২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ
Published : 15 Mar 2026, 08:35 AM
নামের পাশে বড় করে লেখা সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার; কিন্তু দলের প্রয়োজনে যেকোনো দিন যেকোনো সময় যে কোনো পজিশনে খেলতে প্রস্তুত ফেদেরিকো ভালভের্দে। দল অন্তঃপ্রাণ এই তারকা সবখানে দারুণ সফলও। লক্ষ্য এবার সবচেয়ে বড় মঞ্চ, বিশ্বকাপ। ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপের হতাশা ভুলে, দেশের ফুটবলের সুন্দর অতীত থেকে প্রেরণা নিয়ে দলকে সাফল্যের পানে এগিয়ে নেওয়ার সামর্থ্য আছে এই রেয়াল মাদ্রিদ তারকার।
২০২৬ বিশ্বকাপে নিজ দেশের স্বপ্নের সারথীদের নিয়ে ফিফার আয়োজন ২৬ সুপারস্টার। এই পর্বে আছেন উরুগুয়ের মিডফিল্ডার ফেদেরিকো ভালভের্দে।
উরুগুয়ের ফুটবলের ইতিহাস সমৃদ্ধ, ফুটবল বিশ্বকাপের প্রথম আসরের চ্যাম্পিয়ন তারা। আর ১৯৫০ আসরের শেষ ম্যাচে ফেভারিট ও স্বাগতিক ব্রাজিলকে কাঁদিয়ে ট্রফি উঁচিয়ে ধরে দেশটি।
দেশের মানুষকে বিশ্ব জয়ের স্বাদ দেওয়া দুই অনুপ্রেরণাদায়ক নেতা হোসে নাসাস্সি ও ওবদুলিও ভারেলার পাশে বসার খুব কঠিন একটা সম্ভাবনা জাগান দিয়েগো ফোরলান ২০১০ সালে, দক্ষিণ আফ্রিকা আসরে। আকাশছোঁয়া সেই স্বপ্ন পূরণ না হলেও, তার মাস্টারক্লাস পারফরম্যান্স সবার মন জয় করেছিল।

সেই কিংবদন্তিদের উত্তরসূরি ভালভের্দের সামর্থ্য আছে দেশের ফুটবলকে আবার সোনালী যুগে ফিরিয়ে নেওয়ার। তিনি রক্ষণে দারুণ ও কার্যকর আর আক্রমণে দুর্দান্ত। নিজের দিনে হতে পারেন ভয়ঙ্করও, যেটা দেখিয়েছেন চ্যাম্পিয়ন্স লিগে রেয়াল মাদ্রিদের সবশেষ ম্যাচে; তার প্রথমার্ধের হ্যাটট্রিকেই উড়ে যায় ম্যানচেস্টার সিটির মতো শক্তিশালী দল।
বিশ্বকাপ ঘিরে এখন প্রশ্ন শুধু একটাই- ভালভের্দে কি পারবেন উরুগুয়ের জার্সি গায়েও ‘রেয়াল মাদ্রিদের ভালভের্দে’ হয়ে উঠতে?
ফুটবল পায়ে ভালভের্দের অর্জন
স্বদেশের ক্লাব পেনারোলে শৈশবে বেড়ে ওঠার পর, ১৭ বছর বয়সে ক্লাবটির মূল দলে অভিষেক হয় ভালভের্দের। যদিও সেখানে অল্প কিছুদিন থাকতে পারেন তিনি। তার প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে আগেভাগেই উরুগুয়ের ক্লাবটির সঙ্গে চুক্তি সেরে ফেলে রেয়াল; সেই অনুযায়ী ১৮ বছর পূর্ণ হতেই মাদ্রিদে পাড়ি দেন ভালভের্দে।

এরপর এক বছর ধারে দেপোর্তিভো লা করুনায় খেলে নতুন দেশে নতুন ধাঁচের ফুটবলে মানিয়ে নেন ভালভের্দে এবং রেয়ালে ফিরে দ্রুতই কোচের আস্থা অর্জন করেন তিনি। আর গত কয়েক মৌসুমে তো দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের একজন ২৭ বছর বয়সী এই তারকা, দলের অধিনায়ক।
ইউরোপের সফলতম দলটির হয়ে ভালভের্দে এখন পর্যন্ত ৩৬০টির বেশি ম্যাচ খেলে গোল করেছেন ৩৮টি। এই জার্সি পরে জিতেছেন দুটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, তিনটি লা লিগাসহ আরও অনেক শিরোপা।
জাতীয় দলের হয়ে তার অর্জনের ঝুলি অবশ্য পুরোপুরি খালি। এখানে সর্বোচ্চ সাফল্য ২০২৪ কোপা আমেরিকায় তৃতীয় স্থান অর্জন।
কোচদের চোখে বহুমুখী ভালভের্দে
“সে এমন এক মেধাবী ফুটবলার যে, যেকোনো পজিশনেই আলো ছড়াতে পারে। সে অসাধারণ একজন অধিনায়ক, গত কয়েক মৌসুমে যার প্রমাণ মিলেছে। তাকে আমরা নানাভাবে কাজে লাগাতে পারি। ফেদে সবদিক থেকে একজন সত্যিকারের রেয়াল মাদ্রিদ এবং এই ক্লাবের অসাধারণ একজন দূতও।”
- আলভারো আরবেলোয়া
“একজন উঁচু মানের মিডফিল্ডারের মধ্যে যা খুঁজবেন, তার সবই আছে ভালভের্দের মাঝে; কৌশলগত বুদ্ধি, শারীরিক ও টেকনিক্যাল সামর্থ্য। সে এক সেনসেশনাল খেলোয়াড়।”
- কার্লো আনচেলত্তি
“এমন প্রাণশক্তির ফুটবলার আমি খুব কম দেখেছি। সে যে কোনো জায়গায় খেলতে পারে।”
- শাবি আলোন্সো
“কোনো এক ম্যাচেই, রাইট-ব্যাক, রাইট উইং, সেন্ট্রাল মিডফিল্ডের দুই পাশেই অথবা মাঝে আবির্ভূত হতে পারে ভালভের্দে। কোনো নির্দিষ্ট একটা পজিশনে খেলা শুরু করলেও, ম্যাচের পরিস্থিতি বিবেচনায় শুরুর পরিকল্পনা ও ফরমেশন কাগজ-কলমে রেখে নিজের ধরণ ও পজিশন বদলে ফেলার সামর্থ্য তার আছে। তাইতো তার মতো নাম্বার এইট খুব প্রয়োজন, কারণ সে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হিসেবে খেলার পাশাপাশি রক্ষণেও ভূমিকা রাখতে পারে, আবার নাম্বার টেনের পাশে গিয়ে আক্রমণও শাণাতে পারে। সে ডানে, বাঁয়ে, মাঝে এবং দুই উইংয়েও খেলতে পারে।”
- মার্সেলো বিয়েলসা
পরিসংখ্যানে ভালভের্দে

• গোল করার দারুণ সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও রেয়াল মাদ্রিদে শুরুর কয়েক মৌসুমে খুব কমই জালের দেখা পেয়েছেন ভালভের্দে। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে দলটির ওই সময়ের কোচ কার্লো আনচেলত্তি মজা করে বলেন, “অবাক করা বিষয় হলো, গতবার সে (ভালভের্দে) কেবল একটি গোল করেছে। আমি যদি তাকে ১০ গোল করাতে না পারি, তাহলে আমি আমার কোচিং ব্যাজ ছিড়ে ফেলব।”
আনচেলত্তির কপাল ভালোই বলতে হবে, ২০২২-২৩ মৌসুমে ১২টি গোল করেন ভালভের্দে। এখন পর্যন্ত সেটাই তার মৌসুমে সর্বোচ্চ গোল।
• ২০২৪-২৫ মৌসুমে ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোর খেলোয়াড় হিসেবে ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে সবচেয়ে বেশি মিনিট খেলার কীর্তি গড়েন ভালভের্দে, যা তার ‘মিস্টার রিলায়েবল’ তকমাকে আরও যৌক্তিক করে তোলে।
গত মৌসুম শেষে রেয়াল মাদ্রিদের দায়িত্ব নেওয়া কোচ আলোন্সো শুরুর দিকেই ভালভের্দের প্রশংসায় বলেন, “তার মতো প্রাণশক্তির খেলোয়াড় আমি খুব কম দেখেছি। সে আমাকে স্টিভেন জেরার্ডের কথা মনে করিয়ে দেয়। সে মাঠের সব জায়গায় খেলতে পারে এবং তার সঙ্গে কাজ করতে পেরে আমি রোমাঞ্চিত। ভালভের্দের মতো একজন খেলোয়াড়কে দলে পাওয়া প্রত্যেক কোচের স্বপ্ন।”
• ‘এল আলকন’ নামে পরিচিত ভালভের্দে উরুগুয়ের ফুটবলারদের মধ্যে রেয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছেন; ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে রেকর্ডটি গড়েন তিনি।
২০২৬ বিশ্বকাপ ঘিরে ভালভের্দে ও উরুগুয়ের প্রত্যাশা
২০২২ আসরে ক্যারিয়ারে প্রথম বিশ্বকাপ খেলার স্বাদ পেয়েছেন ভালভের্দে, যদিও সেই অভিজ্ঞতা একদমই সুখকর ছিল না তার জন্য। গ্রুপ পর্বে দলের তিন ম্যাচেই শুরুর একাদশে খেলেন ভালভের্দে। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে গোলশূন্য ড্রয়ের পর, পর্তুগালের বিপক্ষে হারে তারা। পরে ঘানাকে ২-০ গোলে হারিয়ে পরের ধাপে ওঠার আশাও জাগায়।
দক্ষিণ কোরিয়ার সমান ৪ পয়েন্ট পায় উরুগুয়ে, দুই দলের গোল ব্যবধানও দাঁড়ায় সমান। নিয়ম অনুযায়ী এশিয়ার দলটির চেয়ে কম গোল করায় ছিটকে পড়ে ভালভের্দের দল।

গতবারের ওই হতাশায় প্রলেপ দিতে এবং নতুন প্রাপ্তির স্বপ্নে উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপে পা রাখবে উরুগুয়ে। এটা ঠিক যে, আসছে আসরে ফেভারিটদের তালিকায় থাকবে না দলটি, তাদের ঘোর সমর্থকও হয়তো ট্রফি উঁচিয়ে ধরার আশায় নেই; তবে বাছাইপর্বে চমক দেখানো দলটির অবিশ্বাস্য কিছু ঘটানোর সামর্থ্য অবশ্যই আছে।
বাছাইয়ের প্রথম ধাপে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে হারানোর পর, আর্জেন্টিনাকে তাদেরই মাঠে হারিয়ে দেয় উরুগুয়ে। পরে অবশ্য শুরুর ছন্দ ধরে রাখতে পারেনি দলটি, শেষ পর্যন্ত বাছাইয়ে চতুর্থ হয়ে ওঠে মূল পর্বে।
ভালভের্দে ও তার সতীর্থরা বাছাইয়ের শেষ ভাগের ব্যর্থতা মুছে আগের ছন্দে আবার নিজেদের মেলে ধরতে পারলে এবং দেশের সাফল্যে ভরা ইতিহাস থেকে প্রেরণা নিতে পারলে এবারের বিশ্বকাপে হয়তো নতুন এক উরুগুয়ের দেখা মিলবে।
আগামী ১৫ জুন সৌদি আরবের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপে যাত্রা শুরু করবে উরুগুয়ে। ‘এইচ’ গ্রুপে তাদের অন্য দুই প্রতিপক্ষ স্পেন ও কেপ ভার্দ।