পদ্মা সেতু: শরীয়তপুরবাসীর অপেক্ষা এখনই ফুরাচ্ছে না

পদ্মা সেতু চালু হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের জনপদ উপকৃত হবে; কিন্তু ভালো সংযোগ সড়ক না থাকায় এর পুরো সুফল পেতে আরও অপেক্ষায় থাকতে হবে মাত্র ২৭ কিলোমিটার দূরের শরীয়তপুরবাসীকে।

কে এম রায়হান কবীর শরীয়তপুর প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 24 May 2022, 07:27 AM
Updated : 24 May 2022, 08:21 AM

৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু চালু হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৯টি জেলার সঙ্গে ঢাকার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হবে। ২৫ জুন এই সেতু চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।

মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্ত থেকে পদ্মা সেতু গিয়ে মিলেছে শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার নাওডোবা প্রান্তে। কিন্তু নাওডোবা থেকে শরীয়তপুর পর্যন্ত যাতায়াতের জন্য প্রশস্ত সড়ক নেই। ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কটি ভাঙাচোরা ও অপ্রশস্ত।

শরীয়তপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) নির্বাহী প্রকৌশলী ভূঁইয়া রেদওয়ানুর রহমান বলেন, সেতুর সংযোগ সড়ক থেকে শরীয়তপুর জেলা শহর পর্যন্ত ২৭ কিলোমিটার চার লেন করতে জমি অধিগ্রহণ জটিলতায় অনেক জায়গায় কাজ করতে পারছে না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। যেখানে সরকারি খাস জমি পাওয়া গেছে, সেসব জায়গাতেই শুধু কাজ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

জাজিরার নাওডোবা থেকে শরীয়তপুর জেলা শহর পর্যন্ত ২৭ কিলোমিটার চার লেন সড়ক নির্মাণ প্রকল্প কয়েক বছর আগে অনুমোদন পায়। এক হাজার ৬৮২ কোটি টাকার প্রকল্পটি ২০২৪ সালের ৩০ জুন নাগাদ বাস্তবায়ন করার কথা জানিয়েছে সওজ। রাস্তা তৈরির জন্য জেলা প্রশাসনের জমি অধিগ্রহণ কাজ শুরু হয় গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে।

পদ্মা সেতু-শরীয়তপুর সংযোগ সড়কের ২৭ কিলোমিটার রাস্তা তিনটি প্যাকেজে নির্মাণ করা হবে। বর্তমানে সড়কটি দুই লেনের হলেও জমি অধিগ্রহণ হচ্ছে চার লেনের জন্য, পরবর্তীতে আরও দুই লেন বাড়ানো হবে।

তিনটির মধ্যে একটি প্যাকেজে শরীয়তপুর ফায়ার সার্ভিস অফিস থেকে জাজিরা পর্যন্ত ১৩ কিলোমিটারের সড়ক নির্মাণের জন্য ১৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে দরপত্র আহ্বান করেছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। দরপত্র আহ্বান করার পর এ প্রকল্পের শুধু ৬০ ভাগ জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এ ছাড়া আর কোনো কাজেই হাত দেয়নি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

আরেকটি দরপত্র আহ্বানের কাজ প্রক্রিয়াধীন আছে এবং আরেকটি প্যাকেজের দরপত্র সংক্রান্ত কাজ ধরাই হয়নি বলে জানান নির্বাহী প্রকৌশলী ভূঁইয়া রেদওয়ানুর রহমান।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সেতুর দক্ষিণ প্রান্তের জাজিরার নাওডোবা থেকে শরীয়তপুরের জেলা শহর পর্যন্ত অপ্রশস্ত ও ভাঙাচোরা সড়কটিতে দুটি গাড়ি পাশাপাশি চলার উপায় নেই। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জুনেই যানবহান চলাচলের জন্য সেতু খুলে দেওয়া হলেও, এই রাস্তাটি দিয়ে শরীয়তপুরের মানুষের চলাচল কঠিন হয়ে পড়বে। 

ফোর লেন কাজের তেমন অগ্রগতি না হওয়ায় পদ্মা সেতুর সুফল থেকে আপাতত বঞ্চিত হবে জেনে হতাশা ও ক্ষোভের কথা জানিয়েছেন শরীয়তপুর জেলার মানুষ।

সেতু কোনো কাজে আসবে না জানিয়ে শরীয়তপুর জেলা বাস মালিক গ্রুপ লাইনের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন বেপারী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে ভাঙাচোরা এবং অপ্রশস্ত রাস্তা দিয়ে কোনোরকমে গাড়ি চালিয়ে যাত্রী সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

"পদ্মাসেতুর সঙ্গে অন্যান্য জেলার সংযোগ সড়কের কাজ শেষে হলেও আমাদের শরীয়তপুরের এখনও সংযোগ সড়ক ও ফোর লেনের কাজ হয়নি, যার ফলে পদ্মা সেতু উদ্বোধন হলেও আমরা যাত্রীদের ভালো সেবা দিতে পারব না; অর্থাৎ এ সেতুর সুফল পাব না।" 

জাজিরার নাওডোবা এলাকার রমিজ উদ্দিন ও আব্দুর রব ঢালীর অভিযোগ, এই সেতুর জন্য তারা বাপদাদার ভিটেমাটি ছেড়েছেন। পদ্মা সেতু হয়েছে তাতে তারা আনন্দিত। কিন্তু পদ্মা সেতু থেকে শরীয়তপুরের সঙ্গে সংযোগ সড়ক না থাকায় তারা পদ্মা সেতুর সুফল পাচ্ছেন না।

জাজিরার বি কে নগর এলাকার ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর মুন্সি, খলিল পেদা, জাফর সরদার জানান, এই রাস্তাটি ফোর লেন হবে বলে তারা  শুনেছেন।  এ কাজে জমি অধিগ্রহণের কথাও জেনেছেন, কিন্তু বাস্তবে কাজের কোনো অগ্রগতি তাদের চোখে পড়েনি। 

শরীয়তপুরের একাধিক তহশিলদার বলেন, তারা অধিগ্রহণের রাস্তার দুই পাশের জমির মালিকদের নামের তালিকা করে জমা দিয়েছেন। জমি অধিগ্রহণের কাজ চলমান রয়েছে।

শরীয়তপুর সড়ক বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, "চার লেনের কাজের জন্য জমি অধিগ্রহণ প্রায় শেষের দিকে, এর বেশি কিছু আমি বলতে পারব না।"

খুব দ্রুত ফোর লেনের কাজ শুরু করার দাবি জানান শরীয়তপুর জেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি ফারুক আহাম্মেদ তালুকদার।

"পদ্মা সেতুর সঙ্গে আমাদের সংযোগ সড়ক নেই, ফোর লেনের কাজও হয়নি। আমরা দ্রুত ফোর লেনের কাজ চাই, নয়তো আমরা এর সুফল পাব না।"

জাজিরার নাওডোবা থেকে শরীয়তপুর পর্যন্ত ফোর লেন নির্মাণে জমি অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে আর্থিক চেক দেওয়া হচ্ছে বলে জানান জাজিরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কামরুল হাসান সোহেল।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক