবে; দুজন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার এবং ফুল-ব্যাকদের উপরে ওঠার স্বাধীনতা দেওয়ার ছকে থেকে। বেলজিয়ামের এই কৌশলের বৈশিষ্ট হচ্ছে নিজেরা চাপ দেওয়ার আগে প্রতিপক্ষকে উপরে উঠে আসতে প্রলুব্ধ করা।

স্প্যানিশ-বংশোদ্ভূত মার্তিনেস প্রিয় এই ফরমেশনও একবার দূরে ঠেলে দিয়েছিলেন; ২০১৮ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিপক্ষে কোয়ার্টার-ফাইনালে। বলার অপেক্ষা রাখে না, সাহসী ওই পদক্ষেপের পুরস্কার পেয়েছিল দলটি। ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারিয়ে উঠেছিল সেমি-ফাইনালে। ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে অবশ্য শিরোপাজয়ী ফ্রান্সের সঙ্গে পেরে ওঠেনি তারা। তবে ইংল্যান্ডকে ২-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপে নিজেদের সেরা সাফল্য তৃতীয় স্থান ঠিকই অর্জন করে নেয় বেলজিয়াম।

মার্তিনেসের কৌশলে মুগ্ধ বেলজিয়াম দলের বর্তমান খেলোয়াড়রা। ড্রেসিংরুমের সঙ্গে কোচের সম্পর্কের দৃঢ়তা কতখানি, তা উঠে এলো সেন্টার-ব্যাক ইয়ান ভার্টোনেনের কণ্ঠে।

“তার শক্তির জায়গা ‍দুটি: অনুশীলনে এবং অনুশীলনের বাইরে তিনি সমান চিত্তাকর্ষক। জাতীয় দল এবং সাধারণভাবে বেলজিয়ামের ফুটবলের সাংগঠনিক বিষয়ের দিক দিয়ে দেখলে তিনি অসাধারণ। ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এবং মেধাবী খেলোয়াড়দের সংমিশ্রণে তিনি শক্তিশালী একটা দলকে একত্রিত করতে সক্ষম। তিনি জানেন, কীভাবে দলের সবাইকে একই সুরে-ছন্দে খেলাতে হয়, যেটা কখনই সহজ কাজ নয়।”

অধিনায়ক আজারের দৃষ্টিতে মার্তিনেস একজন সাহসী কোচ। রিয়াল মাদ্রিদ ফরোয়ার্ডের কথায় উঠে এলো শিষ্যদের সঙ্গে কোচের সম্পর্কের নিবিড়তার দিকটিও।

“তিনি নিয়মিত আমাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং খেলোয়াড়দের সঙ্গে অবিশ্বাস্য ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তার। এটাই একজন কোচের সবচেয়ে বড় প্রয়োজনীয় গুণ, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ফুটবলে, যেখানে তিনি আমাদের সঙ্গে কাজ করার খুব কম সময়ই পান। এর বাইরে তিনি কৌশলগতভাবে খুবই ভালো এবং বড় সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পান না। তিনি একজন বড় মাপের কোচ।”

চাবিকাঠি: কেভিন ডে ব্রুইনে

একঝাঁক তারকা নিয়ে কাতার বিশ্বকাপে রণতরী ভেড়াবে উজ্জীবিত বেলজিয়াম দল। ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোতে খেলা বেশ কয়েকজন তারকা থাকবে দলটির তাবুতে। এদের মধ্যে আজারের সময়টা অবশ্য রিয়ালে ভালো যাচ্ছে না। প্রথম একাদশে বলতে গেলে ঠাঁই মিলছে না।

চেলসি ছেড়ে ইন্টার মিলানের চেনা আঙিনায় ফিরে ভালোই ছিলেন লুকাকু। সম্প্রতি ভুগছেন ঊরুর চোটে। তবে দলের সর্বোচ্চ গোলদাতা নিশ্চিতভাবে মার্তিনেসের মরণাস্ত্রের একটি।

বেলজিয়াম দলের খেলোয়াড়দের সাম্প্রতিক সময়ের পারফরম্যান্সের দিক থেকে একজন একটু আলাদা, যার অবস্থান বাকিদের চেয়ে উঁচুতে। যার চওড়া কাঁধে সওয়ার হয়ে প্রিমিয়ার লিগে একের পর এক সাফল্য পাচ্ছে ম্যানচেস্টার সিটি। তিনি ধারাবাহিকভাবে আলো ঝলমলে পারফরম্যান্স উপহার দিয়ে চলা ডে ব্রুইনে।

মেধাবী এই খেলোয়াড়ের সঙ্গে যাদের নিবিড়ভাবে কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছে, তাদের চোখে ৩১ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডার ভিন্ন গ্রহের। গত সেপ্টেম্বরে আন্তর্জাতিক বিরতির সময় কোচ মার্তিনেসও প্রিয় এই শিষ্যের প্রশংসায় হয়েছিলেন পঞ্চমুখ।

“এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক ফুটবলে সবচেয়ে মেধাবী প্লেমেকার হচ্ছে ডে ব্রুইনে। যেভাবে সে ম্যাচ পড়তে পারে, স্থান-কালভেদে অনুবাদ করতে পারে এবং গোলমুখে প্রয়োগ করতে পারে, এককথায় তা দারুণ।”

মাঝমাঠের সতীর্থ আক্সেল উইটসেলের চোখে ডে ব্রুইনে জাদুকর।

“সে একজন জাদুকর। তার সঙ্গে খেলতে পারাটা সম্মানের। অন্যরা যেটা দেখতে পায় না, সে দেখতে পায় এবং বছরের পর বছর সে এমন পারফরম্যান্স করে যাচ্ছে। অসাধারণ একজন ফুটবলার।”

চোখ থাকবে চার্লস ডে কেটেলারের উপর

বয়স মাত্র ২১ বছর, কিন্তু এরই মধ্যে কেটেলার নিজেকে সম্ভাবনাময় হিসেবে মেলে ধরেছেন। ছয় ফুট চার ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের এই অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার ক্লাব ব্রুগেতে দারুণ সময় কাটিয়ে নজরে পড়েন এসি মিলানের। সাড়ে তিন কোটি ইউরোয় পাড়িও জমিয়েছেন ইতালিতে।

চ্যাম্পিয়ন্স লিগের গত মৌসুমের গ্রুপ পর্বে পিএসজির বিপক্ষে চোখ ধাঁধানো ফুটবল খেলেছিলেন কেটেলারে। মার্কিনিয়োস ও প্রেসনেল কিম্পেম্বেকে দুঃস্বপ্নময় রাত উপহার দিয়েছিলেন এই তরুণ; নিজেদের মাঠের ওই ম্যাচে তারকাঠাসা পিএসজিকে ১-১ ড্রয়ে রুখে দিয়েছিল ব্রুগে।

আক্রমণভাগের যেকোনো জায়গায় সমানভাবে খেলতে সক্ষম কেটেলারে। বায়ে, ডানে, নাম্বার ১০ পজিশনে, দ্বিতীয় স্ট্রাইকার হিসাবে, এমনকি লাইনে নেতৃত্ব দিতেও পারদর্শী তিনি। আঁটসাঁট জায়গায় প্রতিপক্ষের কড়া পাহারার মধ্যে খেলতে বিশেষ দক্ষ এই তরুণ।

আজার, লুকাকু, মিচি বাতসুয়াই এবং ডে ব্রুইনের মতো বেলজিয়াম আক্রমণভাগে এখনও নিয়মিত হতে পারেননি কেটেলারে। তবে মার্তিনেসের কাছে হয়ে উঠেছেন আস্থা রাখার মতো বিকল্প। বেলজিয়াম কোচকে স্রেফ এই উঠতি তারকাকে সাবধানে কাজে লাগাতে হবে।

বিশ্বকাপ ইতিহাসে বেলজিয়াম

‘রেড ডেভিলস’ খ্যাত বেলজিয়াম সেই ১৯২০ সালে অলিম্পিকের ফুটবল ইভেন্টে জিতেছিল সোনার পদক। কিন্তু এই সাফল্যের রেশ তারা টেনে নিতে পারেনি বিশ্বকাপে। শুরুর কিছু আসরে তো তেমন কোনো ছাপই রাখতে পারেনি বেলজিয়াম। ১৯৩০ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত ব্যর্থ হয় গ্রুপ পর্বের বৈতরণী পার হতে।

১৯৮২ থেকে ২০০২ সাল-এই সময়কালে অবশ্য ভালো থেকে আরও ভালো করেছে দলটি। প্রতিটি বিশ্বকাপের বাছাই পেরিয়েছে দারুণভাবে। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের স্বপ্নভঙ্গ হয় দিয়েগো আরমান্দো মারাদোনায় উজ্জীবিত আর্জেন্টিনার কাছে সেমি-ফাইনালে হেরে। সেবার চতুর্থ হয়ে আসর শেষ করে তারা।

২০০৬ ও ২০১০ বিশ্বকাপের বাছাইয়ের বাধাই ডিঙাতে পারেনি তারা। পরের আসরে কোয়ার্টার-ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে হেরে বাজে বিদায় ঘণ্টা। সবশেষ ২০১৮ রাশিয়া আসরে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ২-০ গোলে জেতে বেলজিয়াম।

এবারের বাছাই মার্তিনেসের দল পেরিয়েছে দুরন্ত গতিতে। শেষের পথে ছোটা ‘সোনালি প্রজন্মের’ এই গতিটুকু কাতারেও অটুট থাকলে বাজিমাত করতেই পারে বেলজিয়াম।