Published : 30 Sep 2025, 01:48 AM
মারমা কিশোরীকে ধর্ষণের ঘটনার জের ধরে উত্তপ্ত খাগড়াছড়িতে অবরোধ চালিয়ে আসা জুম্ম ছাত্র-জনতার প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রশাসনের বৈঠক হলেও অবরোধ বা ১৪৪ ধারা তোলার কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
সোমবার পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমার উপস্থিতিতে এই বৈঠকে জুম্ম ছাত্র-জনতার পক্ষ থেকে আট দফা দাবি তুলে ধরা হয়।
পরে রাতে এ সংগঠনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “সিভিল প্রশাসন মৌখিকভাবে ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার ব্যতীত বাকি সব দাবি মানার কথাই জানিয়েছে; পাশাপাশি সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে হয়রানি ও গ্রেপ্তার বন্ধের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। প্রশাসন ১৪৪ ধারা অবরোধ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত বহাল রাখার ঘোষণা দিয়েছে।
“এই আলোচনার মাধ্যমে সরকার ও প্রশাসনের সাথে আমাদের আনুষ্ঠানিক সংলাপের যে সূচনা হয়েছে, সেটি আমরা স্বাগত জানাই। তবে এটি কোনোভাবে আমাদের অধিকার ও অভ্যুত্থান খালি কথায় গৃহীত হবে তা নয়।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. এবিএম ইফতেখারুল ইসলাম খন্দকার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আন্দোলনকারীদের সাথে আমাদের আলাপ হয়েছে। তারা আমাদেরকে ১৪৪ ধারা প্রত্যাহারের অনুরোধ করেছে।
“আমরা বলেছি তারা অবরোধ প্রত্যাহার করলে আমারও ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার করব। আলোচনা শুরু হয়েছে কেবল, দেখা যাক।”
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক উপদেষ্টা ও জেলা প্রশাসক ছাড়াও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা, পুলিশ সুপার মো.আরেফিন জুয়েল প্রশাসনের পক্ষে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের পক্ষে ছিলেন কৃপায়ন ত্রিপুরা, বাগীশ চাকমা, ছদক চাকমা, পিন্টু চাকমা, মনিকা চাকমা ও তোশিতা চাকমা।

কেন এই উত্তেজনা
খাগড়াছড়িতে চলমান এ উত্তেজনা শুরু হয় বুধবার; আগের দিন রাতে ‘অচেতন অবস্থায়’ ক্ষেত থেকে এক মারমা কিশোরীকে উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে।
মঙ্গলবার রাতেই ওই কিশোরীর বাবা ধর্ষণের অভিযোগে সদর থানায় মামলা করেন। মামলার পরিপ্রেক্ষিতে পরের দিন ভোরে সেনাবাহিনীর সহায়তায় একজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এর মধ্যে ধর্ষণের প্রতিবাদ ও বিচার দাবিতে আন্দোলন শুরু হয় খাগড়াছড়িতে। এই আন্দোলন এক সময় সহিংস হয়ে ওঠে।
১৪৪ ধারা জারির পাশাপাশি অতিরিক্ত সেনা ও বিজিবি মোতায়েনের পরও পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে থাকে। রোববার ১৪৪ ধারার মধ্যেই গুইমারায় ব্যাপক সহিংসতা হয়। সেখানে গুলিতে নিহত হয় তিনজন।
সোমবার সকাল থেকে নতুন করে গোলযোগের কোনো খবর না এলেও গুইমারা উপজেলার পরিস্থিতি এখনো থমথমে।
সোমবার দুপুর থেকে অবরোধ শিথিল হওয়ায় খাগড়াছড়ি জেলার সঙ্গে ঢাকা ও চট্টগ্রামের পথে যান চলাচল শুরু হয়েছে।
তবে জুম্ম ছাত্র জনতার ডাকা অবরোধে রাঙামাটির সঙ্গে যান চলাচল এখনো বন্ধ রয়েছে। খাগড়াছড়ির দীঘিনালা, পানছড়ি, মাটিরাঙাসহ নয় উপজেলার সঙ্গেও জেলা সদরের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ। এসব পথে জরুরি সেবা ছাড়া অন্য কোনো যানবাহন চলাচল করছে না।
অবরোধের কারণে তিন দিন ধরে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় বিপাকে পরেছে সাধারণ মানুষ। সাজেকে আটকে পরা ৫১৮ জন পর্যটককে সেনা নিরাপত্তা সাজেক থেকে খাগড়াছড়িতে নিয়ে আসা হয়েছে। সোমবার দুপুরে তারা খাগড়াছড়ি শহরে পৌঁছান।
খাগড়াছড়ি শহরের চেঙ্গী স্কয়ার, শাপলা চত্বর, কলেজ গেইট, স্বনির্ভর, জিরো মাইলে চেকপোস্ট বসিয়েছে নিরাপত্তা বাহিনী। দিনের বেলায় ১৪৪ ধারার মধ্যে চলাচলকারীদের চেকপোস্টে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

জুম্ম ছাত্র-জনতার দাবি কী
সোমবার রাতে জুম্ম ছাত্র-জনতার মিডিয়া সেলের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “আমরা স্পষ্ট করে ঘোষণা করছি, জুম্ম ছাত্র-জনতা কোনো রাজনৈতিক দল নয়, বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীও নয়। আমাদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনকে ‘ইউপিডিএফ’ বা অন্য কোনো ট্যাগ দিয়ে দমন করা যাবে না। ২৩ সেপ্টেম্বর একটি জুম্ম কিশোরীর উপর সংঘটিত ধর্ষণের ন্যায়বিচারের দাবিতে যে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন সংঘবদ্ধ হয়েছে, তা প্রতিটি নাগরিকের ন্যায্য অধিকার।
“কিন্তু ২৭ সেপ্টেম্বর অবৈধ সেটেলার কর্তৃক চালানো সাম্প্রদায়িক হামলা এবং ২৮ সেপ্টেম্বর গুইমারায় সেনাবাহিনীর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ - এগুলো কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য নয়; এগুলো একেবারেই ন্যক্কারজনক, বর্বর ও মানবতাবিরোধী। সেটেলারদের কর্তৃক ঘরবাড়ি, দোকান ও যানবাহনে অধস্তনভাবে আগুন দেওয়া, লুটপাট, এবং নির্বিচার গুলির ফলে তিন জন শহীদ হয়েছেন ও বহু নিরীহ মানুষ আহত হয়েছেন। আমরা এই কাজকে দমনপন্থা, রাষ্ট্রীয় অবহেলার ফল এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য করে কড়া ভাষায় নিন্দা জানাচ্ছি।”
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রোববারের ঘটনায় তিনজন নিহত হওয়ার পাশাপাশি ১৬ জন আহত এবং ৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তবে নিখোঁজদের নাম সেখানে প্রকাশ করা হয়নি।
২৮ সেপ্টেম্বরকে ‘গুইমারা গণহত্যা’ হিসেবে ঘোষণা করা হয় জুম্ম ছাত্র-জনতার সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে।
সেখানে বলা হয়, “এ ঘটনার সাথে জড়িত সকলকে দ্রুত এবং আইনি বিচারের মুখোমুখি করতে আমরা দাবি জানাচ্ছি।”
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে মোট নয় দফা দাবি তুলে ধরে সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করার আহ্বান জানানো হয়।
>> আলোচনার সময়কাল থেকে শুরু করে পরবর্তী পর্যন্ত যে কোনো ধরনের হামলা, গ্রেপ্তার, লাঠিচার্জ বা সাম্প্রদায়িক আক্রমণ বন্ধ রাখার বিষয়ে প্রশাসন আইনগতভাবে বাধ্য থাকবে।
>> ধর্ষণ মামলার অবশিষ্ট দুই আসামিকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক বিচারে দণ্ড প্রদান করতে হবে; ইতোমধ্যে আটক আসামির দ্রুত বিচার কার্যকর করে সরকারি গেজেটে বিজ্ঞপ্তি দিতে হবে; ভুক্তভোগীকে যথাযথ আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন দিতে হবে।
>> ২৭ ও ২৮ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ি ও গুইমারায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও গুলিবর্ষণের সমস্ত ঘটনার বিষয়ে স্বতন্ত্র, স্বাধীন এবং বিচার বিভাগীয় তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে; এই তদন্ত প্রতিবেদন ১০ দিনের মধ্যে দিতে হবে।
>> নিরীহ ও নিরস্ত্র জনতার ওপর সংঘটিত হামলা ও অগ্নিসংযোগে সৃষ্ট ক্ষতির পূর্ণ ক্ষতিপূরণ রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করতে হবে; আহতদের সম্পূর্ণ চিকিৎসা-ব্যয় জেলা/রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ বহন করবে।
>> শান্তিপূর্ণ অবরোধ ভাঙার উদ্দেশ্যে অনুপ্রবেশ করে আঘাত করলে দায়ীদের বিরুদ্ধে তৎক্ষণাৎ মামলা ও প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে।
>> আন্দোলন সংশ্লিষ্ট সকল আটকদের অবিলম্বে ও নিঃশর্তভাবে মুক্তি দিতে হবে; ২৭ ও ২৮ সেপ্টেম্বর সংঘটিত হামলার বিষয়ে স্বচ্ছ ও স্বতন্ত্র তদন্ত করে দোষীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
>> নিহত পরিবারকে ২০ লাখ টাকা, গুরুতর আহতদের ১০ লাখ এবং সাধারণ আহতদের ২ লাখ টাকা এবং বাড়ি- ঘর, দোকান- পাট ক্ষতিগ্রস্তদের ৫ লাখ টাকা আর্থিক সহযোগিতা দিতে হবে।
>> আইএসপিআর-এর বিবৃতিতে ‘জুম্ম ছাত্র-জনতা’ প্ল্যাটফর্ম এবং অন্যতম সমন্বয়ক উক্যনু মারমাকে যে ইউপিডিএফ-সংযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, সেই ট্যাগ অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে। একইসঙ্গে অনলাইনে পাহাড় সম্পর্কে যে গুজব ও বিভ্রান্তিকর প্রপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
>> অবিলম্বে ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার করতে হবে।
বিবৃতিতে বলা হয়, এসব দাবি ‘দ্রুত, পূর্ণ ও সন্তোষজনকভাবে’ বাস্তবায়িত না করলে জুম্ম ছাত্র-জনতা তিন পার্বত্য জেলায় অনির্দিষ্টকালের জন্য সড়ক অবরোধ চালিয়ে যাবে এবং পর্যটনসহ সংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত থাকবে।
“পাশাপাশি আমরা আরও ব্যাপক, সুসংগঠিত ও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা ও বাস্তবায়নে বাধ্য হব। আমরা শান্তি পছন্দ করি - কিন্তু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের ধৈর্য সীমাহীন নয়।”

ইউপিডিএফ?
ধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদে জুম্ম ছাত্র-জনতার ব্যানারে অবরোধ চললেও আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) রোববার রাতে এক বিবৃতিতে সহিংসতার জন্য পাহাড়ি সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট–ইউপিডিএফকে দায়ী করে।
সেখানে বলা হয়, “বিগত কয়েক দিনের ঘটনা পর্যবেক্ষণে এটি স্পষ্ট যে, ইউপিডিএফ এবং তার অঙ্গসংগঠন সমূহ পার্বত্য চট্টগ্রামকে অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে সুপরিকল্পিতভাবে এলাকার মহিলা এবং স্কুলগামী কোমলমতি শিশুদের বিভিন্ন পন্থায় তাদের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণে বাধ্য করছে।”
সোমবার জুম্ম ছাত্র-জনতার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা নিজেও দাবি করেন, বৈঠকে অংশ নেওয়া প্রতিনিধিদের সবাই ইউপিডিএফ সদস্য।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “আপনাদেরকে বলি, আজকে এই যে জুম্ম ছাত্র জনতা, না জনতার নামে যে গ্রুপটা হয়েছে, তাদের সাথে আমি আজকে কথা বলেছি। ছয়জন এসেছিল তারা এবং আপনাদেরকেই বলি একটা জিনিস, এই ছয়জনই হচ্ছে ইউপিডিএফ।
“কারণ খাগড়াছড়ি এলাকায় ইউপিডিএফ ছাড়া কোনো কিছু নাই। আমি একে একে জিজ্ঞেস করলাম কয়জন বাকি এখানে ইউপিডিএফ এর বাইরে? বলে যে ‘আমরা ছয়জনই ইউপিডিএফ’। আমাদের কোনো অপরাধ নয় এটা। মতাদর্শগত মতাদর্শ থাকতেই পারে।
“কিন্তু বিষয়টা হচ্ছে যে, এই স্কোপটা আমি দেব কেন তাদেরকে? স্কোপ দেওয়ার দরকার আছে? দরকার নাই।”
উপদেষ্টা বলেন, “আমি আজকে এদেরকে বলেছিলাম, দেখুন আপনারা গত কয়েকদিনে যা যা করলেন, আমার মনে হয় নাই এটা ম্যাচিউরড ওয়েতে হয়েছে। ম্যাচিউরিটির কমতি এখানেই আছে।
“আরে ভাই একটা ইস্যু নিয়ে আমরা করব। এটাকে আমি যখন মাল্টি… ইয়েতে নিয়ে যাব, বাইরের লোকজন ঢুকে পড়বে। এই সুযোগ দিচ্ছি কেন আমি? সুতরাং একটা ইস্যু নিয়ে থাকেন, অবজেক্টিভ ফুলফিল করেন।”
পরে মধ্যরাতে জুম্ম ছাত্র-জনতার ফেইসবুক পেইজে এক বিবৃবিতে উপদেষ্টার ওই বক্তব্যের প্রতিবাদ জানানো হয়।
সেখানে বলা হয়, “আমরা জুম্ম ছাত্র-জনতার পক্ষ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক উপদেষ্টা বাবু সুপ্রদীপ চাকমার গালভরা মিথ্যা সাক্ষাৎকারকে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করছি। উক্ত সাক্ষাৎকারে আমাদের ছয় সদস্যবিশিষ্ট প্রতিনিধিদলকে অন্যায়ভাবে ‘ইউপিডিএফ’ ট্যাগ লাগানো হয়েছে, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, উদ্দেশ্যমূলক ও অপমানজনক।
“আমরা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিচ্ছি - এই ধরনের তথ্য বিকৃতি ও কুৎসা রটনার মাধ্যমে জনগণের ন্যায্য আন্দোলনকে দুর্বল করা যাবে না। বাবু সুপ্রদীপ চাকমা যদি অবিলম্বে তার ভুলে ভরা মিথ্যা বক্তব্য প্রত্যাহার না করেন, তবে জুম্ম ছাত্র-জনতা পরবর্তী আর কোনো শান্তি-আলোচনায় অংশ নেবে না।”