Published : 16 Mar 2026, 09:19 PM
স্থানীয় প্রশাসনকে রাজস্ব দিয়ে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের বিভিন্ন অংশের বালিয়াড়িতে গড়ে ওঠা পাঁচ শতাধিক দোকান ও স্থাপনা সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের নির্দেশ মেনে ব্যবসায়ীরা নিজেরাই দোকান ভেঙে মালামাল নিয়ে যান।
সৈকত থেকে রবি ও সোমবার দোকান সরে যাওয়ার পর জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রায় দুই দশক পর সুগন্ধা সৈকতের বালিয়াড়ি ‘দখলমুক্ত’ করা সম্ভব হয়েছে।
তবে সরকারিভাবে প্রশাসনকে রাজস্ব দিয়েই বালিয়াড়িতে এতদিন দোকান বসিয়ে ব্যবসা করে আসা ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা দ্রুত পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন।
কিন্তু যেসব স্থাপনাকে প্রশাসন এখন ‘দখল’ বলছে, সেসব জায়গায় ব্যবসা করার জন্য জেলা প্রশাসন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে রাজস্ব নিয়ে কার্ড দিয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।
এমন শতাধিক কার্ডের কপি সংগ্রহ করেছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম; যেখানে বছরে প্রায় ৬০ হাজার টাকা রাজস্বের বিনিময়ে ব্যবসা করার অনুমতির কথা বলা হয়েছে। এ অবস্থায় নিজেদের ‘বলির পাঁঠা’ ভাবছেন ব্যবসায়ীরা।

‘অবৈধ হলে কার্ড দিল কেন’
সুগন্ধা পয়েন্ট ঝিনুক ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি মো. জয়নাল বলেন, “যদি অবৈধ হয়, তাহলে জেলা প্রশাসন আমাদের কার্ড দিল কেন? তারা রাজস্ব নিয়ে কার্ড দিয়েছে বলেই এখানে দোকান বসেছে।”
তবে জেলা প্রশাসক আ. মান্নান বলেন, বালিয়াড়িতে স্থায়ী দোকানের জন্য কোনো কার্ড দেওয়া হয়নি।
“কার্ড দেওয়া হয়েছে ভ্রাম্যমাণ ব্যবসার জন্য। বালিয়াড়িতে স্থাপনা করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। তাই অভিযান চলবে,” বলেন তিনি।
তবে ব্যবসায়ী জয়নালের দাবি, “যদি ভ্রাম্যমাণ হয়, তাহলে শত শত কার্ড দেওয়া হল কেন? ব্যবসায়ীরা তো এখানে শৃঙ্খলার মধ্যেই ব্যবসা করছিল।”
নিজেরাই ভাঙলেন দোকান
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সুগন্ধা পয়েন্টের বালিয়াড়িতে গড়ে ওঠা স্থাপনাগুলো সরাতে রোববার সকাল ১০টা পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছিল।
নির্ধারিত সময় পার হলেও অনেক ব্যবসায়ী দোকান সরাননি। পরে রোব ও সোমবার দুপুরের দিকে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, সেনাবাহিনী, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), পুলিশ ও আনসার সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে মাইকিং করেন।

এরপর ব্যবসায়ীরা নিজেরাই দোকান ও মালামাল সরিয়ে নিতে শুরু করেন। বিকাল ৩টা পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া চলে।
জেলা প্রশাসনের নির্বাহী হাকিম (ট্যুরিজম সেল) মঞ্জু বিন আফনান বলেন, “ব্যবসায়ীরা নিজেরাই দোকান সরিয়ে নিয়েছেন। তাদের অনুরোধে নির্ধারিত সময়ের পরও কিছুটা সময় দেওয়া হয়েছিল।”
তিনি বলেন, “প্রথমে সৈকত এলাকা সম্পূর্ণ দখলমুক্ত করা হবে। এরপর ধাপে ধাপে পুরো সৈকত এলাকায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার কার্যক্রম চালানো হবে।”
পুনর্বাসনের বিষয়ে তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা চাইলে তাদের দাবি বা অভিযোগ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে পারেন। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করবে।

ঈদের আগে অনিশ্চয়তায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা
উচ্ছেদের ফলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। অনেকেই বলছেন, রমজান ও ঈদকে সামনে রেখে ঋণ নিয়ে ব্যবসা সাজিয়েছিলেন তারা।
ঝিনুক বিক্রেতা শহিদুল ইসলাম বলেন, “প্রশাসনের সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান দেখিয়ে আমরা নিজেরাই দোকান সরিয়েছি। কিন্তু ক্ষতি তো আমাদেরই। অনেকেই ঈদের ব্যবসার আশায় ঋণ নিয়ে দোকানে বিনিয়োগ করেছিলেন। হঠাৎ উচ্ছেদের কারণে পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষতি হয়েছে।”
ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সোহেল বলেন, “রমজান মাস, সামনে ঈদ। কিন্তু এখন দোকান সরাতে হচ্ছে। এক মাস দোকান প্রায় বন্ধ ছিল। বাচ্চাদের ঈদের কাপড় পর্যন্ত কিনতে পারিনি।”
দুই দশকে বারবার উচ্ছেদ
ঝিনুক ব্যবসায়ী আবুল হোসেন প্রায় ২২ বছর ধরে সৈকতে ব্যবসা করছেন।
তিনি বলেন, “প্রতি বছরই উচ্ছেদ করে, আবার বসতে দেয়। ভ্যান উপরে তুলি, আবার নামাই। এতে বোঝানো হয় এটা ভ্রাম্যমাণ। কিন্তু এবার মন্ত্রীর নির্দেশে একেবারে রুটিরুজি বন্ধ করে দেওয়া হল।”
তিনি বলেন, “মন্ত্রী বলেছেন, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে। কিন্তু জেলা প্রশাসন তো আমাদের কাছ থেকে রাজস্ব নিয়েছে। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত মেয়াদের কার্ড দিয়েছে। তাহলে আমরা অবৈধ হলাম কীভাবে?”

ঋণের বোঝা, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
ব্যবসায়ী মো. ফরিদুল আলম বলেন, “রমজান মাসে ছেলে-পেলে নিয়ে কোথায় যাব? ঋণ করে দোকান দিয়েছি। এখন ঋণ শোধ করব কীভাবে? জেলা প্রশাসন যে ৬০ হাজার টাকা রাজস্ব নিয়েছিল, সেটার কী হবে?”
তার দাবি, “মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই কেন এমন করা হল?”
আরেক ব্যবসায়ী মো. রাশেদ বলেন, “ঈদকে সামনে রেখে আমরা দুই-তিন লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ব্যবসা সাজিয়েছি। উচ্ছেদ করতে হলে আগে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা উচিত ছিল।”
কার্ড বেচাকেনার অভিযোগ
কিছু ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, অনেক ক্ষেত্রে কার্ডের প্রকৃত মালিক অন্য জেলার মানুষ, এমনকি রাজনৈতিক নেতা, সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী হলেও স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত টাকা দিয়ে সেই কার্ড নিয়ে ব্যবসা করছেন।
ব্যবসায়ী আব্বাস বলেন, “আমি যার কার্ডে ব্যবসা করি, সে নেত্রকোনার। রোজার আগে তিন লাখ টাকা দিয়ে কার্ডটা নিয়েছি। এখানে অনেকেই এভাবে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে কার্ড নিয়ে ব্যবসা করছে।”
৬৩০ স্থাপনা অপসারণ
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনায় গত তিন দিনে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে প্রায় ৬৩০টি স্থাপনা অপসারণ করেছে জেলা প্রশাসন।
তবে সৈকতকে ‘দখলমুক্ত’ করার এই অভিযানের মধ্যে রাজস্ব নিয়ে ব্যবসার অনুমতি দেওয়া এবং পরে সেই ব্যবসাকেই অবৈধ বলার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।
তাদের ভাষায়, প্রশাসনের এই দ্বৈত অবস্থানের মধ্যে শেষ পর্যন্ত ‘বলির পাঠা’ হয়ে যাচ্ছেন তারা; যাদের জীবিকা নির্ভর করে সৈকতের এই ছোট ছোট দোকানের ওপর।