১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

টাঙ্গাইলে হাতুড়ি-বাটাল নিয়ে ব্যস্ত নৌকা তৈরির কারিগররা

নৌকার দাম নির্ধারণ করা হয় আকার ও ব্যবহৃত কাঠের ওপর নির্ভর করে। সাধারণত ছোট নৌকা বিক্রি হয় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকায়।

টাঙ্গাইলে হাতুড়ি-বাটাল নিয়ে ব্যস্ত নৌকা তৈরির কারিগররা

টাঙ্গাইলে নৌকার জন্য করাত দিয়ে প্রয়োজনীয় মাপে কাঠ চিরানোতে ব্যস্ত দুই কাঠমিস্ত্রী।

টাঙ্গাইল প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 07 Jul 2023, 10:20 AM

Updated : 07 Jul 2023, 10:20 AM

আষাঢ়ের বৃষ্টিতে পানি বেড়েছে টাঙ্গাইলের নদীগুলোতে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ধুম পড়েছে নৌকা তৈরির। তাই দিনরাত হাতুড়ি-বাটালের ঠুকঠুকানিতে মুখর হয়ে উঠেছে টাঙ্গাইলে নৌকা কেনাবেচার ৩২টি হাট-বাজার।

সাধারণত নৌকার তৈরির কাজগুলো হাটের কাছাকাছি স্থানে কিংবা বাড়ির আঙিনা বা পাড়ার খালি জায়গায় করে থাকেন ‘সুতার’ নামে পরিচিত কাঠমিস্ত্রিরা। নৌকা কেনাবেঁচার ভরা মৌসুমে তাদের দম ফেলার ফুরসত নেই। 

দিনরাত কাঠ চিরানো, তক্তা ও গুড়া বানানো, রান্দা দিয়ে কাঠ মসৃণ করা, তারকাঁটা (ছোট লোহা) ও পাতাম (লোহার পাত) দিয়ে তক্তা জোড়া লাগানো ইত্যাদি কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা।

Image

হাতুড়ি আর বাটামের আঘাতে নৌকার কাঠ প্রস্তুত করছেন এক সুতার।

টাঙ্গাইলের ১২ উপজেলার মধ্যে মধুপুর ছাড়া ১১ উপজেলায় বর্ষা মৌসুমে যাতায়াতে নৌকার প্রয়োজন হয়। এসব উপজেলার ৩২টি হাটে এখন নৌকা বিক্রি হচ্ছে। 

হাটগুলো হচ্ছে- টাঙ্গাইল সদর উপজেলার চরপৌলি, মাহমুদ নগর, ছিলিমপুর ও ওমরপুর, নাগরপুরের গয়হাটা ও চরসলিমাবাদ, মির্জাপুরের বরাটি, ছাওয়ালি মহেড়া ও চাকলেশ্বও, কালিহাতীর রামপুর, আউলিয়াবাদ ও কস্তুরিপাড়া, বাসাইলের মিরিকপুর, কাউলজানী, রাশড়া করিম বাজার ও ফুলকী, ঘাটাইলে কদমতলী ও হামিদপুর।

এছাড়া ধনবাড়ীর পাইস্কা ও কেরামজানী, গোপালপুরের মোহনপুর, নলীন বাজার, নবগ্রাম ও চাতুটিয়া, ভূঞাপুরের ফলদা, গোবিন্দাসী, কুঠিবয়ড়া ও অর্জুণা, সখীপুরের দাড়িয়াপুর ও বহেড়াতৈল এবং দেলদুয়ার উপজেলার লাউহাটি, এলাসিন ও ফাজিলহাটিতে নৌকা বিক্রি হচ্ছে। 

নৌকা তৈরির মৌসুমি কাঠমিস্ত্রিরা বর্ষা ছাড়া বছরের অন্য সময়গুলোতে বাড়ির পারিবারিক কাজ ও কৃষি কাজ করে থাকেন। আবার পেশাদার কাঠমিস্ত্রিরা সারা বছর নৌকা তৈরি ছাড়াও ঘর, খাট, চেয়ার, টেবিল, ড্রেসিং টেবিল, আলনা, আলমারি ইত্যাদি তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। 

বাসাইলের রাশড়া করিম বাজারে নৌকা আরও দুইজন সহযোগীকে নিয়ে তৈরি করছিলেন ৬৫ বছরের প্রফুল্ল সূত্রধর।

উপজেলার সদর ইউনিয়নের মিরিকপুর গ্রামের মৃত নেপাল সূত্রধরের ছেলে প্রফুল্ল জানান, ছোটবেলায়ই হাতুড়ি ও বাটালের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। দীর্ঘ ৫৫ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি কাঠমিস্ত্রির কাজ করছেন।

তিনি বলেন, সে সময় পড়াশোনার খরচ অনেক বেশি ছিল।সংসার চালানোই যেখানে দায়- সেখানে লেখাপড়ার প্রশ্নটা অবান্তর ছিল। বাপ-দাদারা বলেছে- কাঠমিস্ত্রির কাজ করেই পেট চালাতে হবে। তাই তাদের কাছ থেকেই কাঠমিস্ত্রির কাজ শিখেছেন।

এক সময় মুরব্বীদের সঙ্গে বাসাইল উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে কাজ করতেন। সেই কাজই এখন তার নেশা ও পেশা হয়ে গেছে।

Image

হাটে নৌকা নিয়ে ক্রেতার অপেক্ষা।

প্রবীণ এই সুতার জানান, বর্ষা মৌসুমে নৌকার কদর বেড়ে যায়। তাই বর্ষার সময় নৌকা তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এ ছাড়া শুকনো মৌসুমে ঘর, খাট, চেয়ার, টেবিল ড্রেসিং টেবিল, আলনা. আলমারি ইত্যাদি তৈরি করে হাটে বিক্রি করে সংসার চালান। 

নাগরপুরের গয়হাটা ও বাসাইলের মিরিকপুর, কাউলজানী হাটে কথা হয় কাঠমিস্ত্রি বলরাম সূত্রধর, বিশ্বজিৎ সূত্রধর, স্বপন সূত্রধর, পলাশ সূত্রধর, হরিমোহন সূত্রধরসহ অনেকের সঙ্গে।

তারা জানান, এখন প্রায় প্রত্যেক এলাকার বড় রাস্তাই পাকা করা হয়েছে। ফলে দূরের যাত্রার জন্য কেউ বড় নৌকা তৈরি করে না। বর্ষায় এ পাড়া থেকে ওপাড়া যাতায়াতের জন্য ছোট ছোট নৌকার প্রয়োজন হয়। তাই বড় নৌকা এখন তৈরি হয় না- ছোট নৌকারই কদর বেশি। তারা আক্ষেপ করে জানায়, এক সময় এ পেশা তাদেরই ছিল।

তারা আরও জানান, একটি ছোট নৌকা তৈরি করতে তিনজন কারিগরের দুই থেকে তিন দিন সময় লাগে। বেশির ভাগ নৌকাই ইউক্যালিপ্টাস, শাল, কড়ই, বাউলা, মেহগনি, ঝিগা ও আম কাঠ দিয়ে তৈরি করে থাকেন। দাম একটু বেশি হলেও সব থেকে টেকসই হয় শাল কাঠ দিয়ে।

এ ছাড়া নৌকাকে বিভিন্ন আঘাত থেকে রক্ষায় এখন পাশে টিনের পাতও যুক্ত করা হয়। তাতে খরচ বাড়লেও নৌকা সুরক্ষিত থাকে।

এই সুতাররা আরও জানান, নৌকার দাম নির্ধারণ করা হয় আকার ও ব্যবহৃত কাঠের ওপর নির্ভর করে। সাধারণত একটি নৌকা ৮ থেকে ১০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন তারা। আর শাল কাঠের একটি নৌকা বিক্রি করে থাকেন ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকায়। সবচেয়ে ভালো মানের একটি নৌকা ২০ হাজার টাকাও বিক্রি করা যায়। 

কাঠমিস্ত্রি বিমল সূত্রধর জানান, বর্ষা মৌসুমে কাঠমিস্ত্রির কাজ করেই তাদের সংসার চলে। ছোটবেলা থেকে বাপ-দাদার কাছেই হাতেখড়ি নিয়েছেন তারা। কাঠমিস্ত্রির কাজ করা তাদের নেশা ও পেশা।

একই কথা জানান রমেন স্যানালও। তিনি জানান, শিশুকালে হাতুড়ি-বাটালের সঙ্গে বড় হয়েছেন তিনি। লেখাপড়া করেননি। পূর্ব পুরুষের পেশাকেই মূল পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। বউ-বাচ্চা নিয়ে মোটামুটি ভালোই চলে যায়।

তিনি চুক্তিতে বায়নায় নৌকা তৈরি করেন। এতে প্রতিদিন ৭০০ থেকে এক হাজার টাকা মজুরি পান। বর্ষার সময় এলে আয়-রোজগার ভালোই হয়। শুকনো মৌসুমে সংসারের টুকিটাকি আর কৃষিকাজ করেন। তিনি এই পেশায় প্রায় ৩৫ বছর ধরে রয়েছেন। 

অপর কাঠমিস্ত্রি সখী সরকার জানান, প্রায় ৩০ বছরের বাপ-দাদার পেশায় আছেন তিনি। বর্ষার সময় নৌকা তৈরি ও অন্য সময় ঘর তৈরির কাজ করেন। বর্ষা মৌসুমে নৌকার খুবই কদর থাকে। এ সময় নৌকার কাজ বেশি করেন। 

তবে ধীরে ধীরে সড়কপথে যোগাযোগ বাড়ায় এই পেশা হারিয়ে যাচ্ছে বলেও কিছুটা শঙ্কার সুর শোনা যায় এই কারিগরদের মুখে।