‘অপ্রচলিত গান সামনে এলে শাহ আবদুল করিম আরও উদ্ভাসিত হবেন’

সুনামগঞ্জের উজানধল গ্রামে দুদিনব্যাপী বাউল শাহ আবদুল করিম লোক উৎসব শুরু হয়েছে।

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 15 Feb 2024, 02:36 PM
Updated : 15 Feb 2024, 02:36 PM

সুনামগঞ্জে শুরু হয়েছে দুই দিনের ‘শাহ আবদুল করিম লোক উৎসব ২০২৪’। 

প্রয়াত এ বাউলের ১০৭তম জন্মদিন উপলক্ষে জন্মভূমি দিরাইয়ের তাড়ল ইউনিয়নের উজানধল গ্রামে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এই উৎসবের উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক। শাহ আবদুল করিম পরিষদ এ উৎসবের আয়োজক। 

‘আমি বাংলা মায়ের ছেলে জীবন আমার ধন্য যে হায় জন্ম বাংলা মায়ের কোলে’, ‘গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান মিলিয়া বাংলা গান আর মুর্শিদী গাইতাম আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’সহ অসংখ্য কালজয়ী গানের রচয়িতা এ বাউল।

বাউল সম্রাট শাহ্ আব্দুল করিমের একমাত্র সন্তান ও শাহ আবদুল করিম পরিষদের সভাপতি শাহ নূর জালাল বলেন, “গ্রামবাসী বাবার জীবদ্দশা থেকে উৎসবের আয়োজন করছেন। তার মৃত্যুর পর এলাকাবাসীর সঙ্গে শাহ আবদুল করিম পরিষদও উৎসবের আয়োজন করছে।

“দেশের বিভিন্ন স্থানের প্রতিষ্ঠিত বাউলরা এই উৎসবে মিলিত হন; অংশ নেন জনপ্রিয় শিল্পীরাও। তবে বাবার ভক্ত, শিষ্য বাউলরাই বেশি থাকেন। কারো কাছে তিনি গুরু ভাই, কারো কাছে মুরশিদ, পীর। সবাই উৎসবে এসে গানে ও সুরে বাবাকে স্মরণ করেন।”

শাহ আবদুল করিম সারাজীবন অভাব-অনটনে থেকেও সততা জলাঞ্জলি দেননি। মেরুদণ্ড সোজা করে অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন। অসাম্প্রদায়িকতার চর্চা করেছেন। তার শিষ্যরাও উৎসবে এসে তার যাপিত জীবনের চর্চার প্রকাশ গানে গানে করেন বলে তার ছেলে জানান। 

বাউল শাহ আবদুল করিমের গানের পাণ্ডুলিপিকার ও তার ভাগনে বাউল শাহ আবদুল তোয়াহেদ বলেন, “মামার ধনসম্পদে কোনো মোহ ছিল না। খ্যাতি, পুরস্কারও তার পছন্দ ছিল না। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের অধিকার আদায়ে, ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে ও বাঙালি সংস্কৃতি বিরোধীদের বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার ছিলেন গানে গানে।

“তিনি অসম্ভব দেশপ্রমিক ছিলেন। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে দেশের সাহসী প্রতিনিধি ছিলেন তিনি। শাহ আবদুল করিমের সৃষ্টির বেশির ভাগই সর্বহারা ও শোষিতের পক্ষে; শোষকদের বিরুদ্ধে। এ কারণে তিনি জীবদ্দশায়ও সাধারণ মানুষের মত ছিলেন। তাই এই মানুষটিকে স্মরণ করতেই এই উৎসব।” 

লোক উৎসবে ভারতের নদীয়া থেকে আসা বাউল বিপদ রঞ্জন মালাকার বলেন, “শাহ আবদুল করিমের বাণী-সুর সীমানা ছাড়িয়েছে। তার চরণধূলি নিতে এসেছি। তিনি মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে গেছেন। ব্যক্তি জীবনে তিনি কত মহৎ, সৎ, দ্রোহী ও সর্বহারা মানুষের ছিলেন উৎসবে এসে আরও বিশদ বুঝতে পারছি।” 

লোক উৎসবে সিলেট শহর থেকে আসা কবি মেকদাদ মেঘ বলেন, “এই উৎসবে আসলে শাহ আবদুল করিমের শিষ্যদের পাই। তারা করিমের অপ্রচলিত গান আমাদের সামনে নিয়ে আসেন; যা অন্যান্য উৎসবে দেখা যায় না। করিমের বিভিন্ন তথ্যের অপ্রচলিত গানগুলো সামনে এলে তিনি আরও উদ্ভাসিত হবেন।”

বাউল শাহ আবদুল করিম একুশে পদকপ্রাপ্ত বাউল ছিলেন। ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি দিরাই উপজেলার উজানধল গ্রামে জন্ম নেন। তিনি ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।

২০০৬ সাল থেকে শাহ আবদুল করিমের জীবিত অবস্থায় এলাকাবাসী ও বাউল অনুরাগীরা এই উৎসব শুরু করেন।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টায় শুরু হওয়া এ উৎসব চলবে শুক্রবার পর্যন্ত। দুদিনের এ উৎসবে হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয় কালজয়ী এ বাউলের জন্মস্থান। মোবাইলে অর্থ লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠান বিকাশ এবার উৎসবে পৃষ্টপোষকতা দিয়েছে।