১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

সুনামগঞ্জ হাসপাতাল: ৬৫% জনবল নেই, ‘কাঙ্ক্ষিত সেবা’ অধরা

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক বলেন, “প্রত্যন্ত হাওর এলাকার হাসপাতাল এটি। বাইরের ডাক্তাররা এসে বেশিদিন থাকেন না।”

শামস শামীম

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 27 Nov 2025, 10:34 AM

Updated : 26 Aug 2026, 05:12 PM

সুনামগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালে সরকার নির্ধারিত জনবল ৩৯৬ জনের। এর মধ্যে ২৫৪টি পদ শূন্য রয়েছে, আছেন মাত্র ১৪২ জন। অর্থাৎ মোট জনবলের প্রায় ৬৫ শতাংশই অনুপস্থিত।

এদের মধ্যে সবেচেয়ে বেশি শূন্য পদ রয়েছে বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ চিকিৎসকের। অনেক টেকনোলজিস্টের পদও শূন্য। ফলে হাসপাতালে ‘কাঙ্ক্ষিত সেবা’ মিলছে না বলে রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ।

তারা বলছেন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় রোগী একটু জটিল হলেই তাদেরকে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হচ্ছে। এটা যেন অনেকটাই ‘রুটিন ওয়ার্ক’। এতে পথেই রোগীর মৃত্যু হচ্ছে, রোগীর চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে; কিংবা চিকিৎসা না করিয়েই অনেককে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে। 

সুনামগঞ্জ হাওর অধ্যুষিত জেলা। দরিদ্র মানুষের সংখ্যাই এ জেলায় বেশি। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসা ব্যবস্থাও অনেকটা নড়বড়ে। ফলে জীব বাঁচাতে জেলা শহরের দিকে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা যায়।

কিন্তু জেলার মূল হাসপাতালে চিকিৎসা না পাওয়ায় অনেকে বাধ্য হয়ে বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন। এগুলোর মানও বিশেষ উন্নত না। ফলে রোগীদের বাধ্য হয়েই পাশের সিলেটে যেতে হচ্ছে।    

সুনামগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মাহবুবুর রহমান বলেন, “প্রত্যন্ত হাওর এলাকার হাসপাতাল এটি। বাইরের ডাক্তাররা এসে বেশিদিন থাকেন না। স্থানীয় চিকিৎসকরা না আসলে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া সম্ভব না। আমরা প্রতি মাসেই লোকবল পূরণের জন্য স্বাস্থ্য অধিপ্তরকে চিঠি দিচ্ছি।”

জনবল ঘাটতি

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখানে সিনিয়র কনসালটেন্টের ১১টি পদের মধ্যে সাতজনের পদই শূন্য রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। জুনিয়র কনসালটেন্ট ১২টির মধ্যে ছয়টি শূন্য, অ্যানেস্থেটিস্ট চারটির মধ্যে তিনটি শূন্য, অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জন ১২টির মধ্যে ছয়টি শূন্য রয়েছে।

শূন্য রয়েছে- ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসারের চারটির মধ্যে দুটি, মেডিকেল অফিসার ১৭টির মধ্যে ১৩টি, প্যাথলজিস্ট ও রেডিওলজিস্ট একজনের মধ্যে একজন এবং সিনিয়র স্টাফ নার্স ২২৬টির মধ্যে ১৪১টি।

এ ছাড়া স্টাফ নার্স ১১ জনের মধ্যে আটজন নেই, মিডওয়াইফ ১২ জনের মধ্যে নয়জন নেই, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ১১ জনের মধ্যে তিনজন নেই, অ্যাসিস্ট্যান্ট নার্স পাঁচজনের কেউ নেই।

১১টি আয়ার পদ থাকলেও এখন কেউ নেই। নয়জন দারোয়ানের কেউ নেই। এমএলএসএস ২০টির মধ্যে ১৩টিই শূন্য, ক্লিনিং স্টাফ ১৯টির মধ্যে ১৬টিই শুন্য এবং ওয়ার্ডবয় ১১টির মধ্যে ১১টি পদই শূন্য রয়েছে।

ভুক্তভোগী রোগী, তাদের স্বজন ও সচেতন নাগরিকরা বলেন, হৃদরোগ, মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণ বা দুর্ঘটনায় জটিল আঘাতপ্রাপ্তরা প্রথমেই সদর হাসপাতালে আসেন। কিন্তু সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় তাৎক্ষণিক সিলেটে স্থানান্তর করে দেওয়া হয়। এতে পথেই অনেক রোগী মারা যাচ্ছেন। যদি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এখানে নিয়মিত থাকত তাহলে অনেককে বাঁচানো সম্ভব হত।

‘আসপাতালো আইলেও ভালা চিকিৎসা পাই না’

সদর উপজেলার সদরগড় গ্রামের দিনা বেগম (৫০) অক্টোবর মাসে হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের নারী ওয়ার্ডে ১৭ নম্বর বিছানায় চিকিৎসাধীন ছিলেন। তিনি বলেন, “হাসপাতালে গেছি ভালা ডাক্তরেরের চিকিৎসার লাগি। গিয়া শুনি বড়ো ডাক্তার নাই। নার্সরা কইছইন বড় ডাক্তর (বিশেষজ্ঞ) হাসপাতালে নাই।”

একই ওয়ার্ডের ১৬ নম্বর বেডে সেসময় চিকিৎসাধীন সদর উপজেলার বনগাঁও গ্রামের আজিমুন নেসা বলেন, “আমি গরিব মানুষ। পরতি মাসে আসপাতালে ভর্তি অউয়া লাগে। ইবার আওয়ার পর ভালা চিকিৎসা পাইছি না। ওষুধ বাইর থাইক্যা কিনছি। খাওনও ভালা না। আসপাতালো আইলেও ভালা চিকিৎসা পাই না।”

প্রায় একই কথা বলেন সদর উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামের আমিরুল হক। তিনি বলেন, “হাসপাতালে একটু বড় অসুখ নিয়ে আসলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পাই না। অ্যাক্সিডেন্ট, হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের রোগীদের নিয়ে আসলে সিলেটে রেফার করে দেয়। যারা কর্তব্যরত আছেন তারাও এসব রোগীদের ধরেন না। এ কারণে রেফার্ড করা রোগী পথেই মারা যায়।”

সুনামগঞ্জ শহরের আরপিন নগরের বাসিন্দা রওনক বখত বলেন, “সদর হাসপাতাল নামেই ২৫০ শয্যার। জরুরি প্যাথলজিক্যাল টেস্ট করা যায় না। ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসারের অভাবে কাঙ্ক্ষিত জরুরি চিকিৎসাও মিলে না। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সেবা পাওয়া তো বহু দূরের ব্যাপার। ২৫০ শয্যার হাসপাতালে ১০০ শয্যার জনবলও নাই। এ কারণে আমাদের প্রত্যন্ত এলাকার রোগীরা উন্নত সেবা পাচ্ছে না।”

তবে হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক রফিকুল ইসলাম বলেন, “আমরা ইনডোর ও আউটডোরে কাঙ্ক্ষিত সেবা দিচ্ছি। তবে চিকিৎসক, নার্সসহ অন্যান্য জরুরি কিছু পদে লোকবলের অভাবে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।”