ভালোবাসার দিনে ‘প্রেম-বিয়ের’ ৩৬ মামলার শুনানি, উপহার লাভ ক্যান্ডি

“মামলাগুলো একই দিনে শুনানির উদ্যোগ নিয়ে বিচারক ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।”

নওগাঁ প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 14 Feb 2024, 12:45 PM
Updated : 14 Feb 2024, 12:45 PM

তিন বছর প্রেমের পর ২০২২ সালের ২২ জুলাই নওগাঁর সাপাহার উপজেলার শ্রাবণী রায় এবং রবি সরেন একে অপরের হাত ধরে বাড়ি ছাড়েন। তখন শ্রাবণী ছিলেন কিশোরী; মাত্র ১৭। একে তো ভিন্ন ধর্মের; তারওপর আবার শ্রাবণীর বিয়ে ঠিক করেছিল পরিবার। তাই পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তারা।  

ছয় দিন পর শ্রাবণী আর রবি সরেন (দুজনের ছদ্মনাম) গোপনে সাপাহার বাজারে আসেন নতুন শাঁখা-সিঁদুর কিনতে। তখন পুলিশ তাদের আটক করে।

পরে শ্রাবণীর বাবার দায়ের করা ধর্ষণ ও অপহরণ মামলায় রবি সরেনের ঠাঁই হয় কারাগারে। আর আদালত শ্রাবণীকে পরিবারের হেফাজতে দেয়।

সরকারি নিয়ম অনুযায়ী বয়স হওয়ার আগেই বিয়ে করে মামলার আসামি হওয়া এমন ৩৬টি মামলার শুনানি করেছে নওগাঁর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। বুধবার শুনানির সময় আসামিদের পাশাপাশি তাদের পরিবারের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।

বিচারক মেহেদী হাসান তালুকদার ফাল্গুনের প্রথম দিন ভালবাসা দিবসে এসব মামলা শুনানির জন্য রেখেছিলেন। কারাগার থেকে আসামিদের আদালতে নিয়ে আসার পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) মকবুল হোসেন লাভ ক্যান্ডি দিয়ে সবাইকে শুভেচ্ছা জানান।

আইনজীবী বলেন, “আজ একটু ভিন্ন মাত্রায় আদালত বসেছে। বেলা ১১টায় বিচারক এজলাসে বসেন। তিনি বিচারকাজের শুরুতেই আসামি ও যুগলদের প্রতি কিছু উপদেশ দেন।

“বিচারক অসময়ে প্রেমের সম্পর্কে না জড়িয়ে পড়াশোনা অব্যাহত রাখা, সামাজিক-পারিবারিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে শ্রদ্ধা করা, বাবা-মাকে কষ্ট না দিয়ে তাদের কথা মেনে চলা, আত্মনির্ভরশীল হওয়া এবং সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশ ও জাতির কল্যাণে নিজেদের নিয়োজিত রাখতে উদ্বুদ্ধ করেন।”

এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন নওগাঁ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি রফিকুল ইসলাম বাচ্চু। তিনি বলেন, “মামলাগুলো ভিন্ন ভিন্ন দিনে শুনানি করলে বিচারক সবাইকে একই উপদেশ দিতে পারতেন না। মামলাগুলো একই দিনে শুনানির উদ্যোগ নিয়ে বিচারক ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।”

এদিন যে ৩৬টি মামলার শুনানি হয়, তার সবকটিই অপ্রাপ্ত বয়স্কদের বিয়ে সংক্রান্ত মামলা। এসব মামলায় আত্মহত্যার চেষ্টা, প্রতারণা, ধর্ষণ ও অপহরণের অভিযোগই বেশি।

এজাহার থেকে দেখা যায়, স্কুলপড়ুয়া কিশোরী-কিশোরীরা যেমন নিজেদের পছন্দে বিয়ে করছে, ঠিক তেমনি কর্মজীবী কিশোরীরাও একই পথে পা বাড়িয়েছে।

আইনজীবী মকবুল হোসেন এসব তথ্য তুলে ধরে এমন আরেকটি মামলার কথা বলেন।

নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলার মেহজাবিন (ছদ্মনাম) ঢাকায় একটি তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। বেশ কিছুদিন কাজ করার পর পরিবার জয়পুরহাট জেলার জোভানের (ছদ্মনাম) সঙ্গে মেহজাবিনের বিয়ে ঠিক করে। তখন মেহজাবিনের বয়স ১৭। 

এক দুপুরে পারিবারিকভাবে বাড়িতে দুই পক্ষের উপস্থিতিতে ধর্মীয় রীতি মেনে তাদের বিয়ে হয়। বাড়িতে যখন মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি পাঠানোর আয়োজন হচ্ছে তখন খাবার নিয়ে দুই পক্ষের লোকজনের মধ্যে তুমুল বিবাদ শুরু হয়। শেষে মারামারি শুরু হলে পাত্রপক্ষ মেয়েকে রেখেই চলে যায়; বিয়েটা ভেঙে যায়।  

কিন্তু কিশোরী মেয়েটি পরিবারের এই সিদ্ধান্ত মানতে পারেনি। সে এক সপ্তাহ পর বাড়ি থেকে পালিয়ে জোভানের কাছে চলে যায়। জোভানের পরিবার মেহজাবিনকে মেনে নেয়। তারা একসঙ্গে বসবাস করা শুরু করেন।

কিন্তু মেহজাবিনের বাবা জোভান ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে মেয়েকে অপহরণের মামলা করে দেয়। ১১ দিন সংসার করার পর জোভানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠায় আর মেয়েকে দেওয়া হয় বাবার হেফাজতে।