বাংলাদেশ ফুটবল
শীর্ষ পর্যায়ে তিন ক্লাব প্রিমিয়ার লিগে দলবদলের কার্যক্রম থেকে দূরে থাকায় অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তারা। অনেক কিছু মেনে নিয়ে খেলার দাবি জানিয়েছে তারা।
Published : 17 Aug 2024, 06:09 PM
শেখ জামাল ধানমণ্ডি ক্লাব, শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্র ও চট্টগ্রাম আবাহনী- শীর্ষ পর্যায়ে এই তিন ক্লাব দলবদলের কার্যক্রমে যোগ না দেওয়ায় অনিশ্চয়তায় পড়েছেন শতাধিক ফুটবলার। খেলোয়াড়দের অনেকে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনে (বাফুফে) গিয়েছিলেন সংকট থেকে তাদেরকে ‘বাঁচানোর’ আর্জি নিয়ে। বাফুফে দিতে পারেনি তেমন কোনো নিশ্চয়তা, তবে দেশের ফুটবলের নিয়ন্তা সংস্থাটি জানিয়েছে, চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।
প্রবল গণ আন্দোলনের মুখে গত ৫ অগাস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে চলছে দেশ। ক্রীড়াঙ্গনেও পরিবর্তনের দাবি জোরাল হচ্ছে। ক্রীড়া উপদেষ্টার দায়িত্ব পেয়েছেন আসিফ মাহমুদ। চলমান সংকট নিরসনে বাফুফে এখন তাকিয়ে আছে ক্রীড়া উপদেষ্টার দিকেও।
তিন ক্লাব নিয়ে অনিশ্চয়তা
সংকটের শুরু লিগের নিয়মিত দল শেখ জামাল, শেখ রাসেল ও চট্টগ্রাম আবাহনীর দলবদলের কার্যক্রম থেকে দূরে থাকার পর থেকে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আবাহনী লিমিটেড ও শেখ জামাল ধানমণ্ডি ক্লাব ব্যাপক ভাংচুরের শিকার হয়েছিল। শেখ রাসেল ও চট্টগ্রাম আবাহনীর ক্ষেত্রে তেমন কিছু শোনা যায়নি। তবে ক্লাবের একাধিক সুত্র বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে নিশ্চিত করেছে, শেখ জামাল ও শেখ রাসেলের পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান দল দুটি পরিচালনায় আগ্রহী নন। চট্টগ্রাম আবাহনীর কর্তৃপক্ষও সবকিছু রেখেছে ধোঁয়াশার মধ্যে।
শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবের সদস্য এবং সাবেক ফুটবল ম্যানেজার আনোয়ারুল করিম হেলাল যেমন বললেন, “ক্লাবের বর্তমান যে পরিস্থিতি, হাল ধরবে কে? ভাংচুরের ফলে ক্লাবের অনেক কিছুই এখন আর নেই। দল গোছাতেও কিন্তু সময় লাগে, এখন যে পরিস্থিতিতে, সেখানে ক্লাবের পক্ষেই গুছিয়ে ওঠা কঠিন, দল গড়া আরও কঠিন। ফুটবলারদের জন্য খারাপ লাগছে, কিন্তু এর বাইরে আর কি বলতে পারি? তবে এ মুহূর্তে দলবদলের সময় বাড়াতে পারলে একটু গুছিয়ে নেওয়ার সময় পেত ক্লাবগুলো। কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার সময়ও পেত।”
চট্টগ্রাম আবাহনীর টিম ম্যানেজার আরমান আজিজ জানালেন, কর্তৃপক্ষকে বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন, কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সবুজ সংকেত তিনি পাননি।
“কদিন আগে ক্লাব কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি, বাফুফের পক্ষ থেকেও মহাসচিবের সাথে (শামসুল হক চৌধুরী) কথা বলেছে, এখনও তিনি আমাকে কিছু বলেননি। দলবদল কার্যক্রম ক্লাব করবে কিনা, তা নিয়ে আমি এখন পর্যন্ত অনিশ্চিত। বলতে পারেন ধোঁয়াশার মধ্যে আছি। তবে সাবেক ফুটবলার হিসেবে বলতে পারি, এই তিনটি দল যদি কার্যক্রম না চালায়, দেড় শতাধিক ফুটবলার বিপদে পড়ে যাবে। কেননা, দলবদলের সময়ও বেশি নেই। আজ আমি আবারও কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলব, যদি আপডেট পাই, জানাব।”
পারিশ্রমিক কমিয়ে খেলতে রাজি ফুটবলাররা
বিপদ যে কতটা ঘণীভূত হয়েছে, তা ফুটবলারদের কথাতেও স্পষ্ট। সবশেষ আবাহনীতে খেলা এক ফরোয়ার্ড গ্রামের বাড়ি বগুড়া থেকে জানালেন, মৌখিকভাবে কথা পাকাপাকি হলেও একটি ক্লাব এখন আর সাড়া দিচ্ছে না। দল না পেয়ে তার সতীর্থ এবং জুনিয়রদের অনেকে অনেক ক্লাবে অনুরোধ করেও পাচ্ছে না সাড়া।
প্রতিকূল পরিস্থিতিতে শনিবার বাফুফে ভবনের সামনে রেজাউল করিম রেজা, আশরাফুল রানা, রহমত মিয়া, মন্নাফ রাব্বি, শহিদুল আলম সোহেল, তৌহিদুল আলম সবুজসহ আরও অনেকে ‘প্রফেশনাল ফুটবল খেলোয়াড়বৃন্দ’ ব্যানারে মানববন্ধন করেছেন খেলার দাবি জানিয়ে। সব ক্লাবের অংশগ্রহণের জোরাল দাবি জানিয়েছেন তারা।
খেলোয়াড়দের পক্ষ থেকে কথা বলেন ডিফেন্ডার রেজাউল। বর্তমান পরিস্থিতিতে পারিশ্রমিকে ছাড় দিয়ে হলেও খেলতে রাজি থাকার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
“আমরা এখানে একত্রিত হয়েছি ফুটবল ফেডারেশনে আমাদের কিছু দাবি জানাতে। হঠাৎ করেই কিছু ক্লাব এবারের মৌসুমে দল করবে না বলে জানিয়েছে। এতে অনেক ফুটবলারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিয়তার মধ্যে পড়ে গেছে। প্রায় ১০০ জনের উপর রানিং ফুটবলার কোনও দল পাচ্ছে না। আমরা চাই, ফুটবল ফেডারেশন এই বিষয়ে চেষ্টা করুক। দলগুলোর সঙ্গে কথা বলে তাদের খেলানোর বিষয়ে রাজি করাক। এছাড়া আমরা বর্তমান সরকারের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টার সঙ্গে বসতে চাই ।”
“এখন হাতে সময় নেই। হঠাৎ করে এতগুলো খেলায়াড় কোথায় যাবে? আমরা প্রয়োজনে স্যাক্রিফাইস করে খেলতে রাজি আছি। আরও খোলামেলা করে বলতে গেলে পারিশ্রমিক কম নিয়ে খেলতে রাজি আছি। তবুও খেলা হোক। মাঠে ফুটবল থাকুক। বাফুফে যেন ক্লাবগুলোকে মাঠে আনতে চেষ্টা করে। যে স্পন্সর প্রতিষ্ঠানগুলো সরে যাচ্ছে, তাদের সঙ্গে বাফুফে আলাপ করুক। তারা যেন না গিয়ে দেশের ফুটবলের স্বার্থে ফিরে আসে। তাদের ফিরিয়ে এনে কম খরচে এবারের লিগ আয়োজন করা হোক।”
দিশেহারা বাফুফে, চালিয়ে যাচ্ছে আলোচনা
সাধারণত ক্লাবগুলোর সাথে খেলোয়াড়দের দলবদলের প্রক্রিয়া ‘মৌখিকভাবে’ পাকাপাকি হয়ে থাকে আগেই। উইন্ডো চালু হলে চুক্তির আনুষ্ঠানিকতা সারা হয়। তিন ক্লাবের সাথেও খেলোয়াড়দের অনেকের কথা হয়েছিল সেভাবেই, কিন্তু তারা এখন সাড়া না দেওয়ায় বিপদে পড়েছে খেলোয়াড়রা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিপাকে পড়েছে বাফুফেও।
বৈশ্বিক ফুটবলের নিয়ন্তা সংস্থা ফিফার দারস্থ হয়েছিল বাফুফে। যাতে করে ১৯ অগাস্টের দলবদলের নির্ধারিত সময়ের সাথে আরও কিছু সময় যোগ করে দেওয়া হয়। কিন্তু তেমন সাড়া মেলেনি বলে জানিয়েছেন বাফুফের সাধারণ সম্পাদক ইমরান হোসেন তুষার।
“ফুটবলার এবং ক্লাবগুলোর কথা বিবেচনা করে ইতিমধ্যেই আমরা ফিফার কাছে লিখেছিলাম, শুরুর দিকে বিভিন্ন অপসন দিয়ে, অপসনগুলো ছিল প্রথমত, দলবদল বিরতি দিয়ে ফের শুরু করতে যাচ্ছি, আরেকটা বিকল্পের কথা বলেছিলাম, পরের সেকেন্ড উইন্ডোতে চার সপ্তাহ আছে, দুই উইন্ডো মিলিয়ে ১৬ সপ্তাহ। প্রথম উইন্ডোতে ১২ সপ্তাহ, দ্বিতীয় উইন্ডোতে ৪ সপ্তাহ, সেক্ষেত্রে যদি একটু পরিবর্তন করা যায়, ৮ সপ্তাহ করে দুই উইন্ডোতে, কিংবা প্রথম উইন্ডো থেকে দুই সপ্তাহ নিয়ে এখানে যোগ করা যায় কিনা, সে ব্যাপারে অনুরোধ করেছিলাম, অথবা আপনারা (ফিফা) আমাদের একটা পরামর্শ দেন।”
“তারা বলেছে, ফিফার উইন্ডো যেহেতু আন্তর্জাতিকভাবে সংযুক্ত, তো আমাদের জন্য তারা বিশেষ কিছু করতে পারবে না। তারা আমাদেরকে না-সূচক ইমেইল দেয়। যার প্রেক্ষিতে… আমরা সব ক্লাবকেও জানিয়ে দিয়েছিলাম, এটা সম্ভব নয়। পরের দিনই আমরা ফিফাকে চিঠি দেই যে, আমরা এই উইন্ডো টোটাল ১২ সপ্তাহের করতে যাচ্ছি। ১১ সপ্তাহ তিন দিন হয়েছে, আমরা ১২ সপ্তাহেই করতে যাচ্ছি, কিন্তু আরও চার দিন অতিরিক্ত দেওয়া হোক...এর প্রেক্ষিতে ওরা তিন দিন বাড়িয়ে ২২ অগাস্ট পর্যন্ত বাড়িয়ে দলবদলের সুযোগ দিয়েছে।”
বাফুফে তাকিয়ে আছে ক্রীড়া উপদেষ্টার দিকেও। তুষার বললেন, সব উপায়েই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।
“আমরা চাই সবগুলো ক্লাব খেলুক। আমরা প্রফেশনাল লিগ কমিটির সাথে কথা বলে অতি দ্রুত বসব, এরপর জানাব। ক্লাবগুলোর আরেকটি দাবি ছিল, যে স্পন্সররা ছিল, তারা যেন পৃষ্ঠপোষকতা করে, আমরা তাদের সাথেও কথা। ক্রীড়া উপদেষ্টা মহোদয়ের সাথেও আমরা ইতিমধ্যেই যোগাযোগ করেছি, আমরা চাচ্ছি, তিনি যেন আমাদের কালকের মধ্যেই সময় দেন, যাতে আমরা ক্লাব ও খেলোয়াড়দের প্রতিনিধি নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলতে পারি।”