সরাসরি গম কেনায় ‘ আ. লীগ নেতারাই বাধা’
কৃষকদের কাছ থেকে সরকারিভাবে গম কেনার কথা থাকলেও কুড়িগ্রামের স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাসহ প্রভাশালীরা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় কৃষি বিভাগের কৃষক তালিকা অনুযায়ী খাদ্য বিভাগের গম কেনার নিয়ম রৌমারী ও রাজীবপুর উপজেলায় না মানার অভিযোগ উঠেছে।
এবার রৌমারীতে ৯৬১ মে. টন ও রাজীবপুরে ৭৫১ মে. টন গম কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে সরকার।
২৮ টাকা কেজি দরে প্রতি কৃষকের কাছ থেকে ৫০০ কেজি থেকে সর্বোচ্চ তিন হাজার কেজি (৩ টন) পর্যন্ত গম কেনার কথা।
ইতিমধ্যে নির্ধারিত লক্ষ্যের প্রায় অর্ধেক গম কেনা হয়েছে বলে রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলা খাদ্য অফিস থেকে জানা গেছে।
কৃষক সরাসরি গম বেচতে পারেনি উল্লেখ করে রৌমারী উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাংগঠনিক সম্পাদক আবিদ শাহরিয়ার জাপলিন ইউএনও বরাবর একটি অভিযোগপত্র দিয়েছেন।
তাতে কার মাধ্যমে কী পরিমাণ গম কেনা হচ্ছে তার একটি তালিকাও দিয়েছেন।
একইভাবে রাজীবপুর উপজেলার সাড়ে ৭শ’ মে. টনের মধ্যে ৬শ’ টন গম একা দেবেন আওয়ামী লীগ নেতা ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শফিউল আলম। বাকি দেড়শ’ টন ইউএনওসহ অন্যান্যের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
“প্রকৃত কৃষকের ভাগে রাখা হয়নি এক ছটাক গমও। ফলে কৃষকদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতকরণে সরকারের গম ক্রয় কার্যক্রম ভেস্তে যেতে বসেছে।”
রাজীবপুর সদর ইউনিয়নে নবাগত ইউপি চেয়ারম্যান কামরুল আলম বাদল বলেন, “এখানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিউল আলমই সব। তার অনুমতি ছাড়া উপজেলা প্রশাসনের একটা ফাইলও নড়ে না।
“কৃষককে বঞ্চিত করে তিনি একা ৬শ’ টন গম বিক্রি করেছেন। এতে ৩০ লাখ টাকা একা কামিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে এলাকার কেউ কিছু বলার সাহস পায় না।”
ইউএনওরা গুদামে গম বেচেন উল্লেখ প্রশ্ন করেন ‘এর চেয়ে বড় দুর্নীতি আর কী হতে পারে?”
এই অভিযোগ প্রসঙ্গে রাজীবপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান শফিউল আলম বলেন, “এখানে তো অনেক কৃষক গুদামে গম দিয়েছে। শুধু আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ কেন?
“গম যেই দিক না কেন সরকার বিল দিচ্ছেন ব্যাংক একাউন্টধারী কৃষকের নামে।”
দলের উপজেলা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নামে বরাদ্দের বিষয়ে আবিদ শাহরিয়ারের তোলা অভিযোগ এক রকম স্বীকার করে নিলেন রৌমারী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি (সাবেক সাংসদ) জাকির হোসেন।
তিনি বলেন, “৪৮০ টনের মধ্যে দলের নেতাকর্মী রয়েছেন।
“দেশের অন্যান্য জেলায় আওয়ামী লীগ যা করে আমরা তার এক কানাকড়িও করি না। এখানে বিএনপিরাও ব্যবসা করছেন।”
অন্যান্য কর্মকর্তাদের বক্তব্যে সরাসরি গম বেচায় কৃষক বঞ্চনার আভাস পাওয়া যায়।
রৌমারী খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবু বক্কর বলেন, “এখানে আমাদের করার কিছুই নেই। আওয়ামী লীগ যাদের তালিকা দেবে তাদের কাছ থেকে গম নিতে আমরা বাধ্য হচ্ছি।
“এছাড়া এ রকম দুর্গম এলাকায় চাকরি করা সম্ভব নয়।”
তবে কৃষকের জমির পরিমাণ ও গম সরবরাহের হিসেব জানতে চাইলে মুক্তিযোদ্ধা বেলাল ২ টন, তৈয়ব আলী এক টন এবং আশরাফ আলী দেড় টন গম দিলেও তাদের জমির পরিমাণ জানাতে পারেননি তিনি।
এদিকে রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা ফিরোজ আহম্মেদ মোস্তফা বলেন, “অভিযোগকারীরাও ভাগ পেয়েছেন। তবে ভাগবাটোয়ারায় কম-বেশি হওয়ার কারণে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছে।
“আমরা ক্রয় কমিটির সুপারিশ ছাড়া এক ছটাক গমও ক্রয় করিনি। আর মূল্য পরিশোধ হচ্ছে কৃষি বিভাগের তালিকাভুক্ত কৃষকের ব্যাংক হিসাবে।”
রৌমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন তালুকদারের দাবি তিনি গুদামে কোনো গম বিক্রি করেননি।
“গম সংগ্রহ অভিযান নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ পেয়েছি। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতারা হুমকি দিয়েছে এ নিয়ে বাড়াবাড়ি না করতে। তাই এক রকম বিপদেই আছি।”
রাজীবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাসির উদ্দিনও তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেন।
জাতীয় পার্টির নেতা নাসির উদ্দিন ও আওয়ামী লীগ নেতা রাজু আহম্মেদ বলেন, খোলা বাজারে এক মণ গমের দাম ৭৫০ টাকা, সরকার কিনছে ১১২০ টাকায়। এক মণে লাভ ৩৭০ টাকা।
“এ কারণে রৌমারীর ময়নাল ব্যাপারী, আবুল হোসেন ব্যাপারী, আবুল কাশেম ব্যাপারী, খোকা ব্যাপারী কৃষকদের কাছ থেকে প্রতি টনের স্লিপ কিনছেন ৫ হাজার টাকায়। রৌমারী খাদ্য গুদামে এখন পর্যন্ত এই কয়েকজন সবচেয়ে বেশি গম দিয়েছেন।”
সরেজমিনে কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, গম নিয়ে কৃষকদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
আওয়ামী লীগের স্থানীয় এক নেতা বলেন, স্থানীয় আওয়ামী লীগের হাতে গোনা কয়েকজন নেতার কারণে সাধারণ মানুষ শেখ হাসিনার সরকারের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
