রাঙামাটি সয়লাব ‘অনটেস্ট‘ অটোরিকশায়
বন-পাহাড়-হ্রদ দিয়ে ঘেরা অসমতল শহর রাঙামাটির প্রধান বাহন অটোরিকশার ‘বাহুল্য’ এখন পর্যটন জনপথের যানজটের ‘প্রধান’ কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে; যার অধিকাংশই নিবন্ধনহীন।
রাঙামাটি অটোরিকশা চালক-শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা জানিয়েছেন, শহরের চলাচলের জন্য বৈধ নিবন্ধনকৃত অটোরিকশার সংখ্যা সাতশর কমবেশি। যার মধ্যে অন্তত ৩০০ গাড়ির ‘ফিটনেস’ নেই। কিন্তু নিবন্ধন নেই, শুধু ‘অনটেস্ট’ প্লেট লাগিয়ে চলাচল করছে আরও দ্বিগুণ অটোরিকশা।
রাঙামাটি পুরো শহরটিই পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত। সমতল রাস্তা প্রায় নেই বললেই চলে। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তায় রিকশা বা হালকা যান চলাচল করতে পারে না। তাই সেই যাটের দশক থেকেই এখানে যন্ত্রচালিত যানবাহনই যাতায়াতের জন্য মানুষের প্রধান ভরসা। প্রথমে হলুদ টু-স্ট্রোক, পরে সবুজ ফোর-স্ট্রোক; এসব যানকে শহরবাসী ট্যাক্সি, সিএনজি, অটোরিকশা নানান নামেই ডেকে থাকে।
জেলার বাইরে যোগাযোগের জন্য আগে ‘প্রধানত’ জলপথকে ব্যবহার করা হলেও এখন পাহাড়ের বুক চিড়ে সড়কপথ বিস্তৃত হচ্ছে। জেলা থেকে উপজেলা, বা উপজেলা-উপজেলায় চলাচলের জন্য খোলা জিপ গাড়ির (যা স্থানীয়ভাবে চান্দের গাড়ি নামে পরিচিত) বাইরে অটোরিকশার প্রাধান্য রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, উপজেলায় চলাচলকারী অটোরিকশাগুলোই রঙ লাগিয়ে জেলা শহরে প্রবেশ করছে; এতে শহরের নিবন্ধকৃত চালকরা পড়েছেন বেকায়দায়। তাদের আয় কমে গেছে; পাশাপাশি শহরের যানজটও বিগত সময়ের তুলনায় অনেক বেড়েছে। এর জন্য নিবন্ধনহীন ‘অনটেস্ট’ অটোরিকশাকেই দায়ী করছেন চালকরা।
আবার ‘অনটেস্ট’ দাবিদার চালকরা বলছেন, তারা অনেকেই বিগত তিন বছর ধরে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছেন। কিন্তু নিবন্ধন পাচ্ছেন না। নিবন্ধনের আশায় বসে থাকলে তাদের আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যাবে; তখন পরিবার নিয়ে বিপদে পড়তে হবে।
রাঙামাটি অটোরিকশা চালক-শ্রমিক ইউনিয়নের নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান বাবু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি যতটুকু জানি, আমাদের বিগত কমিটি অটোরিকশা নিবন্ধনের জন্য জেলা প্রশাসনের কথা বলে চালকদের কাছ থেকে ৬০ হাজার টাকা নিয়েছেন। এই বিষয়টি জেলা প্রশাসন জানার পর নিবন্ধন প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয়।
“এই বিষয়টি ছিলো খুবই দুঃখজনক ঘটনা। এর কারণে চালকরা এখন কষ্ট পাচ্ছে। আমরা আশা করছি, নতুন কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতি বদলাবে”, যোগ করেন বাবু।
তিনি আরও বলেন, ”গাড়ি নথিভুক্ত ৭০০ এর মতো। এর বাইরে দুই বছর আগে ২১৪টি গাড়ি নথিভুক্তির জন্য আবেদন করেছে। এখন শত শত অনটেস্ট গাড়ি। আবেদন নেওয়াও বন্ধ।”
যানবাহনের নিবন্ধন দিয়ে থাকে সরকারের বিআরটিএর। রাঙামাটিতে বিআরটিএ দেখভাল করেন জেলা প্রশাসক।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান শনিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দায়িত্ব নেওয়ার পর জেনেছি, আমার আগের জেলা প্রশাসকের সময় অটোরিকশা রেজিস্ট্রেশনের কথা বলে অটোরিকশা চালক সমিতির নেতারা টাকা নেওয়ার কারণে একটি সমস্যা তৈরি হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আমরা রেজিস্ট্রেশনের বিষয়টি নিয়ে ভাবছি। এই মাসেই একটি সভা আহ্বান করেছি। সবার সঙ্গে আলোচনা করে আশা করছি একটা সমাধানে পৌঁছানো যাবে।”
এ নিয়ে বৈধ অটোরিকশার চালকরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। যার প্রভাব পড়েছে সমিতির বিগত নির্বাচনেও। নির্বাচনে পুরনো নেতৃত্ব বাদ দিয়ে নতুন নেতৃত্ব বেছে নেন চালকরা। যদিও নতুন কমিটি এখনও দায়িত্ব বুঝে নিতে পারেনি।
রাঙামাটি শহরে ৩০ বছর ধরে অটোরিকশা চালান কাশেম। গত ৩০ বছরে এমন কষ্টে ছিলেন না জানিয়ে তিনি বলেন, ”সারাদিন গাড়ি চালিয়ে মালিকের ‘জমা’ তুলতে পারছি না, সংসার চালাব কী করে?”
”একদিকে করোনাভাইরাসের যন্ত্রণা, যাত্রী-পর্যটক কমে গেছে আর অন্যদিকে অনটেস্ট গাড়ির যন্ত্রণা।”
এ দুইয়ে মিলে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন বলে জানান ওই চালক কাসেম।
কাসেমের মতো আরও অনেক চালকই কথা প্রসঙ্গে হতাশার কথা জানালেন। তারা মনে করেন, ‘অনটেস্ট’ গাড়ির কারণে সমস্যা হচ্ছে।
রাঙামাটি অটোরিকশা চালক-শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান বাবু বলেন, ”যে পরিমাণ গাড়ি চললে সবার সুবিধা হয়, সেই পরিমাণ গাড়ির অনুমতি দিলেই আমাদের আর বলার কিছু থাকবে না।
”আমাদের চালকদের আয় কমে গেছে, খুব কষ্টে আছেন তারা “
পরিবেশ সংগঠক সৈয়দ হেফাজত উল বারি সবুজ বলেন, “রাঙামাটি যে পরিমাণ গাড়ি চলাচলের সামর্থ্য রাখে তার চেয়ে একটি বেশি গাড়িও চলার প্রয়োজন নেই। শহরের সক্ষমতা এবং জনগণের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে ঢালাওভাবে রেজিস্ট্রেশন না দিয়ে এই প্রক্রিয়াটি নিয়মিত রাখা উচিত।
সেই সঙ্গে পুরাতন গাড়ি তুলে নিয়ে নতুন গাড়ি নামানোর কথা বলেন সবুজ।
তিনি বলেন, “শুধু অটোরিকশা নয়, বাস-লঞ্চসহ অন্যান্য গাড়ির ক্ষেত্রেও এই নিয়ম প্রয়োগ করতে হবে। প্রতিটি মোটরসাইকেল-বাস-পিকআপ-মাইক্রো-কার-ট্যাক্সিসহ সব যানের বৈধ রেজিস্ট্রেশন থাকতে হবে এবং চালকদেরও লাইসেন্স থাকতে হবে। নতুবা যেকোনো অপরাধ বা দুর্ঘটনায় এদের চিহ্নিত করা কঠিন হবে।”
এ ব্যাপারে রাঙামাটি পৌরসভার মেয়র আকবর হোসেন চৌধুরী বলেন, “শহরে যান চলাচলের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করেই গাড়ি চলাচলের অনুমতি দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে সব গাড়িকে শহরে অনুমতি না দিয়ে, উপজেলাগুলোতেও পাঠানো উচিত কিছু গাড়িকে। চালকদের অবস্থা বিবেচনায় নেওয়ার পাশাপাশি শহরের যান চলাচলের সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে।
এ বিষয়ে চালক, মালিক, পৌর কর্তৃপক্ষ, প্রশাসন সবাই মিলে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে বলেও উল্লেখ করেন মেয়র।
তিনি বলেন, “অটোরিকশা চলাচলের বিষয়ে পৌরসভা কোনোকিছুর সঙ্গে জড়িত নয়। চালকরা শুধু বাৎসরিক একটি ফি দিয়ে থাকে পৌরসভায়।
কথা প্রসঙ্গে মেয়র এ সময় জানান, তিনি বিআরটিএর সভায় নিয়মিত উপস্থিত থাকেন এবং মতামত দেন।
