২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬ আশ্বিন ১৪৩৩

ছয়জনকে গ্রেপ্তারের পর আরও অনেক চীনা-তাইওয়ানিজকে খুঁজছে কক্সবাজার পুলিশ

তারা এপ্রিল থেকে কয়েকটি রিসোর্ট ভাড়া নেওয়া শুরু করেছিলেন বলে গোয়েন্দা অনুসন্ধানে জানা গেছে।

বিডিনিউজ২৪

সৌরভ দেব, কক্সবাজার প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 05 Sep 2026, 12:24 AM

Updated : 19 Sep 2026, 02:30 PM

কক্সবাজারে অনলাইনে আর্থিক প্রতারণার অভিযোগে চীনা ও তাইওয়ানি নাগরিকদের একটি বড় দলের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে ছয়জনকে গ্রেপ্তারের পর আরও অনেককেই খুঁজছে পুলিশ।

বৃহস্পতিবার রাতে পুলিশ যে মামলা করেছে সেখানে আসামির তালিকায় জেলা শহরের হোটেল সি-প্যালেস থেকে গ্রেপ্তার ছয় জনসহ ১০ জনের নাম রয়েছে। এছাড়া অজ্ঞাত পরিচয়ের ২৫০ থেকে ৩০০ চীনা ও তাইওয়ানি নাগরিককে আসামি করা হয়েছে।

শুক্রবার গ্রেপ্তার ছয় জনকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয় বলে জানিয়েছেন রামু থানার ওসি এ কে ফজুল হক। 

পুলিশের দাবি, প্রতারক দলটি অনেক সদস্য ২৬ অগাস্ট রামুর হিমছড়ির একটি রিসোর্টে পুলিশের অভিযানের পর কক্সবাজারের বিভিন্ন হোটেলে ছড়িয়ে পড়েছেন। তাদের শনাক্ত ও আটকে অভিযান চলছে।

পুলিশের এজাহার অনুযায়ী, ওই চীনা ও তাইওয়ানি নাগরিকদের অনেকে ভিসা অন অ্যারাইভাল নিয়ে ১ মার্চ থেকে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। তারা এপ্রিল থেকে কয়েকটি রিসোর্ট ভাড়া নেওয়া শুরু করেছিলেন বলে গোয়েন্দা অনুসন্ধানে জানা গেছে।

ওসি ফজুল হক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, পুরো দলের মধ্যে এখন পর্যন্ত ছয়জনকে আটক করা হয়েছে। অন্যদের আটকের চেষ্টা চলছে।

তার ভাষ্য, পুলিশের অভিযান সম্পর্কে আঁচ করতে পেরে দলের অন্য সদস্যরা বিচ্ছিন্নভাবে পালিয়ে যান এবং কক্সবাজারের বিভিন্ন হোটেলে অবস্থান নিয়েছেন।

রামু থানার ওসি ফজুল হকের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের একটি অংশ কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন হোটেলে অবস্থান নিয়েছেন।

তিন হোটেলে অবস্থানের তথ্য

সম্প্রতি কক্সবাজার শহরের অন্তত তিনটি হোটেলে চীনা নাগরিকদের দলবদ্ধভাবে অবস্থানের তথ্য পেয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

সুগন্ধা এলাকার হোটেল রয়েল পার্ল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত এক মাসে সেখানে অন্তত ২০ জন চীনা নাগরিক অবস্থান করেছেন।

তাদের মধ্যে সাতজনের একটি দল ২৭ অগাস্ট হোটেলটিতে ওঠে এবং ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অবস্থান করে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

অর্থাৎ, ২৬ অগাস্ট রামুর হিমছড়িতে পুলিশের অভিযানের পরদিনই চীনা নাগরিকদের একটি দল কক্সবাজার শহরের এই হোটেলে অবস্থান নেয়।

সুগন্ধার কাছাকাছি আরেক হোটেল স্যান্ড সিটি কর্তৃপক্ষও একই ধরনের একটি দলের কথা জানিয়েছে।

হোটেল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, ২৫ অগাস্ট প্রায় ২০ জনের একটি দল সেখানে আসে। তারা একদিন অবস্থান করে এবং পরে আরও থাকতে চেয়েছিল। কিন্তু আগে থেকেই বুকিং থাকায় তাদের আর রাখা সম্ভব হয়নি।

কক্সবাজারের হোটেল সি-প্যালেস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২৬ অগাস্ট সেখানে চীনা নাগরিকদের একটি দল ওঠে। ওই দলের ছয়জনকে বৃহস্পতিবার রাতে আটক করে পুলিশ।

পুলিশের ভাষ্যের সঙ্গে হোটেল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য মিলিয়ে দেখা গেল, অগাস্টের শেষ সপ্তাহে কক্সবাজারের বিভিন্ন হোটেলে চীনা নাগরিকদের একাধিক দলের আসা-যাওয়া ছিল।

তবে এসব হোটেলে অবস্থানকারী প্রত্যেক ব্যক্তি একই অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন কি-না, তা এখনও নিশ্চিত নয়।

কোথা থেকে শুরু হয় অভিযান

পুলিশ জানিয়েছে, রামুর হিমছড়ি এবং উখিয়ার ইনানী-মেরিন ড্রাইভ এলাকায় কয়েকটি রিসোর্ট ও আবাসিক স্থাপনায় ২৫০ থেকে ৩০০ জনের মতো চীনা ও তাইওয়ানি নাগরিক অবস্থান করছিলেন।

তাদের মধ্যে কয়েকজন দীর্ঘ সময় ধরে রিসোর্ট ভাড়া নিয়ে নিজেদের মতো করে সেগুলোর ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করছিলেন বলে এজাহারে বলা হয়েছে।

গোয়েন্দা অনুসন্ধানের বরাতে পুলিশ বলেছে, হিমছড়ির মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্টের একটি বড় হলরুমে কম্পিউটার ল্যাব এবং একটি সাউন্ডপ্রুফ রুম তৈরি করা হয়েছিল। সেখানে বিপুলসংখ্যক আইফোন, কম্পিউটার ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম ব্যবহার করা হচ্ছিল।

২৬ অগাস্ট ওই রিসোর্টে অভিযান চালায় পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের একটি দল।

পুলিশ বলছে, অভিযানের বিষয়টি আঁচ করতে পেরে সেখানে থাকা চীনা ও তাইওয়ানি নাগরিকদের কয়েকজন রিসোর্টের পেছনের খোলা সৈকত এলাকা দিয়ে পালিয়ে যান।

অভিযানে রিসোর্টের একটি অবরুদ্ধ হলরুম থেকে এক হাজার ৯৩৮টি আইফোন, ৫০টি মনিটর, ৪৪টি সিপিইউ, ৩০টি কিবোর্ড, দুটি ল্যাপটপ, দুটি প্রিন্টার, ৪০টি মাউস, একটি আইপিএস, ২৪টি কানেকশন বোর্ডসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।

এ ছাড়া চীনা পুলিশের র‍্যাংক ব্যাজ, পুলিশ লোগোযুক্ত টাই এবং চীনের জাতীয় পতাকাও পাওয়ার কথা এজাহারে বলা হয়েছে।

হিমছড়ির মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্টে অভিযানে এসব সরঞ্জাম উদ্ধারের পর চীনা দূতাবাসের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।

মিথ্যা তথ্য দিয়ে রিসোর্ট ভাড়া

পুলিশের তদন্তসংশ্লিষ্ট নথিতে এই দলটির বিরুদ্ধে অনলাইনভিত্তিক আর্থিক প্রতারণার অভিযোগ আনা হয়েছে।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, চীনা ও তাইওয়ানি নাগরিকদের এই চক্র কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি, ভুয়া প্রোফাইল এবং ক্লোন বা ভুয়া ট্রেডিং প্ল্যাটফর্মের লোগো ব্যবহার করে প্রতারণা চালাতে পারে।

তবে একই নথিতে ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষা করার প্রয়োজনের কথা বলা হয়েছে। ফলে কীভাবে, কাদের সঙ্গে এবং কত পরিমাণ অর্থের প্রতারণা করা হয়েছে, এসব বিষয়ে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই বলেছে পুলিশ। 

পুলিশ বলছে, বিদেশি নাগরিকদের একটি অংশ বাংলাদেশে নির্মাণ কোম্পানি প্রতিষ্ঠার কথা বলে রিসোর্ট ভাড়া নিয়েছিল। তবে তাদের দেওয়া তথ্য যাচাই করে ওই নামে কোনো নির্মাণ কোম্পানির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে এজাহারে দাবি করা হয়েছে।

এজাহারে আরও চারজনের নাম

গ্রেপ্তার ছয়জনের পাশাপাশি আরও চারজন পলাতক আসামির কথা মামলায় বলা হয়েছে।

তারা হলেন- ঝান ইউয়ান ফান ওরফে বাবর আলী, পাই লেডিং, উ ঝিপিং ও জিয়ান ঝাং। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

আগের খবর:

অনলাইন প্রতারণা: দুই হাজার আইফোনসহ কক্সবাজারে ৬ চীনা নাগরিক আটক