১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

পুড়েছে বাগান, লুট হয়েছে ঘর; শঙ্কা মাথায় পাড়ায় ফিরছেন সেই পাহাড়িরা

সব কিছু নতুন করে শুরু করতে হবে তাদের। এমন বিপদে আগে কখনও পড়েননি বলে জানান তারা।

পুড়েছে বাগান, লুট হয়েছে ঘর; শঙ্কা মাথায় পাড়ায় ফিরছেন সেই পাহাড়িরা

সংঘাতের জেরে পাড়া ছেড়ে রোয়াংছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ে ওঠেন খিয়াংরা; এখন বাড়ি ফেরার প্রস্তুতিতে।

উসিথোয়াই মারমা

বান্দরবান প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 25 Apr 2023, 08:58 AM

Updated : 25 Apr 2023, 12:23 PM

বান্দরবানের রুমা উপজেলার খামতাং পাড়ায় ‘দুই সশস্ত্র সংগঠনের মধ্যে গোলাগুলি’তে আটজন নিহত হওয়ার পর আতঙ্কের মধ্যে পাড়াবাসী বাস্তুচ্যুত হওয়ার পর তাদের অনেকের বাগান পুড়িয়ে দেওয়া হয়, বাড়িঘর ভেঙে মালামাল লুট করা হয় বলেও অভিযোগ করেছেন খিয়াংরা।

পাহাড়িরা তাদের সারাবছরের জুম চাষের ফসল বাড়ির গোলায় জমা করে রাখেন; পাহাড়ের পাদদেশে বাগানের চাষ করা আনারস, কাজু বাদাম, আম, কলা, বৈচির মতো অর্থকরী ফসল বিক্রি করে দৈনন্দিন জীবন-যাপনের খরচ বহন করেন তারা।

এখন উপার্জনের উৎস নষ্ট আর খাদ্যপণ্য লুট হয়ে যাওয়ায় তাদের জীবন পড়েছে এক ঘোর অনিশ্চয়তার মধ্যে। তার সঙ্গে রাজনৈতিক বিবাদে রক্তক্ষয়ী হানহানির মতো দীর্ঘমেয়াদি আশঙ্কা তো রয়েছেই। এই দুই চূড়ান্ত বিপদ নিয়েই রুমা ও রোয়াংছড়ির আশ্রয় কেন্দ্রে থেকে বাড়ি ফিরতে শুরু করেছেন বম, মারমা ও খিয়াং সম্প্রদায়ের মানুষেরা।

গত ৭ এপ্রিল রোয়াংছড়ি ও রুমা উপজেলার মাঝামাঝি খামতাং পাড়া থেকে আটজনের লাশ উদ্ধারের পর কয়েক দিনে খামতাং পাড়া, মুয়ালপি পাড়া, পাইক্ষ্যং পাড়া, ক্যপ্লং পাড়া থেকে আটশর বেশি মারমা, বম, খিয়াং সম্প্রদায়ের মানুষ পাড়া ছেড়ে আসতে বাধ্য হয়। তারা এসে রুমা ও রোয়াংছড়ি সদর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নেন। অনেকে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতেও উঠেন।

নতুন বছরের আনন্দ উৎসব তাদের স্পর্শ করেনি এবার। বছরের প্রথম দিনটি তাদের পাড়াছাড়া আশ্রয়কেন্দ্রে মনমরা কেটেছে। ঈদের আগ থেকে ‘ভয় আর আতঙ্কের মধ্যে আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বাড়ি ফিরতে শুরু করেছেন পাড়াবাসী।

রুমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয় কেন্দ্রে থাকা ২৪ খিয়াং পরিবার ঈদের আগে বাড়ি ফিরে গেছে। মঙ্গলবার রোয়াংছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বাড়ি ফেরার কথা রয়েছে ২৭ খিয়াং পরিবারের।

আগামী বৃহস্পতিবার রুমার মারমা ওয়েল ফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন কমিউনিটি সেন্টার আশ্রয় নেওয়া ৫০টি মারমা পরিবারের বাড়ি ফেরার কথা রয়েছে বলে জানালেন রুমা সাঙ্গু কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও মারমা ওয়েলফেয়ার অ্যাসেসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সুইপ্রুচিং মারমা।

Image

সংঘাতের জেরে পাড়া ছেড়ে রোয়াংছড়ি উচ্চ বিদ্যলয়ে ওঠেন খিয়াংরা।

সোমবার বিকালে রোংয়াংছড়ি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, আশ্রয়ে থাকা খিয়াং জনগোষ্ঠীর লোকজন ১৭ দিন পর বাড়িতে ফিরতে পারবেন এমন খবরে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন। কিন্তু সবার চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ।

তারা অভিযোগ করে বলেন, পাড়া থেকে পালিয়ে আসার পর তাদের ঘরবাড়িতে থাকা সব জিনিসপত্র লুটপাট হয়েছে। পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ফলদ বাগান। এমনকি ঘরে থাকা কুকুর পর্যন্ত নাই হয়ে গেছে।

খামতাং পাড়া কারবারি (পাড়াপ্রধান) অংসুইহ্লা খিয়াং বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, রোয়াংছড়ি ও রুমা দুই উপজেলার তিন মৌজা মিলে খামতাং পাড়ায় মোট ৯৭ পরিবার রয়েছে। তার মধ্যে ৭ এপ্রিল পালিয়ে এসে রোয়াংছড়ি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে আশ্রয়ে নেয় ৫৩ পরিবারের ২০৫ জন।

“রুমার দিকে চলে গেছে ৪৪ পরিবার। তার মধ্যে বম কমিউনিটি সেন্টারে আশ্রয় নেয় ২৪ পরিবার। বাকি ২০ পরিবার যার যার মত আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি গিয়ে আশ্রয় নেয়।

“তবে ৮ এপ্রিল থেকে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নেওয়ার পর বর্তমানে আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছে ২৭ পরিবারের ৯৩ জন।

সোমবার সকালে রোয়াংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোরশেদ আলম চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করেন খিয়াং সম্প্রদায়ের নেতারা। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছে, মঙ্গলবার সকালে বাকি ২৭ পরিবারও চলে যাবে। প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের সব ধরনের নিরাপত্তার ব্যবস্থার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

কারবারি অংসুইহ্লা খিয়াং অভিযোগ করেন, “পালিয়ে আসার পর ঘরের সব জিনিসপত্র কে বা কারা লুট করে নিয়েছে। কয়েকদিন আগে প্রশাসন ও সেনবাহিনীর অনুমতি নিয়ে আমাদের পাঁচ-ছয় জনের একটি দল পাড়ায় গিয়েছিল।

“গিয়ে দেখি, সবার ঘরের দরজা-জানালা খোলা। সব জিনিসপত্র লুট করা হয়েছে। ফলদ বাগান পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বাড়ি ফিরে যেসব জিনিস বিক্রি করে চলব সেসব আয়ের উৎসগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।

“সবার ঘরে চাল, হাঁস-মুরগি, শুকর, কবুতর, আদা, হলুদ এমনকি ঘরে কুকুর পর্যন্ত চুরি হয়েছে। বিপদে পড়ে পালিয়ে যেতে হয়েছে। ঘরে ফিরে যে কিছু খাব সে উপায়ও নেই। সব কিছু নতুন করে শুরু করতে হবে। এরকম বিপদ এর আগে কখনও মুখোমুখি হয়নি। নিরূপায় হয়ে ভয় নিয়ে আবার ফিরতে হচ্ছে। উভয়দিকে বিপদ”, বলেন পাড়াপ্রধান।

খামতাং পাড়ায় সবচেয়ে ক্ষতি হয়েছে হমপি খিয়াং নামে এক বাসিন্দার। সোমবার বিকালে তিনি আশ্রয় কেন্দ্রে ছিলেন না।

কারবারি অংসুইহ্লা খিয়াং বলেন, “আগামীকাল বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য কিছু বাজার করতে গেছেন হমপি। আগুনে তার আনারস চারা ৩০০টি, লিচু গাছ ৫০টি, রাংগোয়ে প্রজাতির আম ১০০টি এবং কাজু বাদাম ১০০টি গাছ সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। এ ক্ষতি তিনি সহজে কাটিয়ে উঠতে পারবেন না।”

অংসুই খিয়াং নামে পাড়ার আরেক বাসিন্দা বলেন, “আমার বাগানে রাংগোয়ে প্রজাতির ২০০টি আম গাছ, কাজু বাদাম ২০০টি গাছ, পাইন্যাগুলা (বৈঁচি) ৩০টি সব পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। দুই আড়ি জুমধান কাটা হয়েছিল। কিন্তু এখনও আগুন দিতে পারিনি। বেশি দেরি হয়ে গেছে।

“একদিকে ফলদ বাগান আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে ঘরের সব জিনিসপত্র চুরি হয়েছে। পাড়াবাসীর সবাই এখন পথে বসার মত অবস্থা।”

Image

পাড়া ছেড়ে রোয়াংছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ে ওঠা খিয়াংরা প্রায় এক মাস পর বাড়ি ফেরার প্রস্তুতিতে।

সত্তর বছর বয়সী অংসাজাই খিয়াং বলেন, “ছেলেমেয়েরা আলাদা হয়েছে। তিনজনের পরিবারে দুই আড়ি কাজু বাদামের একটা বাগান ছিল। কে বা কারা পুড়িয়ে দিয়েছে জানি না। আগামীকাল ঘরে ফিরব ঠিকই কিন্তু প্রধান সমস্যা হল খাবার। সব তো চুরি হয়েছে। ঘরে ফিরেই খাব কী?”

পাড়ার অনেক বাসিন্দা চুরি, লুটপাটের ঘটনায় অবাক হয়েছেন বলে জানান।

তারা বলেন, পাহাড়ি সমাজে সাধারণত চুরির ঘটনা ঘটে না। পাহাড়িদের অনেক বাড়িঘর সবসময় খোলা থাকে। কিন্তু এরকম বিপদের দিনে ঘরের জিনিসপত্র চুরি হওয়া ও বাগান পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা তাদের হতবাক করেছে।

যেভাবে সম্পদ নষ্ট হয়েছে তা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে বলে জানান পাড়াবাসী।

এদিকে পালিয়ে থাকায় লেখাপড়ায় ক্ষতি হয়েছে জানিয়ে রোয়াংছড়ি সরকারি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ক্রাবাই খিয়াং বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি ও আমার ভাই ছুটিতে বাড়িতে যাই। সে সময় গোলাগুলি পরিস্থিতির কারণে পরিবারের সঙ্গে এখানে পালিয়ে আসতে হয়েছে। এ অবস্থায় হোস্টেলে গিয়ে উঠব সে পরিস্থিতিও ছিল না। হোস্টেল এখনও বন্ধ। আমাদের খুব মানসিক চাপ বেড়েছে। জীবনে এরকম বিপদজনক পরিস্থিতি কখনও পড়িনি।

আশ্রয় কেন্দ্রে কেমন ছিলেন এমন প্রশ্নের জবাবে কারবারি অংসুইহ্লা খিয়াং বলেন, গরমে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। বিশেষ করে শিশুরা সর্দি-জ্বরে ভুগেছে। তবে উপজেলা সদরে থাকায় চিকিৎসা ও সবার সহযোগিতা পেয়েছে।

বাগান পুড়িয়ে দেওয়া ও বাড়িঘরে লুটপাটের কথা নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ পুলিশকে অবহিত করলেও কোনো অভিযোগ দেননি বলে জানিয়েছেন রোয়াংছড়ি থানা ওসি আব্দুল মান্নান।

পাড়াবাসীর ফিরে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “মঙ্গলবার তারা নিজেদের পাড়ায় ফিরে যাবে বলে শুনেছি। আশ্রয় কেন্দ্রে তারা যতদিন ছিল আমরা সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা দিয়েছি। তাদের যে কোনো সুবিধা-অসুবিধা আমরা আন্তরিকতার সঙ্গে দেখেছি।”

রোয়াংছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে নিরাপত্তায় দায়িত্বে থাকা পুলিশের এসআই নতুন চন্দ্র চাকমা বলেন, “পালিয়ে আসার পর পুলিশের পক্ষ থেকে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা পুলিশের নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছিল। স্কুলের একটি কক্ষ নিয়ে ছয়জন পুলিশ সার্বক্ষণিক পাহারায় ছিল। বাইরে থেকে কেউ এলে অথবা আশ্রয়কেন্দ্রের কেউ বাইরে গেলে সবসময় পর্যবেক্ষণে রাখা হত।”

যোগাযোগ করা হলে রোয়াংছড়ির ইউএনও (রুমা উপজেলারও দায়িত্বপ্রাপ্ত) খোরশেদ আলম চৌধুরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আশ্রয়ে থাকা লোকজন মঙ্গলবার নিজেদের পাড়ায় ফিরছে। যাতায়াতের জন্য প্রশাসনে পক্ষ থেকে ব্যবস্থা করা হয়েছে।

“তাদেরকে বলে দেওয়া হয়েছে, কোনো কিছু প্রয়োজন হলে প্রশাসনকে জানাতে। যে কোনো পরিস্থিতির জন্য তারা চাইলে উপজেলা সদরে এসে আশ্রয় নিতে পারবে।”

গত বছরের অক্টোবর থেকে রুমা ও রোয়াংছড়ি উপজেলায় কেএনএফ, স্থানীয়ভাবে ‘বম পার্টি’নামে পরিচিত, এবং নতুন জঙ্গি সংগঠন ‘জামাতুল আনসার হিল ফিন্দাল শারক্বীয়া’র বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান চালাচ্ছে সেনাবাহিনী ও র‌্যাব। কখনও কখনও তাদের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনাও ঘটে।

এর জের ধরে জানুয়ারির শেষে রুমার কয়েকটি পাড়া থেকে মারমা ও বম জাতিগোষ্ঠীর লোকজন গহীন পাহাড়ের বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে শহরে চলে আসেন। সেসময় পাইন্দু ইউনিয়নের অন্তত ৫১টি মারমা ও ২০টি বম পরিবার সবকিছু ফেলে রুমা বাজারের মারমা ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের হল রুমে এবং বম কমিউনিটি সেন্টারে আশ্রয় নেয়। চার-পাঁচদিন পরে তারা আবার পাড়ায় ফিরে যায়।

মার্চের শুরুর দিকে অভিযানের মধ্যে ‘আতঙ্কে’ রুমা ও আশপাশের এলাকা থেকে ৩০০ থেকে ৪০০ মানুষ সীমান্ত পার হয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়। অন্তত ছয়টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সে সময় বন্ধ হয়ে যায়।