Published : 24 Aug 2026, 04:37 PM
খাগড়াছড়িতে আকস্মিক পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় ফসল ও সড়ক যোগাযোগ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে বোয়ালখালি খালের পানি বেড়ে যাওয়ায় স্রোতের তোড়ে ধসে গেছে শতাধিক কাঁচা মাটির ঘর।
বন্যায় সদর, দীঘিনালায় ও পানছড়ি উপজেলায় প্রায় ২৭৮ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন খাগড়াছড়ি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নাসির উদ্দিন চৌধুরী।
স্থানীয়রা জানান, শুক্রবার মধ্যরাতে ভারি বর্ষণে তলিয়ে যায় নিম্নাঞ্চল। শনিবার সকালে প্লাবিত হয়ে নতুন নতুন এলাকা। সেইসঙ্গে পাহাড়ি ঢলে বোয়ালখালী খালের পানি বেড়ে স্রোতের তোড়ে ভেসে যায় অনেক ঘরবাড়ি।
দীঘিনালা উপজেলার জামতলী, মায়াফাপাড়া, সুধির মেম্বারসহ বিভিন্ন এলাকার শতাধিক কাঁচা মাটির ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পুরোপুরি বিধ্বস্ত না হলেও অনেক ঘরবাড়ির দেয়াল ধসে গেছে। আকস্মিক এই বির্পযয়ে হতবাক ক্ষতিগ্রস্তরা।
দীঘিনালার জামতলী গ্রামের বাসিন্দা আমেনা বেগম বলেন, “আমার ঘরবাড়ি সব ডুবিয়ে ফেলছে। আমি কিছু বাইর করতে পারি নাই ভাই। সব গুদাম (মাটির ঘর), ঘর ভেঙে গেছে। আধা ঘণ্টা সময় লাগে নাই। রাত ৩টার পরে সব বিধ্বস্ত হয়ে গেছে।”
একই এলাকার বাসিন্দা ফাতেমা বেগম বলেন, “এমন একটা অবস্থা, কেউ একটু সুযোগ পায় নাই যে ঘরের জিনিসপত্র বের করব। আমাদের বাড়ি হচ্ছে নদীর পাড়ে, নদীর পাড় থেকে হু হু করে পানি ঘরের মধ্যে ডুকে গেছে। বেড়া ভেঙে আমার ঘরে কিছুই নাই।”
বোয়ালখালী ছড়া তীরবর্তী একশর বেশি ঘরবাড়ি ভেঙে পড়েছে জানিয়ে নুরুন্নবী হোসেন বলেন, “আগে কখনো এমন পরিস্থিতি হয়নি। পানির তোড়ে মাটি দিয়ে তৈরি ঘর ভেঙে গেছে। বোয়ালখালী ছড়ার পানি আশপাশের পুরো এলাকা প্লাবিত করে দিয়েছে। ছড়া তীরবর্তী ঘরবাড়ি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”
ঘরবাড়ির পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ফসলি জমি
পাহাড়ি ঢলে দীঘিনালায় ১২০ হেক্টর জমির আমন ক্ষেত, ১৭ হেক্টর আউশ এবং ২০ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজিসহ মোট ১৬০ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। সদর ও পানছড়ি ও দীঘিনালা উপজেলা মিলিয়ে ক্ষতির পরিমান ২৭৮ হেক্টর জমির ফসল।
দীঘিনালার মধ্য বোয়ালখালী গ্রামের কৃষক সুবিমল চাকমা বলেন, “অধিকাংশ জমি পানিতে তলিয়ে গেছে, কিন্তু সরকারিভাবে কোনো সহযোগিতা পাই নাই। ধান্য জমি প্রায় ক্ষতিগ্রস্ত, পানিতে তলিয়ে গেছে। তো আমরা সরকারিভাবে তেমন কিছু পাই নাই।
“এবার গতবারও অনেক, এবার যে বন্যাটা হয়েছিল, অনেক বড় পানি হয়েছিল, কিন্তু এখনো আমরা কোনও সহযোগিতার কোনো ইয়ে পাই নাই, কোনো আশ্বাস পাই নাই এখনো।”
বোয়ালখালী ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে সদস্য মো. ইব্রাহিম হোসেন (কালু মেম্বার) বলেন, “জামতলী এলাকা হয়ে সুধীর মেম্বার পাড়া এবং কাঁঠালতলী ব্রিকফিল্ডে অর্ধশতাধিক ঘর ধসে গেছে।
“আরও বিশেষ করে হইলো যে, মানুষের যে খামার, যারা মুরগির পালন করে, মাছের খামার, ধানের জমি একদম পানিতে তলিয়ে গেছে। সরকারের কাছে আমরা আমাদের এলাকার গরীব মানুষের জন্য সহযোগিতা চাচ্ছি।”
দীঘিনালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. তানজিল পারভেজ বলেন, আকস্মিক বন্যায় উপজেলার জামতলী, মায়াফাপাড়া, জামতলী ও বাঙালীপাড়া এলাকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, “একদম শেষ রাতের দিকে বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে পানি চলে এসেছে। তো এই বিষয়টিতে অনেকেই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন। এলাকাটিতে অধিকাংশ মাটির ঘর ছিল। যার ফলে ঘরগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এখন হিসাব না করলেও আমাদের আনুমানিক হিসাবে ধরা যাচ্ছে যে শতাধিক ঘর ওই এলাকাটিতেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তো ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছি। আমরা অ্যাসেসমেন্ট করার চেষ্টা করছি ঠিক কি পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
“কাজ শেষ করা হলে সরকারি যে বরাদ্দ আসবে, তা আমরা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে বিতরণ করব। এর মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাটিতে রান্না করা খাবার বিতরণ করা হচ্ছে।
পরবর্তীতে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় শুকনো খাবার বিতরণের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা বলেছেন ইউএনও তানজিল।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের কৃষকদের তালিকা করে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন খাগড়াছড়ি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক নাসির উদ্দিন চৌধুরী।