হাওরে বাঁধ সংস্কারে ‘ধীরগতি’, চিন্তিত কৃষক

“বান্দের কোথাও মাটি কাডা শুরু করছে মাত্র; অনেক জাগাতেই এখনও মাটিই কাডা অয় নাই।”

নেত্রকোণা প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 22 Feb 2024, 03:31 AM
Updated : 22 Feb 2024, 03:31 AM

নেত্রকোণায় হাওরাঞ্চলে ফসল রক্ষা বাঁধের সংস্কারে কৃষকরা ধীরগতির অভিযোগ করলেও বাস্তবায়নকারী সংস্থা পাউবো বলছে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই তারা কাজ শেষ করবে।

মদন, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরীসহ সাত উপজেলায় বিস্তৃত এ হাওরাঞ্চলের প্রায় ৪২ হাজার হেক্টর জমি এক ফসলি; যাতে কৃষকরা এখন বোরো ধান রোপণ করছেন।

জেলায় ৩৬৫ কিলোমিটার বাঁধ রয়েছে। এবছর আগাম বন্যার হাত থেকে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার ফসল রক্ষায় প্রায় দেড়শ কিলোমিটার সংস্কার কাজ করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

প্রতিবারের মত জেলা পাউবো এবার ৩৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৮০টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) মাধ্যমে এই সংস্কার কাজ করছে।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক প্রকল্প এলাকায় বাঁধে কিছু স্থান বাদ রেখে মাটি ফেলানো হয়েছে। কোথাও ৪০-৫০ শতাংশ কাজ শেষ হলেও কোথাও আবার ২০-২৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।

হাওরবাসীর জন্য এটিই একমাত্র ফসল। এই ফসলের ওপর নির্ভর করেই তাদের সারা বছর চলতে হয়। অনেক সময় দেখা যায়, উজান থেকে নেমে আসা আগাম ঢলে সেই ফসল তলিয়ে যায়। ফসল পানিতে ভেসে গেলে হাওরের মানুষের দুঃখের সীমা-পরিসীমা থাকে না।

তাই বাঁধের কাজ মানসম্মত ও ভালভাবে যেন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ হয় সেদিকে নজর থাকে গোটা হাওরাঞ্চলের মানুষের।

খালিয়াজুরী উপজেলার জগন্নাথপুর গ্রামের কৃষক মো. আমির উদ্দিন বাড়ির সামনের হাওরে তিন একর জমিতে বোরো ধান রোপণ করেছেন। তিনি বলছিলেন, “ফসল লইয়া বড়ো বেশি টেনশনে আছি। আমরার একটাই ফসল। বোরো ধান পাকার সময়ডাতেই বান-তুফান আয়ে। আগাম বন্যা আমরার চোখের সামনেই ফসল তলায়া নষ্ট কইর‌্যা ফালায়। তহনতো চাইয়া চাইয়া দেহন ছাড়া আর কোনো গতি থাহে না।”

বাঁধের কাজের বিষয়ে জানতে চাইলে এই কৃষক বলেন, “এইবার বান্দের কাম যে গতিতে অইতাছে অতো ঢিলামি করতাছে যে কওনের ভাষা নাই। অহনো মাটিই কইট্যা শেষ করে নাই। কোনদিন মাটি বওয়াইবো, ঘাস লাগাইবো আর মাটি শক্ত অইবো।

“হেরা যেইবায় কাম করতাছে, বান্দের কাম শেষ করলেও মাটি শক্তপোক্ত অইতো না। ঢল আইলে ঠেলা দিয়া ভাইঙ্গাচুইরা লইয়া যাইবোগা। আরো এক মাসেও কাম শেষ করতে পারে কিনা সন্দেহ আছে।”

একই গ্রামের আরেক কৃষক জমির মিয়া বলেন, “ক্ষেত করছি ঋণ-দাওর কইরা। বান্ধের কাজ ঢিলেমিছি করতাছে। এভাবে চললে বন্যা আইয়া ফসল লইয়া যাইবগা। বান্দের কোথাও মাটি কাডা শুরু করছে মাত্র। অনেক জাগাতেই এখনও মাটিই কাডা অয় নাই।”

দ্রুত সংস্কার কাজ শেষ করার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, “সরকার তো ঠিক সময়েই ভালমতন কাম শেষ কইর‌্যা আমরার ফসল বাঁচানোর জন্যে ট্যাহা দিছে। সরকারে ঠিকই খরচ করতাছে আমরার লাইগ্যা। কিন্তু প্রকল্পের লোকজন আর প্রশাসনের লোকজন যদি ঢিলামি করে তাইলে আমরা বাঁচবাম কেমনে?”

এলাকার আরেক কৃষক লায়েক মিয়া বলেন, “কয়দিন পরেই তো বৃষ্টি আইবো। পাইন্যে ঠেলা দিয়া লইয়া যাইবোগা সবকিছু। হেরা মাটি কাডাতো শেষ দিতাছে না। অহন যে মাডি কাটতাছে এই মাডি নরম থাকবো। গাছবেরি লাগাইয়া করবো কিতা। পাইন্যে আইয়াতো ঠেলা দিয়া লইয়া যাইবোগা। এইতা গাছবেরি দিয়া লাভ কিতা। এইতায়া কি আর বান রাখতা পারবো।

“সময়ের কাম সময়ে না করলে কোনো লাভ নাই। আমরার ফসলের তো দুর্গতি তো আছেই। মাডি কাটায় মাইনষের সাহায্যের লাইগ্যা, ফসল বাঁচাইবার লাইগ্যা। ফসল তো আর বাঁচাইতাম পারি না। এই মাটি কাডার তো কোন গুণ নাই।”

খালিয়াজুরী উপজেলার ৬ নম্বর প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) সাধারণ সম্পাদক খোকন মিয়া বলেন, “বাঁধের কাজে আমরা যে সাইট নিছি এই সাইট বুঝায়া দিতে অনেক দেরি করছে। এরকমও হইছে একসময় যে সাইট বুঝায়া দিছে পরে পরিবর্তন করে আরেক সাইট দিছে।

“স্থান নির্বাচন করে দিতে অফিস দেরি করায় প্রকল্পের কাজ শেষ করতে দেরি হচ্ছে। তাছাড়া এমপি নির্বাচনের কারণে কাজের গতি কিছুটা কম হয়েছে।”

তবুও এখন পর্যন্ত ৫০ শতাংশ কাজ শেষ হয়ে গেছে জানিয়ে খোকন মিয়া বলেন, “২৮ ডিসেম্বরের মধ্যে মাটি কাটার কাজ শেষ হয়ে যাবে। পরে ঘাস, সলিংয়ের কাজ শেষ করব।”

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সারওয়ার জাহান বলেন, প্রাক্কলিত ব্যয়ের মধ্যে প্রাথমিকভাবে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ১৪ কোটি ২৯ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। সাতটি উপজেলায় পুরোদমে কাজ চলমান রয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মাঠে রয়েছেন। তারা সার্বিক তদারকি করছেন।

নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ার শঙ্কার বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, “কাবিটা নীতিমালা অনুযায়ী ২৮ ফেব্রুারির মধ্যে কাজ শেষ করার কথা। এখন নাগাদ ৫০ শতাংশের মত কাজের অগ্রগতি হয়েছে। আমরা আশা করছি, নির্ধারিত যে সময়সীমা রয়েছে আমাদের কাজটা শেষ হয়ে যাবে।

“দুয়েকটা জায়গায় পানি নিষ্কাশনের সমস্যা হয়েছিল, দেরিতে পানি নামছে। যার কারণে আমাদের কাজটা কিছুটা বিলম্বিত হতে পারে। তবে ঝুঁকিপূর্ণ যে পয়েন্টগুলো রয়েছে সবগুলোতেই বাঁধ মেরামতের কাজ শেষ হয়ে যাবে বলে আমরা আশাবাদী।”

প্রকৌশলী সারওয়ার জাহান বলেন, “কাজ বাস্তবায়নে গাফিলতি বা দুর্নীতির আশ্রয় নিলে আমরা ওই পিআইসি বাতিল করে দেব এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেব।”