যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন হয়ে আনন্দ-বেদনার মিশ্র অনুভূতির দোলাচল বাংলাদেশ দলে

‘একটা ফাইনালের মীমাংসা কীভাবে টসে হয়’ - ম্যাচ শেষে প্রশ্ন তুললেন বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের অধিনায়ক আফিদা খন্দকার।

ক্রীড়া প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 9 Feb 2024, 03:57 AM
Updated : 9 Feb 2024, 03:57 AM

কয়েন টসে ‘নীল’ অংশ পড়ার পরই শুরু হলো ভারতের উৎসব। বাংলাদেশ অধিনায়ক আফিদা খন্দকার তখন হতভম্ব। পরে প্রতিক্রিয়ায় তিনি জানালেন, টসে যে সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ উইমেন’স চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা নিষ্পত্তি হবে, এটা নিয়ে তিনি কিছুই জানতেন না। এমনকি দলের পক্ষ থেকে টিম ম্যানেজার বা কেউ তাকে এ বিষয়ে বলেনি কিছুই। 

কমলাপুরের বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী মোস্তফা কামাল স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ ও ভারতের ফাইনালে বিতর্কের সূত্রপাত এই টসকে ঘিরেই। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা শেষ হয় ১-১ সমতায়। পাঁচ শটের টাইব্রেকারেও ছিল ৫-৫ সমতা। এরপর এক শটের টাইব্রেকারে দুই দলই জালের দেখা পায় ছয় বার করে। 

এরপরই ম্যাচ কমিশনার ডি সিলভা জয়াসুরিয়া ডিলানের সেই চমকপ্রদ সিদ্ধান্ত। রেফারিকে ডেকে টসে ট্রফি নিষ্পত্তির নির্দেশনা দেন তিনি। ম্যাচ কমিশনারের নির্দেশনা অনুযায়ী রেফারি টস করেন। সেখানে জিতে ভারত। এরপরই হট্টগোলের শুরু।

‘বাইলজ-এ টসে শিরোপা নিষ্পত্তির ধারা নেই, আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে টাইব্রেকার চালিয়ে যাওয়াই নিয়ম’-এই দাবিতে টস নিয়ে আপত্তি জানায় বাংলাদেশ। এরপর দুটি দেশের ফুটবল ফেডারেশন, দক্ষিণ এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশন (সাফ), এশিয়ান ফুটবলের নিয়ন্তা সংস্থার (এএফসি) কর্তাদের মধ্যে প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে চলে আলোচনা। দুই পক্ষের সম্মতিতে শেষ পর্যন্ত যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা হয় বাংলাদেশ ও ভারতকে। 

ম্যাচ শেষের প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ অধিনায়ক আফিদা খন্দকার জানালেন, রেফারি ডেকেছেন বলেই টস করতে গিয়েছিলেন তিনি।

“আমরা নব্বই মিনিট খেলেছি, টাইব্রেকার নিয়েছি, টসের মাধ্যমে কীভাবে একটা দলের হার-জিত হবে? এটা কোনো নিয়মের মধ্যেই পড়ে না। কেউ আমাকে কিছু বলে নাই যে, টসের মাধ্যমে তুমি জিতবে বা হারবে। কিছুই বলেনি।” 

“আমাকে ডেকেছে, আমি ভেবেছি টস করার পর আমরা রি-কিক (পুনরায় টাইব্রেকার) নেব, ওরা সেভ দেবে বা এরকম কিছু। আমাকে বলল, কয়েনের নীল পাশ ওরা, তুমি সবুজ। টস করল, ওদেরটা পড়ল, বাঁশি বাজিয়ে রেফারি ওদের জিতিয়ে দিল!”

শেষ পর্যন্ত যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন হয়ে খুশিই আফিদা। টস-বিতর্ক নিয়ে আর ভাবতে চাইছেন না তিনি। তবে ফাইনালে তার দল যে দল ভালো খেলেনি, তা মেনে নিলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। 

“আনন্দেরই সবকিছু। দুঃখের কিছু নেই। আমরা চেয়েছিলাম চ্যাম্পিয়ন হতে। আল্লাহ আমাদের যেভাবে চ্যাম্পিয়ন হওয়া ভাগ্যে রেখেছেন, ওভাবেই হয়েছি। এককভাবে হলে আরও বেশি ভালো লাগত, খুব খুশি হতাম। প্রথমবার অধিনায়ক হয়েছি, প্রথমবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। তাও হাজার হাজার শুকরিয়া যে চ্যাম্পিয়ন হয়েছি।” 

“জানি না আজকে কী হয়েছিল আমাদের, খেলার মধ্যে মাথা ঠিক থাকে না। কখন কী করে বসি, কখন কী বলি, কী খেলি-তখন মাথার মধ্যে এসব কিছু কাজ করে না। যখন গোল খেলাম, তখন আমাদের মাথার মধ্যে ভাবনা ছিল গোল কীভাবে শোধ দেব। যে কোনোভাবে আমাদের সমতায় ফিরতে হবে। জিততে হবে। সাগরিকা গোল করে আমাদের যে খুশি দিয়েছে! তখন আমরা আশ্বাস পেয়েছি (বিশ্বাস করেছি), ভালো কিছু হবে।” 

টুর্নামেন্টজুড়ে দুর্দান্ত পারফর্ম করা সাগরিকা ফাইনালে ছিলেন নিজের ছায়া হয়ে। তবে দ্বিতীয়ার্ধের যোগ করা সময়ে এই ফরোয়ার্ডই এনে দেন ম্যাচ টাইব্রেকারে টেনে নিয়ে যাওয়ার উপলক্ষ।

তবে বিতর্কের স্রোত পেরিয়ে যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় কিছুটা আক্ষেপ আছে সাগরিকার।

“প্রথমে খুব খারাপ লাগছিল, গোল দিতে পারছিলাম না। ওরাও খেলেছে, আমরাও খেলেছি। কিন্তু ওরা গোল করে ফেলেছে, আমরা পারিনি।  পরে গোল করেছি। খুব ভালো লাগছে।” 

“যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন হতে হলো, একটু তো আক্ষেপ আছেই। এটা তো এককভাবে আমাদের হওয়ার কথা ছিল। তারপরও অনেক খুশি যে, আমরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছি।”

সাগরিকা আরও বেশি খুশি বাবা-মা ফাইনাল দেখতে স্টেডিয়ামে আসায়। বাবা-মা যে মাঠে আসবেন, তা এই ফরোয়ার্ড নিজেও জানতেন না! 

ম্যাচ শেষের প্রতিক্রিয়ার সময় যখন বাবা-মায়ের সঙ্গে এলেন, তাদের জড়িয়ে ধরে আনন্দের কান্নাই শেষ হচ্ছিল না সাগরিকার। 

“জানতাম না বাবা-মা আসবেন। ম্যাচের আগে একজন এসে যখন বললো, আমার বাবা-মা এসেছেন, সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে তাদের কাছে যাই। খুব ভালো লেগেছে বাবা-মা এতদূর থেকে এসেছেন আমার খেলা দেখতে।”

“আমার বাবা প্রথমে আমাকে খেলতে দিতে চাননি। পরে উনি রাজি হয়েছেন, সমর্থন দিয়েছেন। আমি বাবাকে বলেছিলাম যে, একদিন আমি বড় খেলোয়াড় হয়ে তোমাকে দেখাব। বাবা-মায়ের সামনে খেলেছি। দেখিয়ে দিয়েছি যে, আমি পারি।” 

অনেকের অনেক বাঁকা চাহনি, কটূক্তি সয়ে এতদূর এসেছেন সাগরিকা। রাউন্ড রবিন লিগ ও ফাইনাল মিলিয়ে গোল করেছেন ৪টি। ঠাকুরগাঁ থেকে উঠে আসা এই ফরোয়ার্ড এখন জাতীয় দলে করে নিতে চান জায়গা। 

“অনেক ভালো লাগছে, যারা আগে আমার খেলা নিয়ে খারাপ কথা বলতো, তারাই এখন আমাকে সমর্থন করছে।” 

“জাতীয় দলে অনেক বড় আপু আছেন। তারাও আমার চেয়ে অনেক ভালো খেলেন। তবে আমার চেষ্টা থাকবে সেরাটা দিয়ে জাতীয় দলে সুযোগ করে নেওয়ার।”