নদী ভাঙন: কুড়িগ্রামে স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁশের বাঁধ নির্মাণে রক্ষা ৪০০ পরিবার
ভিটে বাড়ি রক্ষায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি নদী তীরের বাসিন্দাদের।
কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার জিঞ্জিরাম নদীর ভাঙন ঠেকাতে স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁশ দিয়ে নির্মিত বাঁধ ও বালু ভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে প্রতিরোধ গড়া হয়েছে। এতে নদীর আগ্রাসন থেকে এবার রক্ষা পেয়েছেন অন্তত ৪০০ পরিবার। তবে ভিটে বাড়ি রক্ষায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি ভুক্তভোগীদের।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, “স্থানীয় চাহিদার ভিত্তিতে জরুরি জিও ব্যাগ সরবরাহ করেছি। স্বেচ্ছাশ্রমে জিও ব্যাগ ও বাঁশ দিয়ে টেকসই বান্ডাল তৈরি করেছেন স্থানীয়রা। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছি; বরাদ্দ পেলে স্থায়ী বাঁধের ব্যবস্থা করা হবে।”
উপজেলার সায়দাবাদ ঘাট থেকে বকবান্ধা ব্যাপারীপাড়া যেতে নৌকায় লাগে প্রায় ৪০ মিনিট। সড়কপথ নেই বললেই চলে। ভারতের আসাম থেকে নেমে আসা জিঞ্জিরাম নদী এখানকার মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান ভরসা।
নদীর দুই তীরে সরিষা, মাসকলাই ও ভুট্টার খেত। নদীকেন্দ্রিক জীবনই এখানকার মানুষদের বাস্তবতা। কিন্তু এই নদীই মাঝে মাঝে হয়ে ওঠে ভয়ংকর। নদী ভাঙনে ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব অনেক পরিবার।
উজানে অতিবৃষ্টি বা সামান্য বৃষ্টিতেই পাহাড়ি ঢল নেমে ভাটিতে নদী আগ্রাসী হয়ে ওঠে। যাদুরচর ইউনিয়নের বকবান্ধার অনেক ঘরবাড়ি, জমিজমা, বছরের পর বছর ধরে ভাঙনে হারিয়ে গেছে। তবে স্থানীয়দের কাছে নদী ভাঙন নতুন নয়।
বিগত বছরগুলোতে নদী ভাঙনে ক্রমেই বদলে যাচ্ছে এ জনপদের মানচিত্র। সরকারের কার্যকরী উদ্যোগ না থাকলেও গত বছরের শেষ দিকে স্থানীয়দের নিয়ে শুরু হওয়া এক উদ্যোগ বদলে দেয় তাদের আশঙ্কা।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আরডিআরএস বাংলাদেশের ট্রোসা-২ প্রকল্পের সহায়তায় নদীতীরের মানুষ এক বৈঠকে বসে সিদ্ধান্ত নেন- বড় বাঁধ নয়, দ্রুত কার্যকর ও কম খরচে বাঁশের বান্ডাল বসানো হবে। স্থানীয়দের চাঁদা, ইউনিয়ন পরিষদের অনুদান ও প্রকল্পের কারিগরি সহায়তায় ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে ৬০০ মিটার এলাকায় ২৭টি বাঁশের বান্ডাল বসানো হয়। এতে স্রোতের চাপ তীরে কমে আসে।
তবে শুধু বান্ডাল যথেষ্ট নয়- এ কথা বুঝতে সময় লাগেনি। বর্ষার স্রোত ও নৌযান চলাচলে বান্ডাল দুর্বল হয়ে পড়ে। পরে স্থানীয় ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল পানি উন্নয়ন বোর্ডে জিও ব্যাগের আবেদন জমা দেয়। জুলাইয়ে জিও ব্যাগ সরবরাহ হলে স্বেচ্ছাশ্রমে স্থানীয়রা বান্ডালের পাশে আরও শক্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, বাঁশের বান্ডাল ঘিরে নদীর তীরে সবজি লাগাচ্ছেন ব্যাপারী পাড়ার আকিয়া বেগম (৬৫)। তিনি বলেন, “এক বছরে দুই বিঘা জমি ভাঙি নিছে। রান্না ঘর ভেঙে আঙিনায় ভাঙন নাগছিল, পরে বান্ডাল দেওয়ায় ভাঙন থেমেছে।”
একই এলাকার আতাউর রহমান (৫৫) ও আহম্মদ আলী (৬০) বলেন, স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মাণ করা বান্ডালের কারণে এবার তারা নদী ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দা আনজু বেগম (৫০) বলেন, “ধনি-গরিব সব ঘর থেইকা টাকা তুলছি। ১০ টাকা হোক আর হাজার টাকা। এভাবে ৫০ হাজার টাকা ওঠে। ইউনিয়ন পরিষদ আরও এক লাখ টাকা দেয়। স্বেচ্ছাশ্রমে বান্ডাল বানাইছি।”
প্রবীণ বাসিন্দা গুলু মিয়া (৭০) বলেন, “বাপ-দাদার ১০ বিঘা জমি আছিল। ভাঙতে ভাঙতে এহন শুধু বসতভিটা আছে। তবে বান্ডাল দেওয়ার পর এ বছর আর ভাঙে নাই।”
স্থায়ী বাঁধ না থাকায় বকবান্ধা নামাপাড়া ও ব্যাপারীপাড়ার অন্তত ৪০০ পরিবারের দুই হাজার মানুষ এখনো ভাঙনের ঝুঁকিতে আছেন। হুমকিতে আছে স্থানীয় বাজার, দুটি মসজিদ, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ঈদগাহ মাঠ ও কবরস্থান।
বকবান্ধা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ময়নাল হক বলেন, “উজানের পানির চাপ ঠেকাতে স্থায়ী বাঁধ দরকার। তবে বান্ডাল নির্মাণের ফলে চলতি বছর এখানকার মানুষ নদীর আগ্রাসন থেকে রক্ষা পেয়েছেন।”
ট্রোসা-২ প্রকল্পের সহকারী কর্মকর্তা আবদুর রহিম খন্দকার বলেন, “স্থানীয়দের উদ্যোগকে টেকসই করতে আমরা আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দিয়েছি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের জিও ব্যাগ, প্রকল্পের পরামর্শ আর স্বেচ্ছাশ্রম মিলে এখন তীরটা অনেকটাই ভাঙনমুক্ত।”
