১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

সাবালেঙ্কার হ্যাটট্রিক-স্বপ্ন গুঁড়িয়ে রিবাকিনার রাজত্ব

চোটের কারণে এই আসরে যার অংশগ্রহণ ছিল শঙ্কায়, সেই এলেনা রিবাকিনা দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষস্থান নিশ্চিত করার পর জিতে নিলেন ইউএস ওপেনের শিরোপাও।

স্পোর্টস ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 13 Sep 2026, 04:59 PM

Updated : 17 Sep 2026, 02:59 AM

অ্যাঙ্কলের চোটে টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করা নিয়েই ছিল অনিশ্চয়তা। সেই এলেনা রিবাকিনা শঙ্কা উড়িয়ে কোর্টে নেমে ছুটতে থাকলেন অপ্রতিরোধ্য গতিতে। প্রথমবার র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষস্থানে জায়গা করে নেওয়াও নিশ্চিত করলেন। তবে আসল কাজটি তখনও বাকি। সেখানেও কোনো খামতি রাখলেন না তিনি। ফাইনালে এরিনা সাবালেঙ্কাকে হারিয়ে শিরোপা স্বপ্নের ইউএস ওপেন অভিযানের পূর্ণতা দিলেন কাজাখস্তানের তারকা। 

ইউএস ওপেনের নারী এককের ফাইনালে ৬-৪, ৫-৭, ৬-২ গেমে জিতে চ্যাম্পিয়ন হলেন রিবাকিনা। গ্র্যান্ড স্ল্যামে তার তৃতীয় শিরোপা এটি, এই বছরে দ্বিতীয় আর ইউএস ওপেনে প্রথম। ফাইনালে হারলেও আসর শেষে র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে ওঠা নিশ্চিত ছিল ২৭ বছর বয়সী তারকার।

রিবাকিনার হাতে ট্রফি তুলে দেন পাঁচবারের গ্র্যান্ড স্ল্যামজয়ী ও এক সময়ের তুমুল জনপ্রিয় রুশ তারকা মারিয়া শারাপোভা। 

র‌্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর ও টুর্নামেন্টের ফেভারিট হিসেবে শুরু করা সাবালেঙ্কার শেষটা হলো হতাশায়। ইউএস ওপেনে টানা তিন আসরে শিরোপা জিতে ক্রিস এভার্ট ও সেরেনা উইলিয়ামসের কীর্তি স্পর্শ করার হাতছানি ছিল তার সামনে। কিন্তু শেষ হয়ে গেল এখানে তার ২০ ম্যাচের অপরাজেয় যাত্রা।

এই বছরের শুরুতে অস্ট্রেলিয়ান ওপেনেও সাবালেঙ্কাকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিলেন রিবাকিনা। এই শতাব্দীতে দুটি হার্ড কোর্ট গ্র্যান্ড স্ল্যামজয়ী তৃতীয় নারী খেলোয়াড় তিনি। সাবালেঙ্কা নিজেও এই কীর্তি গড়েছিলেন ২০২৪ সালে। ২০১৬ সালে এই ‘ডাবল’ জিতেছিলেন জার্মানির আঞ্জেলিক কেহবাহ।

শিরোপা জিতে ৫৫ লাখ মার্কিন ডলার প্রাইজমানি জিতেছেন রিবাকিনা। রানার আপ সাবালেঙ্কার প্রাপ্তি ২৮ লাখ ডলার। 

আর্থার অ্যাশ স্টেডিয়ামে র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ দুজনের শিরোপা নির্ধারণী লড়াইয়ে ধ্রুপদি ম্যাচের সম্ভাব্য উপাদান ছিল সবটুকুই। শেষ পর্যন্ত অবশ্য ততটা রোমাঞ্চ জমে ওঠেনি ম্যাচে। সাবালেঙ্কার খেলায় ছিল অনেক ওঠা-নামা, কখনও ছিলেন আক্রমণাত্মক ও ক্ষুরধার, কখনও বিবর্ণ। রিবাকিনার খেলায় ছিল ধারাবাহিকতা, ম্যাচজুড়ে ছিলেন অবিচল। 

হলুদ-কালো পোশাকে কোর্টে নামা রিবাকিনাকে মনে হচ্ছিল যেন লক্ষ্যে স্থির কোনো শান্ত মৌমাচ্ছি। ম্যাচজুড়েই তিনি ছিলেন ধীরস্থির। চাপের মধ্যে খেই হারাননি। তীক্ষ্ণ কয়েকটি গ্রাউন্ডস্ট্রোক বের হয় তার হাত থেকে। যদিও শুরুতে সাবালেঙ্কার শক্তিশালী সার্ভ তাকে নাড়িয়ে দেয়। তবে তার একটি ডাবল ফল্টের পর রিবাকিনা প্রথম পয়েন্ট অর্জন করে ক্রমে ৩-২ গেমে এগিয়ে যান। 

হতাশ সাবালেঙ্কা এক পর্যায়ে মূল শো-কোর্টের স্ট্যান্ডের দিকে উঁচুতে একটি বল মারার জন্য কোড ভায়োলেশনের শিকার হন।

প্রতিটি মিস করা শট এবং নষ্ট হওয়া সুযোগে সাবালেঙ্কার বিরক্তি ও হতাশা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছিল তার শরীরী ভাষায়। রিবাকিনা ছিলেন ঠিক উল্টো। চেহারায় ছিল প্রতিজ্ঞার ছাপ। নিয়ন্ত্রণ শক্ত করে প্রথম সেট জিতে নেন তিনি। 

রাশিয়ায় জন্ম নেওয়া ও বেড়ে ওঠা এই তারকা অবশ্য দ্বিতীয় সেটের মাঝামাঝি সময়ে কিছুটা হারিয়ে ফেলেন নিজেকে। এই সুযোগে ঘুরে দাঁড়ান সাবালেঙ্কা এবং সূক্ষ্ম এক ড্রপ শট ও দুর্দান্ত একটি ব্যাকহ্যান্ড ক্রসকোর্ট উইনারের মাধ্যমে খেলাটিকে নিয়ে যান তৃতীয় সেটে। 

ভাগ্য নির্ধারণী সেটে আরেকটি ব্যাকহ্যান্ড উইনার দিয়ে নিজের সার্ভ ধরে রাখার পর সাবালেঙ্কা গর্জন করে ওঠেন। তবে একটুও বিচলিত না হয়ে রিবাকিনা নিজের খেলা ধরে রাখেন এবং ক্রমে বিশাল ব্যবধানে এগিয়ে যান। সেই ধারা ধরে রেখেই নিশ্চিত করেন ঐতিহাসিক হয়। 

ম্যাচজুড়ে যেমন দেখা গেছে, চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরও রিবাকিনাকে দেখা গেল সেই একই রূপে। দুর্দান্ত সার্ভে ম্যাচ শেষ করার পর উচ্ছ্বাসের কোনো বাড়াবাড়ি দেখা গেল না তার। একদম সাদামাটা উদযাপন, যেন কিছুই হয়নি!

তবে তার ভেতরে যে আনন্দের জোয়ার বইছে, তা ফুটে উঠল ২৭ বছর বয়সী তারকার প্রতিক্রিয়ায়। নিজের প্রত্যাশাকেও ছাপিয়ে গেছেন তিনি। 

“সত্যি বলতে, ভাষা খুঁজে পাওয়া কঠিন... টুর্নামেন্টে আসার আগে এমন কিছুর আশা আমি করিনি। চোট নিয়ে কিছুটা ভুগছিলাম। কিন্তু কোনোভাবে সবকিছু আমার অনুকূলে চলে এসেছে। এরিনা... তোমার বিপক্ষে খেলাটা খুব কঠিন। তুমি আমাকে সামর্থ্যের শেষ বিন্দুতে ঠেলে দাও...।”

এমন সুন্দর একটি আবহের জন্য আমি চমৎকার দর্শকদের ধন্যবাদ জানাতে চাই। দিন দিন আরও বেশি করে নিউ ইয়র্কের প্রেমে পড়ে যাচ্ছি।”

এই বছরের দুই শিরোপার আগে রিবাকিনার একমাত্র গ্র্যান্ড স্ল্যাম সাফল্য ছিল ২০২০ উইম্বলডন। এবার শিরোপা ও র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষস্থানের জোড়া অর্জনে তিনি রোমাঞ্চিত।

“পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে যখন অনুভব করব যে ইউএস ওপেন জিতেছি এবং বিশ্বের এক নম্বর র‍্যাঙ্কিং অর্জন করেছি, অনুভূতিটা হবে অন্যরকম। 

শেষটা এমন হওয়া বড় স্বস্তির ব্যাপারও। দুই-তিন সপ্তাহ ধরে সমস্ত রুটিনমাফিক কাজ করে যেতে হয়। অনেক পরিশ্রম করতে হয়, সঙ্গে অনেক স্নায়ুচাপও থাকে।”

শিরোপা জিতেও রিবাকিনা যেখানে ছিলেন শান্ত, প্রায় নির্বিকারভাবে বেঞ্চে নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে নিচ্ছিলেন, ম্যাচ হেরে সাবালেঙ্কার ছিল উল্টো চিত্র। শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে র‌্যাকেট ছুড়ে ফেলেন তিনি। পরে কোর্টের পাশে নিজের আসনে গিয়ে গ্রাউন্ডে বারবার আছড়ে ভেঙে ফেলেন র‌্যাকেট। 

পরে অশ্রুসিক্ত চোখে অকপটে স্বীকারও করলেন, আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি।

“এই মুহূর্তে আমি বক্তৃতা দিতে একদমই চাই না। তার পরও সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। গ্র্যান্ড স্ল্যামের ফাইনালে হেরে গেলে এবং 'থ্রি-পিট' জয়ের চেষ্টা করার সময় নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা সত্যিই কঠিন, তাই আমি আবেগটাকে পাশ কাটাতে চেয়েছিলাম। আবেগটা যদি ভেতরে চেপে রাখতাম, তাহলে একটি কথাও বলতে পারতাম না।

আমি হতাশ, কিন্তু এলেনাকে অভিনন্দন জানাতে চাই। আমি যদি আরেকটু ভালো খেলতে পারতাম….যাহোক, মনে হচ্ছে পরের বছরই সুযোগ পাব।”

চারটি গ্র্যান্ড স্ল্যামজয়ী বেলারুশের এই তারকার বছর শেষ হলো কোনো বড় শিরোপা ছাড়াই।