Published : 13 Jul 2025, 02:54 PM
ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার চতুল ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ঘুষ ছাড়া কোনো সেবা পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ তুলেছেন সেবাপ্রত্যাশীরা।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, জমির নামজারি বা মিউটেশন, খতিয়ান দেখানো, তদন্ত প্রতিবেদন বা খাজনা আদায় প্রতিটি ধাপে ‘টাকা না দিলে’ কাজ হয় না। অতিরিক্ত অর্থ না দেওয়ায় দিনের পর দিন অফিসের বারান্দায় ঘুরতে হচ্ছে অনেককেই। সতেরশ টাকার মিউটিশন করতে অন্তত দুই থেকে ছয় হাজার টাকা বেশি গুনতে হয়।
ভূমি অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত তহসিলদার জহিরুল হকের বিরুদ্ধে এসব অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। যদিও জহিরুল এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
রোববার চতুল ভূমি অফিসের সামনে কথা হয় ফরিদপুর জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য আহসান হাবিবের সঙ্গে। তিনি বলেন, “ভূমি অফিসের অতিরিক্ত অর্থ না দিলে কোনো ফাইল এসিল্যান্ড অফিসে যায় না। আমার কোনো মিউটেশন ৪ থেকে ৫ হাজার টাকার কমে কাজ সম্পন্ন হয়নি।”
চতুল ইউনিয়নের বাইখীর গ্রামের নিয়ামুল হক ফয়সাল এবং বাইখীর চৌরাস্তা এলাকার মিলন শেখও একই কথা জানান।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, চতুল ইউনিয়ন ভূমি অফিসের চারপাশে সেলিম মুন্সি, পান্নু শেখ, জাহিদ ঠাকুর, সাইফার হোসেন ও রবিউল ইসলামসহ আরও কয়েকজনের কম্পিউটারের দোকান রয়েছ। দোকানগুলোতে ভূমি সংশ্লিষ্ট কাজ অনলাইনে করা হয়।
সেসব দোকান থেকেই ‘মক্কেল ধরে নিয়ে যাওয়া হয়’ তহসিলদারদের কাছে।
একটি জমির মিউটেশনের সরকারি চার্জ ১১৭০ টাকা হলেও সেবাগ্রহীতার কাছ থেকে প্রকারভেদে ২ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তারা।
বোয়ালমারী উপজেলার ছুলনা গ্রামের ইতালি প্রবাসী শামিমা ইয়াসমিন মোবাইল ফোনে বলেন, “গত জুলাই ১০ আমি ইটালি চলে আসি। আসার আগে চতুল ইউনিয়নের একটি জমির মিউটেশন খুবই জরুরি ছিল। ভেবেছিলাম ভূমি ব্যবস্থাপনার ডিজিটালাইজেশন হয়েছে আমার কাজটি ভোগান্তি ছাড়া দ্রুতই হয়ে যাবে। বাইরের দোকান থেকে অনলাইনে আবেদন করে প্রয়োজনীয় সব কাজপত্র নিয়ে আমি ভূমি অফিসে যাই।
“সমস্যা হয় সেখানেই। অতিরিক্ত টাকা ছাড়া তারা ফাইল ফরওয়ার্ড দেয় না এসিল্যান্ড অফিসে। পরে আমার ভাইকে দিয়ে এক হাজার টাকা পাঠিয়ে কাজটি করতে হয়েছে।”
চতুল ভূমি অফিসের সেবাগ্রহীতাদের দাবি, তহসিলদার জহিরুল হক নিজের নিয়ন্ত্রণে কয়েকজন ‘দালাল’ রেখে সেবা নিতে যাওয়া লোকজনের সঙ্গে কথা বলান। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিনি নিজেই অফিসের খরচের কথা বলে অতিরিক্ত অর্থ নেন।
ছুলনা গ্রামের আশরাফুজ্জামান সাইফার মিয়ার ছেলে এহরামুজ্জামান বলছিলেন, “বেশ কিছুদিন হল বাবা মারা গেছেন। তার নামে রেকর্ডীয় সম্পত্তি নামজারি করার জন্য গিয়েছিলাম চতুল ভূমি অফিসে। ওই অফিসে ৩-৪ কার্যদিবস যাওয়ার পর তহসিলদার সাহেব বললেন অফিস খরচ না দিলে কিভাবে ফরওয়ার্ডিং হবে।
“বাধ্য হয়ে এক হাজার টাকা দিয়ে আমার কাজটা আমি করেছি। তারপরও খুশি আমার কাজতো হলো।”
গুনবহা ইউনিয়নের চাপলডাঙ্গা থেকে মিউটেশন করতে আসা নাজমুল হোসেন বলেন, তিনি সৌদি প্রবাসী। ৮ শতাংশ জমির মিউটেশন করতে সরকারি জমা টাকার বাইরে ১০ হাজার টাকা দিয়ে হয়েছে তাকে। অতিরিক্ত টাকা দেওয়ার পর, তাকে বলা হয়েছে সাত দিনের মধ্যে কাজটি করে দেওয়া হবে।
চতুল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, “আমার ইউনিয়নের অনেকের কাছ থেকেই চতুল ইউনিয়ন ভূমি অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত তহসিলদার জহিরুল হকের সম্পর্কে বিভিন্ন রকম খবর পেয়েছি, তবে আমি নিজে কখনো যাইনি।
অভিযোগের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তসিলদার জহুরুল ইসলাম বলেন, “আপনারা যে অভিযোগটার কথা বলছেন সেটা সঠিক নয়, এখন অনলাইনে কাজ করা হয। ঘুষ নেওয়ার কোনো সিস্টেমই নাই। যদি কেউ তৃতীয় ব্যক্তির মাধ্যমে ঘুষ লেনদেন করে সেই দায় দায়িত্ব আমার নয়।
“তবে অনেক সেবাগ্রহীতারা খুশি হয়ে আমাদের চা নাস্তা করায়।”
ভূমি ব্যবস্থাপনায় ডিজিটালাইজেশন হওয়ার পরেও সাধারণ মানুষকে কেন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে জানতে চাইলে ফরিদপুর সচেতন নাগরিক কমিটির টিআইবির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট শিপ্রা গোস্বামী বলেন, “সরকার যেভাবে সংস্কারের মাধ্যমে মানুষের সেবা নিশ্চিত করতে চায়, তৃণমূল পর্যায়ে আসলে সেই মেসেজটি এখনও সেভাবে পৌঁছায়নি। যে কারণেই শত চেষ্টার ফলেও ভূমি ব্যবস্থাপনায় সেবাগ্রহীতার হয়রানি রোধ করা যাচ্ছে না।
“এক্ষেত্রে জেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে উপজেলা প্রশাসনেরও সদয় আন্তরিকতা ও কঠোর তদারকি দরকার। তবেই হয়তো আমরা ভূমি ব্যবস্থাপনা দুর্নীতিমুক্ত করতে পারবো।”
ফরিদপুরের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদস্য সচিব মাসুদ রানার বলেন, “বতর্মান সরকার তৃণমুল পর্যায়ে মানুষের সেবা দেয়ার জন্য নিরোলস কাজ করে যাচ্ছেন। তারপরেও এ কাজে যারা বাধা হয়ে দাঁড়াবে প্রয়োজনে তাদের বিরুদ্ধে আমরা আন্দোলন গড়ে তুলবো।”
ফরিদপুর দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক হাসানউজ্জামান বলেন, চব্বিশের আন্দোলন একটি পরিবর্তনের জন্য হয়েছে, সেখানে যারা প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে তাদের অবশ্যই আইনে আওতায় আনা উচিত এবং প্রশাসনের যে পর্যায়গুলোতে দুর্নীতির হওয়ার সম্ভাবনা বেশি সেখানে তদারকি হওয়া দরকার
“আর এক্ষেত্রে স্থানীয় জনসাধারণেরও সক্রিয় হওয়া উচিত। সরকারের যেসব দপ্তরের দুর্নীতিবাজ লোক রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হইতে হবে সকলকে।”
বোয়ালমারীর সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন, “ভূমি ব্যবস্থাপনায় অনলাইন সার্ভিস চালু হওয়ার ফলে অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতি কমেছে। তবে অনেকই এই বিষয়টি ভালোভাবে না বুঝতে পারায় দালালের খপ্পরে পড়ে। তখন তাদের অতিরিক্ত অর্থ নষ্ট হয়।”
এ ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে সরাসরি এসি ল্যান্ডঅফিসে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।