১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

রাকসু: দুইবার ‘অডিটের’ কথা থাকলেও একবারও হয়নি

ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতারা বলছেন, যদি অডিট যথাযথভাবে হত, তাহলে ‘ভাউচার কেলেঙ্কারির’ বিষয়টি হয়ত এত বড় করে সামনে আসত না।

বিডিনিউজ২৪

আরিফুজ্জামান কোরবান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 23 Aug 2026, 11:43 PM

Updated : 16 Sep 2026, 12:59 PM

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-রাকসু গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, এক বছরের মধ্যে দুইবার ‘অডিট’ হওয়ার নিয়ম থাকলেও নির্বাচিত ছাত্রপ্রতিনিধিদের এই ফোরামের ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো তা একবারও হয়নি।   

ফলে যে অধ্যাদেশ ও গঠনতন্ত্রের আওতায় রাকসুর কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ার কথা, নির্বাচন হওয়ার পর তার বেশ কিছু বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ ওঠেছে।

শিক্ষার্থী ও ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতারা বলছেন, যদি সেটা যথাযথভাবে পালন করা হত। তাহলে ‘ভাউচার কেলেঙ্কারির’ বিষয়টি হয়ত এত বড় করে সামনে আসত না। 

বৃহস্পতিবার একটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, রাকসুর নেতারা এক কোটি ২৯ লাখ ১৪ হাজার ৬৮৯ টাকা উত্তোলন করলেও ৬১ লাখ ৫০ হাজার ৪৬৮ টাকা খরচের বিল-ভাউচার জমা দেননি।

এটিকে ‘অর্থ আত্মসাৎ’ দাবি করে রাতেই ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ সমাবেশ করে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল। পরদিন সংগঠনটির পক্ষ থেকে ক্যাম্পাসে এ ঘটনাকে ব্যাঙ্গ করে ‘ভাউচার মেলার’ আয়োজন করা হয়।

রাজশাহীসহ দেশের চারটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী পরিচালিত হয়। এই অধ্যাদেশের আওতায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বায়ত্তশাসিত হিসেবে নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করে।

অধ্যাদেশ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠার তিন বছর পর ১৯৫৬ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়ন (রাসু) নামে প্রথম ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়। পরের বছর একই নামে আরও একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নাম হওয়ার পর এখন পর্যন্ত ১৫ বার নির্বাচন হয়েছে।

সবশেষ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৫ সালের ১৬ অক্টোবর ১৭তম রাকসুর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে শিবির-সমর্থিত প্যানেল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়।

অধ্যাদেশের ১২তম অধ্যায়ে রাকসু-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় বলা হয়েছে। এর ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ছাত্র সংসদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে মেয়াদের এক বছরে দুইবার রাকসুর যাবতীয় কার্যক্রম তদারকির জন্য একটি ‘অডিট বোর্ড’ গঠন করতে হবে। 

রাকসুর সভাপতি তথা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মনোনীত দুই শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষকে নিয়ে এ বোর্ড গঠিত হবে। রাকসুর নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক (জিএস) ‘অডিট বোর্ডের’ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তবে তিনি বোর্ডের সদস্য হিসেবে গণ্য হবেন না।

কিন্তু রাকসু নির্বাচনের প্রায় ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো ‘অডিট’ কার্যক্রম হয়নি। নির্ধারিত সময়ে ‘অডিট’ না হওয়ায় রাকসুর আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও রাকসুর সভাপতি অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, “অডিট না হওয়ার পেছনে বিশেষ কোনো কারণ নেই।”

তবে রাকসুর মেয়াদ শেষে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী ‘অডিট টিমের’ মাধ্যমে সংসদের কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হবে বলে দাবি করেন তিনি।

রাকসুর কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক সেতাউর রহমান বলেন, “গঠনতন্ত্রে বছরে দুইবার অডিট করার কথা থাকলেও বাস্তবতা হল, দীর্ঘদিন রাকসু বন্ধ ছিল। আমরা নতুন করে কার্যক্রম শুরু করার পর সবকিছু বুঝে উঠতে এবং বাজেট পেতেই প্রায় ছয় মাস সময় লেগেছে। ফলে প্রথম ছয় মাসে রাকসুর কার্যক্রম সেভাবে শুরু করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী ছয় মাসে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এ কারণে নির্ধারিত সময়ে অডিট করা সম্ভব হয়নি।”

রাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাউদ্দিন আম্মার বলেন, “অডিটের বিষয়ে বারবার কর্তৃপক্ষকে বলা হয়েছে। তারা বছর শেষে অডিট করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জেনেছি। তবে আমাদের ক্ষেত্রেও কিছু বাস্তব সমস্যা ছিল। আমরা মূলত জানুয়ারির মাঝামাঝি সময় থেকে কার্যক্রম শুরু করতে পেরেছি। এ কারণে অডিটসহ কিছু কার্যক্রম সময়মত করা সম্ভব হয়নি।”

নির্ধারিত সময়ে ‘অডিট’ না হওয়ায় রাকসুর অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন।

গণতান্ত্রিক ছাত্রজোটের মুখপাত্র ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, “রাকসুর সভাপতি ও কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জবাবদিহির আওতায় রাখতে পারেননি। একই সঙ্গে বছরে দুইবার অডিট করার নিয়মও বাস্তবায়ন করা হয়নি। ফলে আলোচিত ভাউচার অনিয়মের দায় রাকসুর এই দুই কর্তাব্যক্তির ওপরও বর্তায়।”

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, “নিয়মিত অডিটের হিসাব প্রকাশ ও উপস্থাপন না করা হলে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এরই মধ্যে অর্থ ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন অনিয়ম ও অসংগতির অভিযোগও সামনে এসেছে। তাই রাকসুর অর্থ ব্যবস্থাপনা এবং বর্তমান কোষাধ্যক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সবার ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।”

ছাত্র অধিকার পরিষদের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মেহেদী মারুফ বলেন, “নিয়মিতভাবে ছয় মাস পর পর অডিট করা হলে বর্তমানে ভাউচার নিয়ে যে প্রশ্ন ও সংকট তৈরি হয়েছে, তা হয়তো এতটা বড় আকার ধারণ করত না। অডিট না হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই রাকসুর আর্থিক ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠছে।”

আরও পড়ুন: রাকসুকে ব্যঙ্গ করে ছাত্রদলের 'ভাউচার মেলা