বিশ্বকাপের গল্প
Published : 08 Jun 2026, 08:20 AM
১৯৯৮ সালের ১০ জুন থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত ফ্রান্সে বসে বিশ্বকাপের ষোড়শ আসর। ১৭৪ দেশের বাছাই পর্ব পেরিয়ে ৩০টি দল জায়গা করে নেয়। সরাসরি খেলে শিরোপাধারী ব্রাজিল ও স্বাগতিক ফ্রান্স।
আগের দুই আসরে বাছাই পর্বই পার হতে পারেনি, এমন দলকে নিয়ে বাজি ধরতে যাবে কে? ফেভারিটদের তালিকায় তাদের রাখতে যাবেই বা কে? তবে জিনেদিন জিদানের জাদুকরী ফুটবলে সব হিসাব পাল্টে দেয় ফ্রান্স। দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে জিতে বিশ্বকাপ।
১৯৩৮ সালে প্রথমবারের মতো ফ্রান্সে বসেছিল বিশ্বকাপ আসর। ১৯৯২ সালে জুরিখে ফিফা অধিবেশনে মরক্কোকে ১২-৭ ভোটে হারিয়ে ষোড়শ আসর আয়োজনের দায়িত্ব পায় তারা।
১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ থেকেই ২৪ দলের জায়গায় অংশ নেয় ৩২ দল। আট গ্রুপে রাখা হয় চারটি করে দল।
বিশ্বকাপে অংশ নেয় যে দেশগুলো-
ইউরোপ: অস্ট্রিয়া, বেলজিয়া, বুলগেরিয়া, ক্রোয়েশিয়া, ডেনমার্ক, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, রোমানিয়া, স্কটল্যান্ড, স্পেন ও যুগোস্লাভিয়া
দক্ষিণ আমেরিকা: আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, চিলি, কলম্বিয়া ও প্যারগুয়ে
উত্তর আমেরিকা: জ্যামাইকা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্র
এশিয়া: ইরান, জাপান, সৌদি আরব ও দক্ষিণ কোরিয়া
আফ্রিকা: ক্যামেরুন, মরক্কো, নাইজেরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও তিউনিসিয়া
এই আসর দিয়ে বিশ্বকাপে অভিষেক হয় ক্রোয়েশিয়া, জাপান, জ্যামাইকা ও দক্ষিণ আফ্রিকার।
৩২টি দল আটটি গ্রুপে খেলে, গ্রুপগুলো হলো-
গ্রুপ ‘এ’: ব্রাজিল, স্কটল্যান্ড, নরওয়ে, মরক্কো
গ্রুপ ‘বি’: ইতালি, অস্ট্রিয়া, চিলি, ক্যামেরুন
গ্রুপ ‘সি’: ফ্রান্স, ডেনমার্ক, দক্ষিণ আফ্রিকা, সৌদি আরব
গ্রুপ ‘ডি’: স্পেন, নাইজেরিয়া, প্যারাগুয়ে, বুলগেরিয়া
গ্রুপ ‘ই’: নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, দক্ষিণ কোরিয়া, মেক্সিকো
গ্রুপ ‘এফ’: জার্মানি, যুগোস্লাভিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান
গ্রুপ ‘জি’: রোমানিয়া, কলম্বিয়া, ইংল্যান্ড, তিউনিসিয়া
গ্রুপ ‘এইচ’: আর্জেন্টিনা, ক্রোয়েশিয়া, জাপান, জ্যামাইকা
আট গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ দল যাবে দ্বিতীয় রাউন্ডে। সেখান থেকেই হবে নক আউট পর্ব। এরপর ধাপে ধাপে যাবে কোয়ার্টার-ফাইনাল, সেমি-ফাইনাল ও ফাইনালে।
এই আসরে অতিরিক্ত সময়ে খেলার নিয়মে একটি পরিবর্তন আসে। এই ৩০ মিনিটে যখনই গোল হবে তখনই খেলা শেষ। এই গোলের নাম ছিল ‘গোল্ডেন গোল।’
গ্রুপ পর্ব
গ্রুপ ‘এ’ থেকে শেষ ষোলোয় যায় ব্রাজিল ও নরওয়ে। দুই জয়ে ৬ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ সেরা হয় ব্রাজিল। দুই ড্রয়ের পাশাপাশি ব্রাজিলের বিপক্ষে জয়ে ৫ পয়েন্ট নিয়ে রানার্সআপ হয় নরওয়ে।
একটি করে জয় ও ড্রয়ে ৪ পয়েন্ট পায় মরক্কো। ব্রাজিল ওই হার এড়াতে পারলে পরের রাউন্ডে যেত আফ্রিকার দলটি। স্কটল্যান্ডের প্রাপ্তি একটি ড্র।
গ্রুপ ‘বি’ থেকে শেষ ষোলোয় যায় ইতালি ও চিলি। দুই জয় ও এক ড্রয়ে ৭ পয়েন্ট পায় ইতালি। তিন ড্রয়ে ৩ পয়েন্ট নিয়ে রানার্সআপ চিলি। দুটি করে ড্রয়ে ২ পয়েন্ট নিয়ে বিদায় নেয় অস্ট্রিয়া ও ক্যামেরুন। ১৯৫৮ আসরের পর সেবারই প্রথম বিশ্বকাপে কোনো জয় পেতে ব্যর্থ হয় অস্ট্রিয়া।
গ্রুপ ‘সি’ থেকে পরের রাউন্ডে যায় ফ্রান্স ও ডেনমার্ক। তিন জয়ে ৯ পয়েন্ট নিয়ে দাপটের সঙ্গে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয় ফ্রান্স। একটি করে জয় ও ড্রয়ে ৪ পয়েন্ট নিয়ে রানার্সআপ ডেনমার্ক।
বিশ্বকাপ অভিষেকে দুই ম্যাচ ড্র করে দক্ষিণ আফ্রিকা। সৌদি আরবের প্রাপ্তি ১ পয়েন্ট।
গ্রুপ ‘ডি’ থেকে সবাইকে চমকে দিয়ে পরের রাউন্ডে যায় নাইজেরিয়া ও প্যারাগুয়ে। দুই জয়ে ৬ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ সেরা নাইজেরিয়া। এক জয় ও দুই ড্রয়ে ৫ পয়েন্ট নিয়ে রানার্সআপ প্যারাগুয়ে।
একটি করে জয় ও ড্রয়ে ৪ পয়েন্ট নিয়ে তিনে থেকে বিদায় নেয় স্পেন। বুলগেরিয়ার প্রাপ্তি ১ পয়েন্ট।
গ্রুপ ‘ই’ থেকে পরের রাউন্ডে যায় নেদারল্যান্ডস ও মেক্সিকো। একটি করে জয় ও দুটি করে ড্রয়ে দুই দলই পায় ৫ পয়েন্ট। গোল পার্থক্যে এগিয়ে থেকে গ্রুপ সেরা হয় নেদারল্যান্ডস, রানার্সআপ মেক্সিকো।
তিন ড্রয়ে ৩ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় হয় বেলজিয়াম। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রাপ্তি ১ পয়েন্ট।
গ্রুপ ‘এফ’ থেকে শেষ ষোলোয় যায় জার্মানি ও যুগোস্লাভিয়া। দুটি করে জয় ও নিজেদের মধ্যে ড্রয়ে এই দুই দলই পায় ৭ পয়েন্ট করে। গোল পার্থক্যে এগিয়ে গ্রুপ সেরা হয় জার্মানি, রানার্সআপ যুগোস্লাভিয়া।
এক জয়ে ৩ পয়েন্ট নিয়ে ফেরে ইরান। সব ম্যাচেই হেরে শূন্য হাতে বিদায় নেয় যুক্তরাষ্ট্র।
গ্রুপ ‘জি’ থেকে পরের রাউন্ডে যায় রোমানিয়া ও ইংল্যান্ড। দুই জয় ও এক ড্রয়ে ৭ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ সেরা রোমানিয়া। দুটি জয়ে রানার্সআপ ইংল্যান্ড।
একটি জয় নিয়ে ফেরে কলম্বিয়া। ১ পয়েন্ট পায় তিউনিসিয়া।
গ্রুপ ‘এইচ’ থেকে শেষ ষোলোয় যায় আর্জেন্টিনা ও ক্রোয়েশিয়া। তিন জয়ে ৯ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ সেরা হয় আর্জেন্টিনা। দুই জয়ে ৬ পয়েন্ট নিয়ে রানার্সআপ ক্রোয়েশিয়া।
দুই অভিষিক্তের লড়াইয়ে জিতে ৩ পয়েন্ট পায় জ্যামাইকা। তিন হারে শূন্য হাতে ফেরে জাপান। তবে দারুণ লড়াই করে তারা। তিন ম্যাচেই হারে ন্যূনতম ব্যবধানে।
জ্যামাইকার বিপক্ষে ৫-০ ব্যবধানের জয়ে আসরের একমাত্র হ্যাটট্রিক করেন আর্জেন্টিনার স্ট্রাইকার গাব্রিয়েল বাতিস্তুতা।
দ্বিতীয় রাউন্ড
শেষ ষোলোয় মুখোমুখি: ইতালি-নরওয়ে, ব্রাজিল-চিলি, ফ্রান্স-প্যারাগুয়ে, ডেনমার্ক-নাইজেরিয়া, জার্মানি-মেক্সিকো, যুগোস্লাভিয়া-নেদারল্যান্ডস, ক্রোয়েশিয়া-রোমানিয়া ও আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড
২৭ জুনের প্রথম ম্যাচে নরওয়েকে কোনোমতে ১-০ গোলে হারায় ইতালি। পরের ম্যাচে চিলিকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দেয় ব্রাজিল। জোড়া গোল করেন রোনালদো ও সেসার সাম্পাইও।
পরদিন ফ্রান্স ও প্যারাগুয়ে ম্যাচে বিশ্বকাপ দেখে প্রথম গোল্ডেন গোল। গোলশূন্য ৯০ মিনিটের পর খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। ১১৪তম মিনিটে লরাঁ ব্লাঁ পান জালের দেখা। আর এই গোল দিয়ে তখনই শেষ হয়ে যায় ম্যাচ। পরের ম্যাচে নাইজেরিয়াকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে শেষ আটে জায়গা করে নেয় ডেনমার্ক।
২৯ জুনের প্রথম ম্যাচে ৪৭তম মিনিটে লুইস এর্নান্দেসের গোলে এগিয়ে যায় মেক্সিকো। ৭৪তম মিনিটে সমতা ফেরান ইয়ুর্গেন ক্লিন্সমান। ৮৬তম মিনিটে অলিভিয়ার বিয়েরহফের গোলে এগিয়ে যায় জার্মানি। ব্যবধান ধরে রেখে পায় দারুণ এক জয়।
দিনের অন্য ম্যাচে, যুগোস্লাভিয়াকে ২-১ গোলে হারায় নেদারল্যান্ডস। ৯১তম মিনিটে ম্যাচে ছিল ১-১ সমতা। ম্যাচ ছিল অতিরিক্ত সময়ে যাওয়ার পথে। ৯২তম মিনিটে গোল করে ডাচদের কোয়ার্টার-ফাইনালে নিয়ে যান এডগার ডেভিডস।
পরদিনের প্রথম ম্যাচে বেলজিয়ামকে ১-০ গোলে হারায় ক্রোয়েশিয়া। পরের ম্যাচে জমজমাট লড়াই উপহার দেয় আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড।
পঞ্চম মিনিটে সফল স্পট কিকে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে নেন বাতিস্তুতা। চার মিনিট পর পেনাল্টি থেকেই সমতা ফেরায় ইংল্যান্ড। ১৬তম মিনিটে দুর্দান্ত গতিতে আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডারদের এড়িয়ে চমৎকার এক গোল করেন মাইকেল ওয়েন। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে বুদ্ধিদীপ্ত ফ্রি কিকে সমতা ফেরায় আর্জেন্টিনা।
টাইব্রেকারে ব্যবধান গড়ে দেন লাতিন আমেরিকার দলটির গোলরক্ষক কার্লোস রোয়া। দলকে ৪-৩ ব্যবধানে জেতাতে তিনি সেভ করেন দুটি স্পট কিক।
কোয়ার্টার-ফাইনাল
শেষ আটে মুখোমুখি: ইতালি-ফ্রান্স, ব্রাজিল-ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস-আর্জেন্টিনা ও জার্মানি-ক্রোয়েশিয়া।
৩ জুলাই প্রথম ম্যাচে নির্ধারিত ৯০ মিনিটের পর অতিরিক্ত সময়েও কোনো গোল পায়নি ইতালি ও ফ্রান্স। টাইব্রেকারে ৪-৩ গোলে জিতে সেমি-ফাইনালে যায় ফ্রান্স।
দিনের অন্য ম্যাচে, রোমাঞ্চকর ফুটবল উপহার দেয় ব্রাজিল ও ডেনমার্ক। দ্বিতীয় মিনিটেই এগিয়ে যায় ডেনমার্ক। দশম মিনিটে সমতা ফেরান বেবেতো।
২৫তম মিনিটে ব্রাজিলকে এগিয়ে নেন রিভালদো। ৫০তম মিনিটে সমতা ফেরান ব্রায়ান লাউড্রাপ। ৫৯তম মিনিটে ফের দলকে এগিয়ে নেন রিভালদো। এবার আর পারেনি ডেনমার্ক। দারুণ লড়াইয়ের পর হেরে যায় ৩-২ ব্যবধানে।
৪ জুলাই দারুণ জমে ওঠে আর্জেন্টিনা ও নেদারল্যান্ডসের লড়াই। দ্বাদশ মিনিটে ডাচদের এগিয়ে নেন পাট্রিক ক্লুইভার্ট। ১৭তম মিনিটে সমতা ফেরায় আর্জেন্টিনা।
মনে হচ্ছিল ম্যাচ যাবে অতিরিক্তি সময়ে। তবে, ৯০তম মিনিটে দুর্দান্ত এক গোলে আর্জেন্টাইনদের হৃদয় ভেঙে দেন ডেনিস বার্গকাম্প। ২-১ গোলের জয়ে সেমি-ফাইনালে যায় নেদারল্যান্ডস।
দিনের পরের ম্যাচে, বড় চমক দেখায় ক্রোয়েশিয়া। জার্মানিকে হারিয়ে দেয় ৩-০ ব্যবধানে!
সেমি-ফাইনাল
৭ জুলাই মার্সেইয়ে ফাইনালে যাওয়ার লড়াইয়ে মুখোমুখি হয় ব্রাজিল ও নেদারল্যান্ডস। ৪৬তম মিনিটে রিভালদোর গোলে এগিয়ে যায় ব্রাজিল। ৮৭তম মিনিটের গোলে ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে নেন ক্লুইভার্ট। পরে টাইব্রেকারে ৪-২ ব্যবধানে জেতে ব্রাজিল।
পরদিন আরেক সেমি-ফাইনালে ৪৬তম মিনিটে ক্রোয়েশিয়াকে এগিয়ে নেন দাভোর সুকের। ফ্রান্সকে পথ দেখান ডিফেন্ডার লিলিয়ান থুরাম। ৪৭তম মিনিটে সমতা ফেরানোর পর, ৭০তম মিনিটে তিনি এগিয়ে নেন দলকে। ২-১ গোলে জিতে প্রথমবারের মতো ফাইনালে যায় ফ্রান্স।
১১ জুলাই তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে নেদারল্যান্ডসকে ২-১ গোলে হারায় ক্রোয়েশিয়া।
ফাইনাল
১২, ১৯৯৮। ৭৫,০০০ হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে মুখোমুখি হয় ব্রাজিল ও ফ্রান্স।
টানা দ্বিতীয় ও সব মিলিয়ে পঞ্চম শিরোপার জন্য ফেভারিট ছিল ব্রাজিল। তবে তাদের হতাশায় ডুবিয়ে প্রথমার্ধে ২-০ গোলে এগিয়ে যায় ফ্রান্স। চমৎকার দুটি হেডে দুটি গোলই করেন জিদান। পরে ম্যাচের যোগ করা সময়ে ব্যবধান আরও বাড়ায় স্বাগতিকরা।
৩-০ ব্যবধানের জয়ে বিশ্বকাপ জয়ের উল্লাসে মাতে ফ্রান্স!
এক নজরে ষোড়শ বিশ্বকাপ
স্বাগতিক: ফ্রান্স
চ্যাম্পিয়ন: ফ্রান্স
রানার্সআপ: ব্রাজিল
মোট ম্যাচ: ৬৪
মোট গোল: ১৭১
গোল গড়: ২.৬৭
সর্বোচ্চ গোল: দাভোর সুকের (ক্রোয়েশিয়া- ৬ গোল)
সেরা খেলোয়াড়: জিনেদিন জিদান (ফ্রান্স)