২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ
Published : 19 Feb 2026, 08:23 PM
ফুটবল জাদুকর- লিওনেল মেসির কেবল বাঁ পায়ের মোহনীয় ফুটবল দেখেই এই শব্দজোড়া হরহামেশা ব্যবহার করে থাকে বোদ্ধারা। অনেকে আবার তাকে ডাকেন ‘দি অ্যাটোমিক ফ্লি’ নামে। এই ধরনীতে তার যে অর্জন, তা যেন মহাজাগতিক কিছু। ২০২২ সালে তার বিশ্বকাপ জয়ের পর, তারা বলেছিল, ফুটবল এবার পূর্ণতা পেল।
২০২৬ বিশ্বকাপে নিজ দেশের স্বপ্নের সারথীদের নিয়ে ফিফার আয়োজন ২৬ সুপারস্টার। এই পর্বে আছেন আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড লিওনেল মেসি।
এখনও অবশ্য একই গতিতে ছুটে চলেছেন মেসি। আর মাস চারেক পরই ৩৯তম জন্মদিনের কেক কাটবেন তিনি; কিন্তু এই বয়সেও যেন দুই পায়ে তার কোনো ক্লান্তি নেই। সাফল্যের ক্ষুধা আছে আগের মতোই। তাই যেন, অনেকের মনে প্রায়ই পুরনো প্রশ্নটা উঁকি দেয়, মেসি এই পৃথিবীর মানুষ নাকি ভিন গ্রহের কেউ?
মেসির প্রাপ্তির ভান্ডার পূর্ণ হয়েছে আগেই। কিন্তু তার যাত্রা তো এখনও শেষ হয়নি। চোখে নতুন স্বপ্ন নিয়ে ছুটছেন তিনি। তার বাঁ পায়ের সক্ষমতা নিয়ে এখনও বিন্দুমাত্র প্রশ্ন নেই, তার ফুটবল-জ্ঞান তো সেই ছোট্টবেলা থেকেই অনেককে ছাড়িয়ে, সঙ্গে অপরিসীম অভিজ্ঞতা যোগ হয়ে এখন যেন তিনি আরও ভয়ঙ্কর, ক্ষুরধার।
তাইতো, মাস চারেক পর অনুষ্ঠেয় ৪৮ দলের বিশ্বকাপে তাকে ঘিরেই আবারও স্বপ্নের ট্রফিতে চুমু আঁকার স্বপ্ন দেখছে আর্জেন্টাইনরা।
বিশ্বকাপের বছরে এসে ফুটবলের এই মহাতারকার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার, অর্জন, তাকে নিয়ে সাবেকদের নানা রংয়ের মন্তব্য এবং পরিশেষে ২০২৬ আসরে তার সম্ভাবনার চিত্রটা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্তা সংস্থা ফিফা।

অর্জন ও দক্ষতা
ক্যারিয়ারের সবচেয়ে দীর্ঘ ও সাফল্যমণ্ডিত সময় মেসি কাটিয়েছেন বার্সেলোনায়। সেখানে সিনিয়র দলের হয়ে ১৭ মৌসুম খেলে ক্লাবকে ৩৪টি শিরোপা জিতিয়েছেন তিনি। এরপর, পিএসজিতে যোগ দিয়ে ছোট অধ্যায়ে টানা দুবার লিগ আঁ জয়ের স্বাদ পান এবং সেখান থেকে ইন্টার মায়ামিতে নাম লিখিয়ে গত বছর পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ট্রফি, এমএলএস কাপ।
ক্লাব ফুটবলে সব মিলিয়ে ৪০টি শিরোপা জিতেছেন মেসি, ফুটবল বিশ্বেই যা রেকর্ড।
সাদা ও আকাশী রংয়ের স্ট্রাইপ জার্সিতেও মেসি এক বিজয়ীর নাম। দেশের হয়ে তিনি প্রথম ট্রফি উঁচিয়ে ধরেন ২০২৫ সালে, ফিফা অনুর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ জিতে। এর তিন বছর পর বেইজিং অলিম্পিকসে পরেছিলেন পুরুষ ফুটবলের সোনার পদক।
জাতীয় দলের হয়ে অবশ্য প্রথম সাফল্যের জন্য তাকে অপেক্ষা করতে হয় দীর্ঘ সময়। সেজন্য মাঝে সইতে হয় তীব্র সমালোচনাও। ক্ষোভে-দুঃখে একবার বিদায়ও বলে দিয়েছিলেন তিনি; কিন্তু নিয়তিতে যে অন্য কিছু লেখা ছিল। খুব দ্রুতই মাঠে ফিরে আসেন তিনি এবং শুরু হয় তার সাফল্যের পথে যাত্রা।

জাতীয় দলের হয়ে তার প্রথম শিরোপা ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা। পরের বছর তার কাঁধে চড়েই কাতার বিশ্বকাপ জয় করে আর্জেন্টিনা। দুই বছর পর টানা দ্বিতীয়বারের মতো মহাদেশ সেরার ট্রফি ঘরে তোলে আর্জেন্টিনা এবং এসবের মাঝে উঁচিয়ে ধরে ফিনালিস্সিমা ট্রফিও।
মাঠে বল পায়ে যে ক্ষীপ্রতায় মেসি এগিয়ে যান, প্রতিপক্ষকে যেভাবে বোকা বানান এবং ওয়ান-অন-ওয়ানে যেভাবে সামনের জনের দুই পায়ের মাঝ দিয়ে বল বের করেন, তা এককথায় অতুলনীয়। অনেকের মতে, ফুটবলের ইতিহাসে তার মতো ড্রিবলার কেউ কখনও আসেনি, আসবেও না। নিখুঁত পাস দেওয়ায় তার জুড়ি মেলা ভার।
আর গোল করা ও করানোয় তো শুরু থেকেই তিনি দারুণ কার্যকর। এ পর্যন্ত পেশাদার ফুটবলে তার চেয়ে বেশি গোলে সহায়তা করতে পারেননি আর কেউ। বার্সেলোনা ও ইন্টার মায়ামির হয়ে তার গোল গড় অনন্য, ম্যাচ-প্রতি প্রায় একের কাছাকাছি।
শ্রেষ্টত্বের স্বীকৃতিও পেয়েছেন অনেকবার। ফিফার রেকর্ড আটবারের বর্ষসেরা ফুটবলারের পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।
মেসিকে নিয়ে গ্রেটদের যে ভাবনা
“তারা একসময় বলত, আমাকে কেবল পিস্তল দিয়েই থামাতে পারবে। আজ মেসিকে থামানোর জন্য তোমার মেশিন গান দরকার।”
-খ্রিস্তো স্ত্রইচকফ
“মেসির সঙ্গে যেদিন আমার দেখা হয়েছিল, আমি কাছে গিয়ে তাকে ছুঁয়েছিলাম। নিশ্চিত হতে চেয়েছিলাম যে, আমাদের মতো সে মানুষ কিনা।”
-জানলুইজি বুফ্ফন
“যদিও তার সঙ্গে আমি অনেকবার খেলেছি, তারপরও সে যা কিছু করে, আমি ঠিক বুঝতে পারি না। সে মানুষ নয়, হতে পারে না। সে অন্য গ্রহের। লিও ইতিহাসের সেরা ফুটবলার। নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে আমি খুবই গর্বিত, তবে সেরা সময়টা (খুঁজতে চাইলে) আমাকে পেছন ফিরে তাকাতে হবে, মেসির সঙ্গে খেলার সময়ে।”
-আনহেল দি মারিয়া

“আমি যখন আমার ক্যারিয়ারের দিকে ফিরে তাকাই, তখন সবচেয়ে উপভোগ্য মনে হয় লিও মেসির শুরুর সময়টা। সে যখন অবসর নেবে, তখন কেবল বার্সেলোনা নয়, পুরো ফুটবলেরই ১০ নম্বর জার্সি তুলে রাখা উচিত।”
-রোনালদিনিয়ো
“যদিও সে হয়তো মানুষ নয়, তবুও এটা ভালো ব্যাপার যে সে এখনও তাই ভাবে।”
-হাভিয়ের মাসচেরানো
পরিসংখ্যানের আলোয় মেসি
** বিশ্বকাপে ১৮ বছর ৩৫৮ দিন বয়সে গোল করেন মেসি, প্রতিযোগিতাটির ইতিহাসে সপ্তম-সর্বকনিষ্ট গোলদাতা। ১৯৫৮ সালের আসরে ১৭ বছর ২৩৯ দিন বয়সে গোল করে এই তালিকার শীর্ষে আছেন পেলে।
** এবার দিয়ে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছেন মেসি ও ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো। এছাড়া আন্তোনিও কারবাহা, লোথার মাথাউস, রাফা মার্কেস, আন্দ্রেস গুয়ার্দাদোর আছে ছয় বিশ্বকাপ খেলার কীর্তি।
** একমাত্র ফুটবলার হিসেবে পাঁচ বিশ্বকাপে অন্তত একটি করে অ্যাসিস্ট করেছেন মেসি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ তিন আসরে গোলে অ্যাসিস্ট করার কীর্তি আছে পেলে, জেগোশ লাতো, দিয়েগো মারাদোনা ও ডেভিড বেকহ্যামের।
আর বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে সর্বোচ্চ ছয়টি করে অ্যাসিস্ট করার রেকর্ড যৌথভাবে মেসি ও পেলের।
** বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার রেকর্ডটি মেসির, ২৬টি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলেছেন লোথার মাউথেউস (২৫)।
** বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি দুই হাজার ৩১৪ মিনিট খেলেছেন মেসি। তিনি ভেঙেছেন ইতালিয়ান গ্রেট পাওলো মালদিনির রেকর্ড।

** বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ১৯ ম্যাচে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন মেসি। তালিকায় তার পেছনে আছেন মেক্সিকোর রাফা মার্কেস (১৭) ও মেসির পূর্বসূরি কিংবদন্তি দিয়েগো মারাদোনা (১৬)।
** বিশ্বকাপের ইতিহাসে একমাত্র ফুটবলার হিসেবে গ্রুপ পর্ব, শেষ ষোলো, কোয়ার্টার-ফাইনাল, সেমি-ফাইনাল ও ফাইনালে গোল করার রেকর্ড গড়েছেন মেসি। লুসাইল স্টেডিয়ামে গত আসরের ফাইনালে গোল করে এই কীর্তি গড়েন তিনি।
** গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ২১ গোলে অবদান রাখার রেকর্ডটি যৌথভাবে মেসি ও পেলের।
** বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে সবচেয়ে বেশি গোলের রেকর্ডও মেসির, ১৩টি। তার পেছনে আছেন গাব্রিয়েল বাতিস্তুতা (১০), দিয়েগো মারাদোন (৮), গিলের্মো স্তাবিলে (৮), মারিও কেম্পেস (৬) ও গন্সালো হিগুয়াইন (৫)।
** একমাত্র ফুটবলার হিসেবে টিনএজার, বয়স বিশের ঘরে ও ত্রিশের ঘরে থাকতে গোল করেছেন মেসি। পেলে চার মাসের জন্য কীর্তিটি গড়তে পারেননি।
** বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ১১ ম্যাচে সেরা খেলোয়াড় হয়েছেন মেসি।
** বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ৬৭টি গোলের সুযোগ তৈরির রেকর্ড যৌথভাবে মেসি ও মারাদোনার।
** বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ড্রিবল সম্পন্ন করেছেন মেসি। ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত ২০১৪ আসরে তার ৪৬টি সফল ড্রিবল এই প্রতিযোগিতার এক আসরে তৃতীয় সর্বোচ্চ।
মেক্সিকোয় ১৯৭০ আসরে ব্রাজিলিয়ান গ্রেট জাইরজিনিয়োর ৪৭টি ও মেক্সিকোয় ১৯৮৬ আসরে মারাদোনার ৫৩টি সফল ড্রিবল করে আছেন তালিকায় মেসির ওপরে।
** একমাত্র ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপে দুবার গোল্ডেন বল জয়ের কীর্তি মেসির।
মেসিকে ঘিরেই ২০২৬ বিশ্বকাপে স্বপ্ন বুনছে আর্জেন্টিনা
বিশ্বকাপের গত ৬২ বছরের ইতিহাসে কোনো দল টানা দুইবার শিরোপা জিততে পারেনি। সেই সম্ভাবনাই এবার দারুণভাবে উঁকি দিচ্ছে আর্জেন্টিনার সামনে।
ডাগআউটে লিওনেল স্কালোনি, পোস্টে এমিলিয়ানো মার্তিনেস, রক্ষণে ক্রিস্তিয়ান রোমেরো-লিসান্দ্রো মার্তিনেস, মাঝমাঠে আলেক্সিস মাক আলিস্তের-রদ্রিগো দে পল এবং আক্রমণে লাউতারো মার্তিনেস, হুলিয়ান আলভারেসরা তো আছ্নেই; তবে তাদের সবার মাঝে সবচেয়ে বড় যে নামটা দলটির আত্মবিশ্বাস বহুগুনে বাড়িয়ে দিচ্ছে, সেটা হলো মেসি।
নিশ্চিতভাবেই আটবারের ব্যালন দ’র জয়ীতে ঘিরেই আবার বিশ্বকাপ জয়ের আশায় আছে আর্জেন্টিনা।

দলের স্বপ্ন পূরণের কাণ্ডারি হয়ে উঠতে পারেন এন্সো ফের্নান্দেসও। কাতার বিশ্বকাপে সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতেছিলেন তিনি। সেই থেকে চেলসিতে নিজেকে আরও শাণিয়েছেন এই মিডফিল্ডার।
ওপরের সবার আছে গত বিশ্বকাপ জয়ের অভিজ্ঞতা। সেই হিসেবে এবারের আর্জেন্টিনা দলে একমাত্র শূন্যতা বলতে আনহেল দি মারিয়ার অনুপস্থিতি। বুটজোড়া তুলে রাখা এই অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারের শূন্যতা অবশ্য পুষিয়ে দেওয়ার সক্ষমতা আছে থিয়াগো আলমাদা, নিকো পাস ও ১৮ বছর বয়সী ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুয়োনোর।
বাছাইয়ে দলটির পারফরম্যান্সও ছিল দুর্দান্ত; ১৮ ম্যাচের ১২টি জিতে এবং দুটিতে ড্র করে সবার আগে মূল মঞ্চে জায়গা করে নেয় আলবিসেলেস্তেরা। দারুণ ওই পারফরম্যান্সের মোমেন্টাম টেনে নিতে পারলেই স্বপ্নের শিখরে উঠে যাবে আর্জেন্টিনা, জিততে পারবেন চতুর্থ বিশ্বকাপ ট্রফি।